উত্তরবঙ্গ নিয়ে সঠিক জানব কবে?
শৌভিক রায়
'দার্জিলিং আর সিকিম ছাড়া দেখার আর কী কী আছে উত্তরবঙ্গে?' সমাজ মাধ্যমে বেড়ানোর এক গ্রুপে এরকম একটি প্রশ্ন দেখে চমকে উঠলাম। রাগ হল। খানিকটা দুঃখও। তবে অবাক হইনি। উত্তরবঙ্গ সম্পর্কে আমাদের অনেকের জানার পরিধি এটুকুই। রাজ্যের উত্তরে বিপুল সংখ্যক মানুষ বাস করেন। এখানে বহু প্রাচীন জনপদ আছে। কিন্তু সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা আমাদের অনেকেরই নেই। এই শ্রেণির মানুষদের কাছে এই রাজ্য একটি ছোট্ট ভৌগোলিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ। তার বাইরে আর কিছু নেই। ফলে এই জাতীয় হাস্যকর প্রশ্ন ঘুরপাক খায় অনেকের মনেই। যাঁরা উত্তরবঙ্গ জানেন না, তাঁরা দক্ষিণবঙ্গও জানেন না।
অন্য রাজ্যের মানুষ বাঙালি বুঝে প্রথমেই জানতে চান, কলকাতা থেকে গিয়েছি কিনা। খুব স্বাভাবিক সেটা। রাজ্য রাজধানী হল কলকাতা। একসময় শিক্ষা সংস্কৃতি অর্থনীতিতে সেরা শহর ছিল। ছিল দেশের রাজধানীও। সমৃদ্ধ তার অতীত। ফলে বাইরের লোক পশ্চিমবঙ্গ বলতে কলকাতা বুঝলে, খুব কিছু অবাক হওয়ার ব্যাপার নেই। কিন্তু যখন এই রাজ্যে জন্মানো ও বড় হয়ে ওঠা কেউ কোচবিহার বলতে 'বিহারের কোথায়' বা 'অসমে তো, তাই না' জাতীয় প্রশ্ন করেন তখন রাগ হওয়াটা স্বাভাবিক। আমাদের শিক্ষাকার্যক্রম এতটাও খারাপ নয় যে, পড়ুয়াদের রাজ্যের জেলা সম্পর্কে পরিচিত করানো হয় না! প্রশ্ন জাগে, আমরা কি আদৌ পড়াশোনা করেছি?
অনেকেরই ধারণা উত্তরবঙ্গ বোধহয় নির্দিষ্ট কোনও একটি জায়গা। হয়তো শ্যামবাজার থেকে গড়িয়া তার এলাকা। কিন্তু মালদাও উত্তরবঙ্গে, আবার দিনহাটাও তাই। দূরত্ব? প্রায় দশ ঘণ্টা। ট্রেনে রীতিমতো রিজার্ভেশন করে যাতায়াত করতে হয়। এই জাতীয় কথা আসলে নিজেদের দৈন্যতার প্রকাশ। নিজের রাজ্য ও দেশকে না জানার উদাহরণ। কিন্তু এর ফলে যে জায়গায় জন্মালাম, যেখানকার আলো বাতাসে বড় হয়ে উঠলাম, সেই জায়গা ও তার মানুষদেরকেই পরোক্ষভাবে অপমান করা হল। সেটা আমরা বুঝি না। অজ্ঞতা আমাদের এতটাই।
কিছুদিন আগে এক অত্যন্ত নামী বাণিজ্যিক পত্রিকায় একটি উপন্যাস চমকে দিয়েছিল। সেখানে লাটাগুড়িতে অসুস্থ হওয়া মানুষকে চিকিৎসার জন্য আলিপুদুয়ারে নিয়ে আসা হচ্ছিল। অথচ জলপাইগুড়ি লাটাগুড়ির কাছে। শিলিগুড়িও। খুনিয়া মোড় থেকে আধাঘন্টার মধ্যেই কোনও কোনও চরিত্র পৌঁছে যাচ্ছিল সংকোশে। স্থানজ্ঞানহীন লেখক ভাসা ভাসা ভাবে লিখছিলেন। বিস্ময়ের কথা, সেই পত্রিকার পক্ষ থেকে তাঁর এই ভুলগুলি ধরিয়েও দেওয়া হয়নি। বরং 'উত্তরবঙ্গের প্রেক্ষাপটে উপন্যাস' ভেবে শ্লাঘা বোধ করেছিল তারা। আবার এক বিখ্যাত সংস্থার বিজ্ঞাপনেও দেখেছি কলকাতা, আসানসোল, দুর্গাপুর ইত্যাদি জায়গার পাশাপাশি উত্তরবঙ্গেও তাদের শাখা আছে। কী বুঝবেন? উত্তরবঙ্গের কোথায়? রায়গঞ্জে? মালবাজারে? উত্তর অজানা।
আমরা উত্তরের মানুষদের অনেকেরও নিজেদের জায়গা নিয়ে সঠিক ধারণা নেই। অনেকেই মনে করেন, ডুয়ার্স মানে দার্জিলিং আর সিকিম। কিন্তু ডুয়ার্সের সঙ্গে এদের কারও কোনও সম্পর্ক নেই। আমরা জানি না। একটি সময় অসম ডুয়ার্স ও বেঙ্গল ডুয়ার্স বলে বিভাজন ছিল। জানি না তাও।
ভূগোল ও ইতিহাস জ্ঞানহীন তাই বেড়েই চলেছি আমরা। দেখা ও জানার আনন্দ থেকে, দেখানো ও জানানো আজকালকার ট্রেন্ড। আর সেটিই আমাদের ট্র্যাজেডি।
(লেখক শিক্ষক। কোচবিহারের বাসিন্দা)
* আজকের (নভেম্বর ১৬, ২০২৪) উত্তরবঙ্গ সংবাদে সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত একটি লেখা। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা কার্যকরী সম্পাদক ও উত্তরবঙ্গ সংবাদকে।

No comments:
Post a Comment