Friday, February 9, 2024


 

একটি অপেক্ষা আর কিছু কোলাজ 

শৌভিক রায় 

একটা জুতো। কত আর দামি ছিল? বাবা সেদিন কিনে দিতে পারেননি। 

না। আমরা খুব গরীব ছিলাম না। বাবা-মা দুজনেই চাকরি করতেন। সেই সময় শিক্ষকদের বেতন খুব বেশি না হলেও অস্বচ্ছলতা ছিল না। তবু সেদিন কিনে দিতে পারেননি বাবা। 

জুতোটার দাম দেখে বাবা ছিটকে সরে এসেছিলেন। আমাকেও নিউ মার্কেটের সেই দোকানে উইন্ডো শপিং করে খুশি থাকতে হয়েছিল।

বাবার মুখে কি সেদিন পরাজয়ের গ্লানি দেখেছিলাম? মনে পড়ে না। আসলে জীবনকে বোঝার চোখটাই তো তৈরি ছিল না।
 
একই রকম ভাবে গ্র্যান্ড হোটেলের নিচে ফুটপাথে টিনটিনের বইয়ের দাম ২৫ টাকা শুনে অন্য আর একবার বাবা আঁতকে উঠেছিলেন। তখনও টিনটিনের বই বাংলায় পাওয়া যেত না। মাসিক (পরবর্তীতে পাক্ষিক) আনন্দমেলায় বাংলায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হত খুদে সাংবাদিকটির কাণ্ডকারখানা। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ওই দু`পাতার টিনটিনে মন ভরত না। খুব আশা করেছিলাম বাবা ২৫ টাকা দিয়ে কিনে দেবেন। বাবা দেননি। ভুল বললাম। দিতে পারেননি। আমার অভিমান হয়েছিল। রাগ করেছিলাম। কিন্তু বুঝতে পারিনি যে, মানুষটা ভেতরে ভেতরে হয়ত ভেঙে চলেছেন আমার মতোই, একদম বিপরীত কারণে। না দিতে পারার এই কষ্টটা বাবা হয়ে বুঝি আজ। সেদিন বুঝিনি। 

এভাবেই চেয়েও পাইনি জিনস। তখন জিনস আজকের মতো সহজলভ্য নয়। দাদা তখন স্কটিশ চার্চে পড়ছে। ডাফ হোস্টেলে থাকছে। ও কিনতে পেরেছিল। ব্র্যান্ড সাকুল্যে একটাই। লি। ফালাকাটায় কোথায় আর! আমার জোটেনি। তবে মনে হয় এবারে বাবার না দেওয়াটা অর্থনৈতিক ছিল না। জিনস নিয়ে একটা বিরাগ কাজ করেছিল। হয়ত সেজন্যই পাইনি। পেলাম আরও অনেকটা পরে। রেডিমেড নয়। বানানো। ফিট-ওয়েল টেইলার্সে জিনসের কাপড় এলো। অরুণকাকু বাবাকে বুঝিয়ে-টুঝিয়ে বানিয়ে দিলেন। ওঁর জন্যই সেদিন জিনস জুটেছিলে। 

জিনস জুটল। কিন্তু তখনকার ফ্যাশন অনুযায়ী দরকার ছিল একটা জুতোর। ব্র্যান্ডেড। নর্থ স্টার। গুচ্চি,উডল্যান্ড, আডিডাস, পুমা, নাইকে, রিবক ইত্যাদি শব্দের যে দুনিয়াতে অস্তিত্ব রয়েছে সেটা তো জানতামই না। যাহোক বাবা এবার কিনে দিলেন। ফালাকাটায় তখন আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক প্রয়াত কানু স্যার বাটার ফ্রাঞ্চাইসি নিয়েছেন। মনের মতো জুতো পেয়ে গেলাম। প্যাকেট নিয়ে বগলদাবা করে যখন বাড়ি যাচ্ছি, নিজেকেই উত্তরের তারা মনে হচ্ছে। জুতো পড়বার উত্তেজনায় সারা রাত ঘুম এলো না। জুতো যেদিন পরলাম, মনে হল সবাই আমার পায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। রীতিমতো উড়ছি।
 
ঠিক তিনদিন পর জুতোটা ছিঁড়ে গেল। ম্যানুফ্যাকচারিং ডিফেক্ট ছিল। যে কষ্ট পেলাম তা আর বলি কীভাবে! কানু স্যার বহু চেষ্টা করে পাল্টে দিলেন ঠিকই, কিন্তু নর্থ  স্টার আর পেলাম না। আজকের মতো সেদিন আর তথ্য-প্রযুক্তির রমরমা কোথায় যে সেহবাগের মায়ের মতো বলতে পারি `করলে দুনিয়া মুঠঠি মে!` হইচই ফেলে কোম্পানিকে ঘোল খাওয়ানো তাই সম্ভব হয়নি। 
 
নর্থ  স্টার আর পরিনি। অন্য ব্র্যান্ড পরেছি। কিন্তু সেই শোক ভুলিনি। ভুলিনি বাবার অসহায় মুখ। এবারেও বাবা ব্যর্থ। কিনে দিয়েও শেষ রক্ষা করতে পারলেন না। তাঁর কপাল মন্দ। ভাগ্য তাঁর সঙ্গে বিট্রে করেছিল। 

সেদিন নেট ঘাটতে ঘাটতে হঠাৎ সেই নর্থ  স্টার। সেই জুতোটা। ওই ডিজাইন যে আজও আছে জানতামই না। 
অপেক্ষা করিনি। অনলাইন অর্ডার করেছি। সঙ্গে সঙ্গে। একগাদা জুতো থাকা সত্বেও। 

সেই জুতো আসছে। আর তার সঙ্গে ভিড় করে আসছে রাজ্যের স্মৃতি। মিলেমিশে যাচ্ছে নিউ মার্কেট, গ্র্যান্ড হোটেল, বাটার দোকান, টিনটিন, ফিট-ওয়েল, জিনস।
 
শুধু দেখছি ছবিতে হেসে উঠছেন বাবা আর মা। 
তাঁদের নীরব উপস্থিতি বলে দিচ্ছে জীবন সত্যিই বৃত্তপথ। 
কবির ভাষায় In my beginning is my end.......     

No comments: