আন্দামানের সেলুলার জেল: যেমন জেনেছি, যেমন দেখেছি
শৌভিক রায়
ইতিহাসের পরিহাস বোধহয় এটাই। তা না হলে প্রবল এক বিভীষিকা, কীভাবে মুক্তিতীর্থ হয়ে ওঠে?
বলছি আন্দামানের সেলুলার জেলের কথা। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও, `আন্দামান` শব্দটি শুনলে, মানস চোখে সেলুলার জেলের ছবিই সবার আগে ভেসে ওঠে। অথচ এখানে দ্রষ্টব্য কম নেই। একের পর এক অসামান্য দ্বীপ, সমুদ্রবেলা, ওয়াটার স্পোর্টস, গভীর অরণ্য, আদিবাসী, মাড ভলক্যানো, পাহাড় ইত্যাদি সব কিছু নিয়ে আজকের আন্দামান ভারতের পর্যটন সার্কিটের সবচেয়ে লাভজনক তিনটি এলাকার অন্যতম! তবু আন্দামানের রাজধানী পোর্ট ব্লেয়ারের পৌঁছেই সবার আগে মনে পরে সেলুলার জেলের কথা। কিন্তু কেন?
আসলে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম আর সেলুলার জেল বোধহয় কোন একটি জায়গায় সমার্থক। একদা কুখ্যাত জেলটি না দেখলে বোঝা যায় না, কী কঠিন দিন পেরিয়ে মহার্ঘ স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল। জানা যায় না কী পরিমাণ অমানুষিক অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছিল সেদিনের সংগ্রামীদের। কিন্তু হাজারও অত্যাচার, অপমান, অমানবিক ব্যবহার, তীব্র দমন-পীড়ন কিছুই দমিয়ে রাখতে পারেনি সেই মহাপ্রাণ মানুষদের। বরং নিপীড়ন যত তীব্র হয়েছে, তত বেড়েছে আন্দোলন। পরিণাম? ব্রিটিশদের মাথা নিচু করা, বন্দিদের মুক্তি দিতে বাধ্য হওয়া, মূল ভূখণ্ডের বিভিন্ন জেলে তাঁদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়া। আর সেই পরাভবেই বোঝা যাচ্ছিল ব্রিটিশদের ভিত টলোমলো।
কিন্তু এই মুক্তিতীর্থকে বুঝতে উঁকি দিতে হবে অতীতে। পাশাপাশি সামান্য হলেও বুঝতে হবে আন্দামানকে। কেননা আজও সাধারণ মানুষের কাছে আন্দামান অনেকটাই অজানা-অচেনা। আসলে আন্দামান ও নিকোবর দুটি আলাদা দ্বীপপুঞ্জ। একটি দুটি দ্বীপ নয়। এই দ্বীপপুঞ্জে রয়েছে মোট ৫৭২টি দ্বীপ। আন্দামান গ্রুপে নর্থ, মিডল, সাউথ, লিটল আন্দামান আর নিকোবর গ্রুপে কার নিকোবর, কাছাল, নানকৌড়ি, চাওরা, টেরেসা ও ক্যাম্বেল বে সহ রয়েছে অজস্র দ্বীপ। দ্বীপের সংখ্যা অজস্র হলেও কিন্তু মাত্র ৩৬ টি দ্বীপে বসতি গড়ে উঠেছে। মানুষের পা পড়েনি ১৩.৫ ডিগ্রি ও ৬ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯২ ডিগ্রি ও ৯৪ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমা পর্যন্ত বিস্তৃত মোট ৭২৫ কিমির এই দ্বীপপুঞ্জের বহু জায়গাতেই।
আন্দামানের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগ ১৭ শতকের শেষদিকে মারাঠা অ্যাডমিরাল কানৌজি অংরের হাত ধরে। ১৭২৯ অবধি তিনি ব্রিটিশ, ডাচ ও পর্তুগিজদের ঠেকিয়ে রেখেছিলেন। পরে অবশ্য ডাচ আর পর্তুগিজরা কিছুদিন আন্দামানের দখল নিয়ে ছিল। তবে শেষ অবধি মূলত ব্রিটিশরাই আন্দামানের মালিক হয়ে বসে। নিজেদের আয়ত্তে নেওয়ার পর আন্দামান নিকোবর নিয়ে ব্রিটিশদের খুব কিছু মাথাব্যথা ছিল না। থাকবার কথাও নয়। কেননা ওই রকম মাঝ সমুদ্রে হিংস্র আদিবাসী ঘেরা দ্বীপে তারা করবেই বা কী! কিন্তু কোনও জায়গাকে দখলে নিয়ে সেটিকে ফেলে রাখাও ছিল তাদের নীতিবিরুদ্ধ। ফলে আন্দামানকে কোনও কাজে লাগানোর ভাবনা তাদের এমনিতেই ছিল।
সেই সময় ব্রিটিশদের মনে নতুন একটি পেনাল সেটেলমেন্ট তৈরির চিন্তা ছিল। এমন নয় যে পেনাল সেটেলমেন্ট একটিও ছিল না। ব্রিটিশরা সমুদ্র পারে প্রথম পেনাল সেটেলমেন্ট তৈরি করেছিল ১৭৮৭ সালে সুমাত্রার বেনকোলেনে (তদানীন্তন ফোর্ট মালবারো)। পরবর্তীতে সেই পেনাল সেটেলমেন্ট পেনাং, মালাক্কা, আরাকান, তেনাসেরিম ইত্যাদি হয়ে সিঙ্গাপুরে তৈরি করা হয়।
আন্দামানকে সম্পূর্ণভাবে নিজেদের দখলে নিয়ে নতুন পেনাল সেটেলমেন্টের জন্য ব্রিটিশরা আন্দামানকে বেছে নেয়। কেননা, সেই সময়ের আন্দামান ছিল নাবিকদের কাছে একটি বিভীষিকার জায়গা। কেননা এই অঞ্চলে জাহাজডুবি ছিল খুব সাধারণ ব্যাপার। কেননা আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের ভূখণ্ড হল পাহাড়ের উপরিভাগ। চারদিকে বিশালাকৃতি পাথর বা রক ছড়িয়ে ছিটিয়ে সমুদ্রের ভেতরে। জাহাজডুবি হলে যদিও বা নাবিকরা সমুদ্রের হাত থেকে রেহাই পেত, কিন্তু তাদের মরতে হত এখানকার হিংস্র আদিবাসীদের হাতে। ফলে হতভাগ্য নাবিকদের জন্য একটি আশ্রয়স্থল তৈরি করা জরুরি হয়ে উঠেছিল। এছাড়াও ব্রিটিশরা চেয়েছিল দাগি অপরাধীদের এমন কোনও জায়গায় নির্বাসনে পাঠাতে, যেখান থেকে তারা আর ফিরতে না পারে। তবে এই ভাবনার মধ্যে শুধু শাস্তি প্রদান নয়। লুকিয়ে ছিল এই অপরাধীদের শ্রমিকের কাজে লাগিয়ে একটি নতুন জায়গাকে ক্রমশ বাসযোগ্য করে তোলা ও সেখান থেকে ব্যবসা করে মুনাফা কামানো। ফলে সিঙ্গাপুর থেকে পেনাল সেটেলমেন্ট আন্দামানে নিয়ে আসবার পরিকল্পনা শুরু হয়।
১৭৮৮-৮৯ সালে লেফটেন্যান্ট টি এইচ কোলব্রুক আর লেফটেন্যান্ট আর্চিবল্ড ব্লেয়ার সরজমিনে দেখতে পৌঁছে যান দ্বীপে। তাঁদের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে ১৭৮৯ সালে সাউথ-ইস্ট বে'র চাথাম দ্বীপে সেটেলমেন্ট তৈরি হল। নাম হল পোর্ট কর্ণওয়ালিস। ১৭৯১তে লর্ড কর্ণওয়ালিসের ভাই কমোডর কর্ণওয়ালিসের প্রস্তাবে সেটেলমেন্ট স্থানান্তরিত হল উত্তর আন্দামানে। কিন্তু সব বিফলে গেল ম্যালেরিয়ার তীব্র আক্রমণে। পিছু হটতে বাধ্য হল ব্রিটিশরা। ১৭৯৬ তে পরিত্যক্ত হল সেটেলমেন্ট।
অবস্থা পাল্টালো ১৮৫৭ সালে। স্বাধীনতার প্রথম সংগ্রাম ব্রিটিশদের আবার বাধ্য করল পেনাল সেটেলমেন্ট নিয়ে ভাবতে। কেননা স্বাধীনতা সংগ্রামে যাঁরা মেতেছে তাঁরা সামান্য অপরাধী নয়। এঁরা রাষ্ট্রদ্রোহী। মূল সমাজ থেকে এঁদেরকে না সরালে অচিরেই বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়বে। প্রচুর সংখ্যক ধৃত এই অপরাধীদের একটাই জায়গা। সেটা কালাপানির (সমুদ্রের ঘন নীল জল কালচে দেখাত বলে বলা হত কালাপানি) ওপারে। অতএব ড. জে এফ মওয়াট, ড. জি আর প্লেফেয়ার, লেফটেন্যান্ট জে এ হিথকোটের এক্সপার্ট কমিটি ১৮৫৭ সালের ৮ ডিসেম্বর আন্দামান এলেন। পেনাল সেটেলমেন্টের জন্য প্রচুর ঘোরাঘুরি করে কোনও জায়গা না পেয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন সেই পুরোনো জায়গাতেই, অর্থাৎ চাথাম সংলগ্ন অঞ্চলেই, সেটেলমেন্ট হোক। তদানীন্তন ভারত সরকার প্রস্তাব মেনে নিলে ১৮৫৮ সালের ১৫ জানুয়ারি পুরোনো জায়গার নাম পাল্টে রাখা হল পোর্ট ব্লেয়ার (আর্চিবল্ড ব্লেয়ারের স্মরণে)। ক্যাপ্টেন মান সেটেলমেন্ট গড়বার দায়িত্ব পেলেও মূল কাজ করলেন পোর্ট ব্লেয়ারের প্রথম সুপারিনটেনডেন্ট ড. জে পি ওয়াকার। 'সেমিরামিস' নামের জাহাজ কলকাতা থেকে ২০০ জন সাজাপ্রাপ্ত সিপাহী-বিদ্রোহের নায়ক , দুজন ভারতীয় ডাক্তার, একজন ভারতীয় ওভারশিয়ার আর ৫০ জন পাহারাদার নিয়ে পৌঁছল আন্দামানে। চাথামে অবশ্য জলের অভাবে অফিস তৈরি হল না। পোর্ট ব্লেয়ার থেকে সামান্য দূরে সমুদ্রের মাঝে রস আইল্যান্ডে গড়ে তোলা হল ব্রিটিশদের প্রধান কার্যালয়।
এদিকে সিপাহী বিদ্রোহের পর থেকেই স্বাধীনতা আন্দোলনের তীব্রতা বাড়তে শুরু করে। ওয়াহাবি আন্দোলন, রুম্পা বিদ্রোহ, বার্মিজ আন্দোলন, মপ্লাহ বিদ্রোহ, খিলাফত আন্দোলন ইত্যাদি হয়ে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয়। বাংলা এই আন্দোলনে অগ্রণী হলেও দেশের অন্যত্র তার অভিঘাত পড়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই ব্রিটিশদের চোখে এই আন্দোলনকারীরা ছিল ঘৃণ্য অপরাধী। হয়ত সেই সময় যে ভারতবাসীরা ব্রিটিশদের সমর্থন করত, তাদের কাছেও এই বিদ্রোহীরা ছিল দুষ্কৃতি! সুতরাং দমন পীড়ন চলবে এ কথা বলা বাহুল্য। আর সেটা করতে গেলে আন্দামানের পেনাল সেটেলমেন্ট ছাড়া উপযুক্ত আর কী হতে পারে! সুতরাং পাঠাও এদের কালাপানির ওপারে, প্রয়োজনে পরিবারের লোকদেরকেও দণ্ড দাও। আন্দামানে সাজাপ্রাপ্ত এরকম ২৫৮ জন মপ্লাহ বিদ্রোহীকে চাষের জন্য জমি দেওয়া হল যাতে মূল ভূখণ্ড থেকে আসা তাদের পরিবারের ৪৬৮ জনের গ্রাসাচ্ছাদন হয়। আরও ২৭২ জন পুরুষ ও ৩১ জন মহিলা এলেন ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের কারাগার থেকে। মহিলারা নিজেদের পছন্দে বিয়ে করে এখানেই থেকে গেলেন। এভাবেই বাড়ছিল আন্দামানের তদানীন্তন জনসংখ্যা। ১৮৫৮ সালে দ্বিতীয় দফার সেটেলমেন্ট তৈরি হওয়ার তিন মাসের মধ্যে যেখানে ৭৭৩ জন বন্দিকে আনা হয়েছিল, সেলুলার জেল তৈরির আগে সেই সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬১০৬। অবশ্য এই সংখ্যার মধ্যে বন্দিদের পরিবারের সদস্যদেরও ধরা হচ্ছে।
ক্রমাগত রাজনৈতিক আন্দোলন বৃদ্ধি পাওয়ায় মূল ভূখণ্ডে যখন বন্দি সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, সাম্রাজ্যের ভিত একটু একটু করে নড়বড়ে হচ্ছে, তখনই ব্রিটিশরা বুঝতে পারে এমন একটি জেল তৈরি করা দরকার যেখানে রাষ্ট্রের চোখে দাগি বন্দিরা 'সলিটারি সেল'-এ অন্তত ছয় মাস নিঃসঙ্গ কাটাবে। তারপর তাদেরকে ধীরে ধীরে মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা হবে। আর এই দাগি অপরাধীরা অধিকাংশই হল রাজনৈতিক বন্দি, যাঁরা দেশ স্বাধীন করতে উঠে-পড়ে লেগেছে। সুতরাং দরকার একটি শক্তপোক্ত জেল দরকার হাতে বিপুল পরিমাণ রাজনৈতিক বন্দিদের আটকে রাখা যাবে। এই ভাবনা নিয়েই জেল তৈরির পরিকল্পনা চলছিল। খুব স্বাভাবিক ভাবেই আন্দামান ছিল তালিকার শীর্ষে। মাঝ সমুদ্রে ওরকম দ্বীপে রাজনৈতিক বন্দিদের পাঠানো হলে, মানসিকভাবে তাঁরা যেমন বিধ্বস্ত হবে, তেমনি মূল ভূখণ্ডের বিভিন্ন জেলে বসে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করতে পারবে না। আগেই কেরলের কুন্নুরে এক বিশেষ মিটিংয়ে ঠিক হয়েছিল সেলুলার জেল তৈরি করার। মোটামুটিভাবে তার গঠন, সেল সংখ্যা, সেলের মাপ ইত্যাদি ঠিক হয়েছিল। সুতরাং আন্দামানে একের পর এক বিশেষজ্ঞ দল আসা শুরু হল।
সেলুলার জেল তৈরির প্রথম ধাপে, পোর্ট ব্লেয়ারের তখনকার সুপারিনটেনডেন্ট কর্নেল থমাস ক্যাডেলকে বলা হল অন্তত ৬০০ সেল বিশিষ্ট সেলুলার জেলের প্ল্যান ও এস্টিমেট জমা দিতে। তদানীন্তন বাংলার সিভিল সার্ভিসের স্যার চার্লস জেমস লিয়াল এবং Inspector General of Jails সার্জন মেজর আলফ্রেড লেথব্রিজ আন্দামানে এলেন সব কিছু খুঁটিয়ে দেখতে। তাঁদের রিপোর্ট জমা পড়ল ২৬ এপ্রিল, ১৮৯০ তারিখে। তাঁরা এক জায়গায় উল্লেখ করলেন,
“Our next recommendation for making the earlier stages of imprisonment in the settlement more penal is that there should be a preliminary stage of separate confinement in cells. In the British and other European prison systems this preliminary stage has been worked for many years with the greatest success, and it is now considered essential in the management of jails where prisoners sentenced to penal servitude are first received...The close confinement of prisoners for long period in the Madras cellular jails and in one of the jails in Bengal (Midnapur) has shown that there is no reason to fear any deterioration in health either mentally or physically.”
এরপর ড. লেথব্রিজের সাহায্যে তৈরি করা হল প্ল্যান। সেই প্ল্যানে বলা হল জেল তৈরিতে দরকার ১২২০ ফিট বাই ৬৩০ ফিট জায়গার জমির কথা। জমির জন্য প্রথমে দেখা হল পাহাড়গাঁও ও প্রথারাপুরের এলাকা যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২০০ ফিট উঁচুতে। কর্নেল ক্যাডেল কিন্তু পছন্দ করলেন আটলান্টা পয়েন্টের ওপর আবারডিনের ৭৯০ ফিট বাই ২৩১ ফিট এলাকার অঞ্চলটি যার উচ্চতা ৭৫ মিটার। এইসব দেখাদেখির মাঝেই পোর্ট ব্লেয়ারের সুপারিনটেনডেন্ট পাল্টে গেল। কর্নেল এন এম হরসফর্ড এলেন পোর্ট ব্লেয়ারে নতুন সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে। জায়গা নিয়ে আপত্তি না তুললেও, তিনি তিন তলার বদলে পরিবর্তে দোতলা জেল তৈরির পক্ষপাতী ছিলেন। যুক্তি ছিল ভূমিকম্পে ভেঙে পড়তে পারে জেল।
কিন্তু বন্দি সংখ্যার কথা মাথায় রেখে নির্মাণকারীদের হাতেই ছাড়া হল বিষয়টি। ১৮৯৬ থেকে ১৯০৬ অবধি নির্মাণ চলল সেলুলার জেলের। নির্মাণ কাজে হাত লাগলেন বন্দিরাই! স্থানীয় পর্যায়ে যে সামগ্রী ব্যবহৃত হল তার মূল্য ছিল ২,৫৮,৭৬৪ টাকা। বন্দিদের শ্রমের মূল্য ছিল ১,৬২,৭০৮ টাকা। অন্যান্য নিয়ে নির্মাণ খরচ হয়েছিল মোট ৫,১৭,৩৫২ টাকা। তারার মতো গঠনের এই জেলে সাতটি উইং ছিল। প্রতিটিই ছিল তিনতলা। সেলের সংখ্যা ছিল ৬৯৮টি। ১৯৪১ সালের ভূমিকম্প ও জাপানি হানায় আজ টিকে রয়েছে ৩টি উইং। সেলের সংখ্যাও হয়েছে ২৯৬। এক একটি সেল ১৩.৫ ফিট লম্বা আর ৭.৫ ফিট চওড়া। প্রত্যেকটি সেলে রয়েছে মোটা লোহার দরজা। সেলের সামনে চার ফিট বারান্দা ধনুকাকৃতি দেওয়ালের সঙ্গে পোক্ত লোহার রেলিংয়ে আটকানো।
প্রত্যেক উইংয়ে কিন্তু সম পরিমাণ সেল ছিল না। এক ও দুই নম্বর উইংয়ে ছিল ১০৫ টি করে মোট ২১০ টি সেল। তিন নম্বর উইংয়ে সেলের সংখ্যা ১৫০। বাকিগুলিতে যথাক্রমে ৭৮, ৭২, ৬০ ও ১২৬ টি সেল। কোনও উইংয়ের সেল মুখোমুখি নয়। অর্থাৎ একটি উইংয়ের বারান্দা বা সেল থেকে অন্য উইংয়ের পেছন দেখা যাবে। সেলগুলিতে ৩ফিট চওড়া ও ১ফুট লম্বা যে গবাক্ষ রয়েছে সেটিও মেঝে থেকে নয় ফিট উঁচুতে। ফলে ওই ওত উঁচুর ছোট্ট ভেন্টিলেটর দিয়ে পেছনের উইংকে দেখা সম্ভব নয়। তারার মতো সাতটি উইং যে জায়গায় মিলেছে সেখানে তিনতলা সেন্ট্রাল টাওয়ার। সাতটি উইংয়ের করিডোর গোল হয়ে এক জায়গায় মিলেছে। প্রত্যেকটি করিডোর লোহার গেট দিয়ে আলাদাভাবে আটকানো। সেন্ট্রাল টাওয়ারে যেমন সশস্ত্র রক্ষী থাকত তেমনি ত্রিতল সাত উইংয়ের প্রতিটি তলায় একজন করে মোট ২১ জন প্রহরী পাহারা দিত। প্রতিটি উইংয়ের সামনের যে ফাঁকা জায়গা সেখানে কয়েদিদের কাজে লাগানো হত। নারকেল থেকে তেল বের করা ছিল মূল কাজ। ঘানিতে জুতে দেওয়া হত তাদের। সারাদিনে নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল উৎপাদন করতে হত। সেটা না পারলে জুটত অবর্ণনীয় অত্যাচার। অন্যান্য অমানবিক কাজ তো ছিলই। এই ফাঁকা জায়গাতেই রাখা থাকত বড় জলাধার। পাইপ দিয়ে নিচের সমুদ্র থেকে জল আনা হত। তবে পানের জন্য ছিল অন্য জল। দ্বিতীয়বার শৌচাগার যেতে চাইলে অনুমতি পাওয়া যেত না। পেট খারাপের সমস্যা হলে নারকীয় দশা হত বন্দীদের। প্রবল পরিশ্রমে শরীর খারাপ হলে ভাগ্যের হতে নিজেকে সঁপে দেওয়া ছাড়া কিছুই করবার ছিল না। কোনও প্রতিবাদে জুটত প্রবল প্রহার। সেটা যে কী অমানুষিক তা ভাবতেও শিউরে উঠতে হয়। এই প্রসঙ্গে সাভারকারের স্মৃতিচারণ উল্লেখ করছি। তিনি জেলার কুখ্যাত ডেভিড বারির ভাষণের উল্লেখ করেছেন- Listen ye prisoners, in the Universe there is one God and he lives in heaven above but in Port Blair there are two: one the God of Heaven and another the God of Earth- that is myself. The God of Heaven will reward you when you go above but this God of Port Blair will reward you here and now. So ye prisoners behave well. You may complain to any superior against me, my word shall prevail; I hold my own.
একটি উইংয়ের সামনে এক পাশে তৈরি করা হয়েছিল ফাঁসি ঘর। তার সামনে রাখা হয়েছিল টাব। এই টাবেই ফাঁসির আগে কয়েদিদের স্নান করানো হত। ফাঁসি ঘরে তিনজনকে একসঙ্গে ঝোলানোর ব্যবস্থা ছিল। চরম অত্যাচারে উল্লাসকর দত্ত পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। পঁচিশ বছরের তরতাজা ইন্দুভূষণ রায় গায়ের জামা কাপড় পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন। পন্ডিত রামরক্ষা অনশনে বসে শহীদ হন। সর্দার ভান সিংকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। অনশনরত মহাবীর সিং, মোহিত মৈত্র ও মোহন কিশোর নমদাসকে জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা করার সময় খাবার আটকে তাঁরা মারা যান। উদাহরণ কত দেব!
সেলুলার জেলের প্রথম ব্যাচে মহারাজা নামের জাহাজে চাপিয়ে ১৯০৯ সালে আনা হয়েছিল বারীন্দ্র কুমার ঘোষ, উল্লাসকর দত্ত, উপেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, হেমচন্দ্র দাস, , ইন্দুভূষণ রায়, বিভূতিভূষণ সরকার, হৃষিকেশ কাঞ্জিলাল, সুধীর কুমার সরকার, অবিনাশ চন্দ্র ভট্টাচার্য এবং বীরেন্দ্র চন্দ্র সেনকে। এঁদের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কেননা ব্রিটিশ শক্তির কাছে এঁরা ছিলেন মারাত্মক দাগি। পরবর্তীতে নাসিক ষড়যন্ত্র মামলা(১৯০৯), খুলনা ষড়যন্ত্র মামলা (১৯১০), দ্বিতীয় নাসিক ষড়যন্ত্র মামলা (১৯১১), রাজিন্দরপুর ট্রেন ডাকাতি কেস (১৯১১), গদর পার্টি বিদ্রোহ (১৯১৪), শিবপুর-নদিয়া কেস (১৯১৫), বিধানসভা বোমা মামলা (১৯২৯), লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা (১৯২৯-৩০), চট্টগ্রাম বিদ্রোহ (১৯৩০), ওয়াটসন গুলি মামলা (১৯৩২), বীরভূম ষড়যন্ত মামলা (১৯৩৩), মেদিনীপুর হত্যা মামলা (১৯৩৩) ইত্যাদি মামলায় দোষী সাব্যস্ত বহু সংগ্রামীর জায়গা হয়েছিল সেলুলার জেলে। এঁদের মধ্যে ছিলেন বিনায়ক দামোদর সাভারকার, গণেশ দামোদর সাভারকার, ননী গোপাল মুখার্জী, নন্দ কুমার, পুলিন বিহারি দাস, পৃথী সিং আজাদ, ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী, অনন্ত সিংহ, বটুকেশ্বর দত্ত, বাবা ভান সিং, শচীন্দ্রনাথ সান্যালের মতো মানুষরা।
নির্মাণের পর ১৯০৬ থেকে সেলুলার জেলের ইতিহাস ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে এগিয়েছে। একদিকে স্বাধীনতা সংগ্রামী সর্বহারা বিপ্লবীরা আর অন্যদিকে দুরন্ত অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসকরা। মূলত ১৯০৯-১৯১৪, ১৯১৬-১৯২০ ও ১৯৩২-১৯৩৮ এই তিন পর্যায়ে এই সংগ্রামীরা এখানে এসেছেন। তাঁরা নিজেরা যেমন কষ্ট সহ্য করেছেন, হাসিমুখে ফাঁসির দড়িতে মৃত্যু বরণ করেছেন, তেমনি ব্রিটিশদের ঝুঁকতে বাধ্য করেছেন। তাঁদের দুই বারের অনশন সমগ্র ভারতবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। দ্বিতীয়বার স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধিজির অনুরোধে তাঁরা অনশন তোলেন। তাঁদের লাঞ্ছনার কথা জেনে সারা দেশে এমন আলোড়ন সৃষ্টি হয় যে, শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশরা পিছু হটে। দফায় দফায় বন্দিদের মূল ভূখণ্ডের বিভিন্ন জেলে পাঠানোর কাজ শেষ হয় ১৯৩৮ সালে। বন্দিমুক্ত হয় সেলুলার জেল।
তবে ১৯৪২ সালে সেলুলার জেল সহ আন্দামান চলে যায় জাপানিদের হাতে। শুরু হয় অবিচারের আর এক ইতিহাস। ইংরেজদের চর সন্দেহে একের পর এক মানুষকে ঢোকানো হয় জেলে। চলে অকথ্য অত্যাচার। ১৯৪৩ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী তোজো আজাদ হিন্দ ফৌজের হাতে আন্দামানকে তুলে দেন। ২৯ ডিসেম্বর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আসেন আন্দামানে। জিমখানার মাঠে ৩০ ডিসেম্বর তিনি ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। ১৯৪৫ সালের ৭ অক্টোবর আবার ব্রিটিশরা আন্দামান দখল করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পতন হয় জাপানিদের। কিন্তু আর বেশিদিন ব্রিটিশরা আন্দামানকে নিজেদের দখলে রাখতে পারেনি। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট থেকে সারা দেশের সঙ্গে আন্দামানও স্বাধীন হয়।
স্বাধীনতার পর থেকেই সেলুলার জেলকে জাতীয় স্মারক তৈরির চেষ্টা চলে। Ex Andaman Political Prisoners Fraternity Circle এর সেই প্রচেষ্টা সফল হয় ১৯৬৩ সালে। সেলুলার জেলকে জাতীয় স্মারক ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয় না। ১৯৬৯ সালে ভারত সরকারের বিশেষজ্ঞ দল সেলুলার জেল পরিদর্শন করলেও লাভ হয়নি। ১৯৭৮ সালে Ex Andaman Political Prisoners Fraternity Circle তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি সঞ্জীব রেড্ডি ও প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইয়ের সঙ্গে দেখা করলে কাজ হয়। ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মাননীয় মোরারজি দেশাইয়ের উপস্থিতিতে সেলুলার জেল জাতীয় স্মারকের মর্যাদা পায়। আজকের সেলুলার জেলের মূল প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢুকে ডাইনে বাঁয়ে প্রদর্শনী কক্ষ। স্বাধীনতা আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে যাঁরা বন্দি ছিলেন তাঁদের সচিত্র পরিচয় রয়েছে বাম দিকের গ্যালারিতে। ডান দিকের গ্যালারিতে সেলুলার জেলের ইতিহাস, কয়েদিদের জন্য বরাদ্দ বিভিন্ন ধরণের শৃঙ্খল, পোষাক ইত্যাদি বহু কিছু প্রদর্শিত। গ্যালারি শেষ করে সামান্য এগোলে একদিকে অমর জ্যোতি, অন্যদিকে সেই প্রাচীন বৃক্ষ যা সেলুলার জেল নির্মাণের প্রথম দিন থেকে রয়েছে। পাশেই বহু চেয়ার পাতা রাতের 'সন এ লুমিয়ের' বা লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো'র জন্য। তার পর মূল জেলখানা যেখানে বন্দি থাকতেন কয়েদিরা। তবে অতীতের সেই সাতটি উইং আজ নেই। ১৯৪১ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্প আর জাপানি আক্রমণে ক্ষতি হয় বিভিন্ন উইংয়ের। বর্তমানে ১, ৬ আর ৭ নাম্বার উইংকে সংরক্ষিত করা হয়েছে। দুটি উইংয়ে গোবিন্দ বল্লভ পন্থ হাসপাতাল তৈরি করা হয়েছে।
শুভবুদ্ধিসম্পন্ন যে কোনও ভারতীয় আজ যখন সেলুলার জেলে পা দেন তখন বোধহয় তাদের সকলকেই একটি চিন্তা আচ্ছন্ন করে। এই কি সেই ভারতবর্ষ যার স্বাধীনতার জন্য কত সহস্র মানুষ প্রাণ দিলেন, দিনের পর দিন অকথ্য অত্যাচার সহ্য করলেন! জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় অন্ধ কারাগারে কাটালেন যে তরুণেরা তাঁদের সেদিনের স্বপ্নের কী প্রতিদান দিচ্ছি আমরা! বিশেষ করে আজ যদি বাংলার কথা ভাবি, তবে লজ্জায় মাথা হেঁট হয়। সেদিন সারা ভারতবর্ষকে যে প্রদেশ পথ দেখাত, আজ তার কী অবস্থা! এই কি সেই সোনার বাংলা যার জন্য নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন বাঙালিরা! সেলুলার জেলের তথ্য ঘটলেই দেখা যায় ভারতের অন্য প্রান্ত থেকে আসা বন্দিদের তুলনায় বাংলার প্রতিনিধিত্ব সবচেয়ে বেশি। সেদিন বাংলাই ছিল বিপ্লবের আঁতুরঘর। সেই বাংলাকে আজ আমরা এমন জায়গায় নিয়ে এসেছি যার জন্য করুণা হয়। কষ্ট হয় সারা দেশে বিভেদের বীজ নতুন করে বপন হতে দেখে। স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসব বর্ষ পার করে আজ দেশ যে পথে চলছে তাতে এই মহান মানুষদের আত্মবলিদান বিফলে গেছে বললে বোধহয় খুব একটা ভুল হবে না। আর আমাদের বাঙালিদের কথা? ধার নিচ্ছি সেই বিখ্যাত কথাটি- বাঙালিরা `ছিল`র দলে আছে, `আছে`র দলে নেই।
(তথ্য: লাইট অ্যান্ড সাউন্ড, সেলুলার জেল/ গ্যালারি, সেলুলার জেল/ amritmahotsav.nic.in /Cellular Jail by Priten Roy & Swapnesh Choudhury)
(স্বাধীনতার ৭৫ বছরে, অমৃত মহোৎসব বর্ষে, শ্রেষ্ঠ পাওনা স্বাধীনতা আন্দোলনের দুই কুখ্যাত কারাগার দর্শন। অনুভব করেছি মহানুভব সেই দেশপ্রেমীদের যাঁরা সেই কারাগার দুটিকে মুক্তিতীর্থে পরিণত করেছিলেন। বর্ষশেষে স্মরণ করছি আবারও তাঁদের। সঙ্গে দুই কিস্তিতে দুটি লেখা। আজকের লেখাটি ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে শ্রী কৃষ্ণ দেব সম্পাদিত `প্রবাহ তিস্তা তোর্ষা` পুজো সংখ্যায়।)











































