ধলীসিরিজ: মা/ শৌভিক রায়
গোধূলী বাজারে সানাই বাজে। সানাইয়ে বিদায়ের সুর।
আঅলকদাদার বাড়ি। বাড়ির সামনে বাগান। মস্ত। শীতে ফোটে অনেক ফুল। বর্ষায় বৃষ্টি। জল থৈ থৈ। সুপুরি গাছে লাল পোকা লাগে। কাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে দিই। ওরা পালায়। ছত্রভঙ্গ। পুচি আর আমি হাসি।
পুচি বন্ধু। সেজদার ছেলে। সেজদা অঙ্ক করান। বেসিক স্কুলে। রাগী। ভয় পাই।
রুমাদি ডাকে। ঘাম মুছিয়ে দেয়। রুমাদি দিদি। আমার দিদি নেই। আমার বোন নেই। রুমাদি বকে না।
কাকিমাও বকুনি দেয় না। কখনওই। কাকিমার খুব মায়া। কাকিমার গায়ে মা মা গন্ধ। কাকিমার রান্নায় নবান্ন। কাকিমা জোর করে খাইয়ে দেয়। কাকিমাকে ভালবাসি।
সামনেই রেল লাইন। ট্রেন যায়। খুব জোরে। একদিকে মাদারি রোড। ওভারব্রিজ। অন্যদিকে মিল রোডেও ওভারব্রিজ। মাঝে লাল পুল। লাল পুলে যাই। হাতে কাঁচা আম। এগিয়ে গেলে বাঁ হাতে নদী। আঁকাবাঁকা। শীতে কুল খাই। লাইনের ধারে গাছ আছে।
দূরে কুঞ্জনগর। ওখানে জঙ্গল। গণ্ডার-বাইসন-হাতি। দূর থেকে জঙ্গল দেখি। জঙ্গলের ওপারে পাহাড়। নীল। কখনও ধস নামে। ঘায়ের মতো লাগে। পাহাড়ের গায়ে।
তরুণদলের মাঠে আসি। ডাকবাংলো ওই মাঠে। পুরোনো। মাঠে সবাই খেলে। ঘুড়ি ওড়ায় টাবু। পাশে টিনা। ওর বোন। ছোট। দুই বিনুনি।
- সাপটানা দেখে আসি।
প্রণব বলে।
ভাঙা পার। অন্ধকার। বেত গাছ। ছমছম করে। চারদিক। ভয় লাগে না।
নদী তো মা। মা`কে ভয় কেন!
নদীর দিকে তাকাই। মায়ের মতো বয়ে চলে। মিশে যায় মুজনাইয়ে।
মা-ও মিশে যায় প্রবাহে। রক্তের।
বিপ্লব, পিনু, পুটন, বাপি, প্রণব। আমি। চুপচাপ।
ওপারে কেউ প্রদীপ জ্বালায়। মৃদু আলো। শঙ্খ বাজে।
আঁচল গলায়। চুল টানটান। কপালে সিঁদুর। চিনি না তাকে।
চিনিও আবার। মা। তুলসী তলায়। কার মা? মা তো সবার। মা কি কারও আলাদা হয় নাকি!
- বাড়ি চল।
বাপি বলে।
- মা ধূপ দিচ্ছে।
বিপ্লব বলে।
- চল ফিরি।
পিনু বলে।
ফিরি। সাপটানা বয়ে চলে। মুজনাইও।
মা`কে মনে পড়ে।
মা কি নদীতে এভাবেই মিশে থাকে! মা কি এভাবেই বয়ে চলে?
মা উত্তর দেয় না।
ছলছলাৎ নদীর ঢেউয়ের মতোই মা উত্তর দেয় না.....
(ছবি- মুজনাই)
সিরিজ- মা/ শৌভিক রায়
- অই যে দ্যাখোস ব্রিজ, অর অই পারেই আমাগো দ্যাশ...তরা যারে কস মাইতৃভূমি হেইডাই...
সামনে ব্রিজ। ভাঙা। নদী বিরাট। জল অনেক। পারে গরু। ছাগল। আমার পাশে দিদা। দিদার চোখে জল।
- আমারও একটা মা আছিল। বুঝছস ভাই? মায়ের কপালডা ভালা। জন্মাইছে যেইহানে, শরীল রাখছেও সেইহানে। আমিই পোড়া কপাইল্যা। ছিলাম মায়ের লগে। আইছি কুন হানে!
দিদার দিকে তাকাই। নদীর দিকে তাকাই। ব্রিজের দিকে তাকাই।
- অই পারে খুব বেশি কিছু ছিল না আমাগো। কিন্তু জানোস সুখ ছিল। এই হানেও নিজের বাড়ি। পোলাপান। তরা। নাতিরা। কিন্তু সুখ ক্যান জানি পাই না। হাজার হইলেও দ্যাশ দ্যাশই হয়ে রে।
দেশ কী দিদা? দেশ কাকে বলে? কেন ছেড়ে এলে দেশ নিজের? ভাবি। মনে মনে। প্রশ্ন করি না। দিদাকে। এখন প্রশ্ন নয়। প্রশ্নের সময় নয়। দিদার চোখে জল। মায়ের চোখ ছলছল।
- আমিও তো কতদূরে মা! সেই কোথায় দক্ষিণের বীরভূম আর কোথায় এই উত্তর! দেশ তো আমিও ছেড়েছি মা। হ্যাঁ ভিটে হারা হইনি। কিন্তু একবার যা ছেড়ে আসা যায়, সেটা কি আর মেলে ফের?
- মাইয়া মাইনসের ভাগ্য বৌমা, মাইয়া মাইনসের ভাগ্য! আইসা পড়লা বাঙাল ঘরে। আমাগো অনেক ভাষা জানোও না, বুঝোও না। ছাড়তে বুঝছ, মাইয়া মাইনসিকেই হয়।
- শান্ত হন মা। কী করবেন। দেশ যখন ভাগ হয়, নতুন রাষ্ট্র যখন মানচিত্রে আসে তখন তো মরে আমাদের মতোই মানুষেরা। শুধু ভিটেমাটি টাকাপয়সা ধনে জনে নয়, মনেপ্রাণে।
দেশ কী মা? রাষ্ট্র কী? কেন ছেড়ে এলে দক্ষিণের বীরভূম? কেন তোমাকেই ছাড়তে হল মা? ভাবি। প্রশ্ন করি না। এখন প্রশ্ন নয়। প্রশ্নের সময় নয়। মায়ের চোখে জল।
মা কাঁদে। দিদা কাঁদে। নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকি। অসমবয়সী দুই নারী। মাঝে এক বালক। ব্রিজের মতো। ভাঙা। ওই ব্রিজ জোড়া লাগে না। আলাদা রয়ে যায়।
এই দেশ ওই দেশ। বালককে ঘিরে জুড়ে যায় দুই নারী। ভিটেমাটি ছাড়া। দুজনেই। উদ্বাস্তু। দুজনেই।
দেশ খুঁজি। দিদার চোখের জলে দেশ আঁকি। মায়ের চোখের জলে রাষ্ট্র আঁকি।
আমার দেশ কোনটা মা? আমার রাষ্ট্র কোনটা দিদা? কোন কাঁটাতার আলাদা করছে আমাকে? কেন করছে?
উত্তর খুঁজি।
উত্তরকেই খুঁজি......
ছবি- ভোরাম পয়স্থি, গীতালদহ, দিনহাটা / এই ব্রিজ দিয়েই একসময় ট্রেন চলত আজকের এপার আর ওপার বাংলার মধ্যে
সিরিজ- মা/ শৌভিক রায়
জ ভাসান। মা চলে যাবেন। মা বলেছে।
মাসির বাড়ি এসেছি। রায়গঞ্জে। দেবীনগর। ছোট মাসি। ওখানে আমার তিন ভাই-বোন।
বাড়িটা বড়। উঠোন আছে। উঠোনে শিউলি গাছ। ফুল ঝরে। উঠোন সাদা হয়।
মাসির বাড়িতে ডাইনিং টেবিল। পা ঝুলিয়ে বসি। মজা লাগে।
আমাদের বাড়িতে পিঁড়ি। কাঠের। আমার পিঁড়িটা ছোট। মায়ের পিঁড়ি উঁচু। ওটা তোলা থাকে। মা এলে ওটা নেয়। বাবার পিঁড়ি বড়। শীতকালে বাবা রোদে পিঁড়ি নিয়ে বসে। তেল মাখে। গায়ে। ভাত খায়। রোদে পিঠ দিয়ে।
মাসির বাড়িতে পুকুর আছে। মা পুকুরে নামতে দেয় না। মায়ের ভয়। জলে। আমার নাকি ফাঁড়া আছে। আমি হাসি। মা`কে লুকিয়ে পুকুরে নামি। বুরু মা`কে বলে দেয়। বুরু ছোট বোন। মা ছুটে আসে। আমাকে তোলে। পুকুর থেকে। বকে। আমি হাসি। আমার পায়ে কাদা। গায়ে কাদা। মা ধুইয়ে দেয়। কল তলায় নিয়ে। কল তলাটা বড়। বাঁধানো। আমি হাসি। মা রেগে যায়। আমি সাঁতার জানি না। সাইকেল চালাতে জানি না। আমি কিছু শিখিনি। আমি জীবন বুঝি না। আমি মানুষ বুঝি না। মা বলে। আমার কষ্ট হয়। মায়ের জন্য। মায়ের চোখে জল। আমি চোখ মুছিয়ে দিই। মায়ের।
ভারত সেবাশ্রমের স্বামীজী দেন। ভিকস। উনি আমাদের আত্মীয়। মায়ের বৌদির দাদা। সংসার ওঁকে টানেনি। মা বলে। মাসি গল্প করে। উনি আমাকে ভালবাসেন। আমি যাই। ওঁর কাছে। আশ্রমে কত ফুল। কত গাছ। ফুলগুলোকে স্পর্শ করি। নরম ওদের পাপড়ি। ফুলের মতো নরম হতে হবে। স্বামীজী বলেন। বাবা যে আকাশের মতো উদার হতে বলেছে! উদার হলেই তো নরম হওয়া যায়। স্বামীজী আবার বলেন। মা, উদার কীভাবে হবো? মা, নরম কীভাবে হবো? মা?
রায়গঞ্জের আকাশে অনেক তারা। মাসির বাড়ির ছাদে উঠি। আমাদের কোয়ার্টার্সে ছাদ নেই। টিনের চাল। ছাদ ভাল লাগে। সিঁড়ি দিয়ে উঠি। মনা ওঠে। আমার সঙ্গে। মনা দিদি। ওকে দিদি বলি না। বাপু ওঠে। বাপু ভাই। বাপু কানে কম শোনে। বাপু রোগা। শুধু ভোগে। মাসি কাঁদে। বাপুর জন্য। সব মায়েরাই কাঁদে এরকম? মনা ঘাড় নাড়ে। মনা অনেক কিছু জানে। মনার অনেক বুদ্ধি। মনা আমাদের বোকা বানায়। এটা সেটা বলে।
আমি তারা দেখি। ওই তারাদের মাঝে ছোটকাকা আছে। ওই তারাদের মাঝে ছোট বুড়িদিদা আছে। ছোট বুড়িদিদা বাবার ছোট পিসি। বর নেই। ছেলে নেই। মেয়ে নেই। বাল্যবিধবা। মা বলেছে। যাদের বর স্বর্গে চলে যায় তারা নাকি বিধবা! বড় বুড়িদিদা ছাড়া ছোট বুড়িদিদার কেউ ছিল না। বড় বুড়িদিদার তাহলে কি কেউ নেই? কেন? আমি আছি তো। নীরদের ছেলে। ছোট ছেলে। বড় বুড়িদিদা আদর করে। ছোট বুড়িদিদাও করত। আকাশে ছোট বুড়িদিদাকে খুঁজি। আকাশে ছোট কাকাকে খুঁজি। ছোট কাকা তারা হয়ে গেছে। ছোট বুড়িদিদা তারা হয়ে গেছে। মা, মানুষ কেন তারা হয়ে যায়? তুমিও হবে? আমিও হব ? মুখে হাত চাপা দিচ্ছ কেন মা? কেন বলব না? তুমি তারা হলে কীভাবে ধরব তোমাকে? তার চেয়ে চলো দুজনেই তারা হয়ে যাই। পাশাপাশি থাকি। তোমাকে নিয়ে থাকি। মা, তোমার সঙ্গে থাকি!
মা, তোমার সঙ্গে থাকব...
মনা হাসে। বোকা বলে। আমাকে। বাপু শুনতে পায় না। তবু হাসে। বুরু এসে ছাদ থেকে নামতে বলে। রাত হয়েছে।
শিউলি ঝরার শব্দ পাই রাতে। শুকনো পাতায় শিউলি ঝরে। রাত কেমন জটিল। রহস্যে ভরা। ঘুম আসে না। জেগে থাকি। এপাশ ওপাশ করি। বিছানায়। মা ঘুমোয়। মায়ের হাত ধরি। মা টের পায় না। ধরেই থাকি। দূরে কোথাও পাখি ডাকে। নিশাচর। আমিও কি তাই?
এত ঘুম তবু কেন ঘুম নেই?
ঘুম কবে আসে মা? তারা হয়ে গেলে? আকাশে?
ছবি- কার্শিয়াং
সিরিজ- মা/ শৌভিক রায়

কোয়ার্টার্সের সামনে মাঠ। মাঠের শেষে তাল সুপুরি গাছ। ঝুরি নামে গাছ থেকে।
গাছের নিচে জঙ্গল। হলুদ রঙের শিয়ালকাঁটা ফুল।
ওপাশে ভাট। বুনো বুনো গন্ধ।
ফল ঝরে গাছ থেকে। কুড়িয়ে আনি। ঘরে রাখি। পচে যায়। দুদিন পর। ফেলে দিই। আবার কুড়োই।
বেশ খানিকটা দূরে ওদাল গাছ। একা। লাল ফুল ফুটে থাকে। থোকা থোকা। হাওয়া দিলে নড়ে। ফুল ঝরে।
শিমুল আছে আরও দূরে। লাল ফুল ঝেঁপে আসে তাতে। পাখিরা ঘিরে ধরে গাছ। কিচিরমিচির সারাদিন। ফল খায় ওরা। উড়ে যায় তাল সুপুরি আর ওদাল গাছে। ফিরে আসে আবার। উড়ে যায় তারপরেই। ফুল ঝরে পড়ে শিমুল থেকেও।
পলাশ ছিল। ফুলে ঢাকা। এখন ন্যাড়া। পুজোর জন্য সবাই নিয়ে গেছে ফুল। মা আনেনি। ফুল ছিঁড়তে নেই। মা বলে।
কীভাবে পুজো হবে মা তবে? গাছ নিজে দিলে। যেমন দেয় পাম তার ফল। ওদাল আর শিমুল দেয় ফুল। মাটিতে ফেলে দেয় নিজেরাই।
কুড়িয়ে আনা ফুলে পুজো হয় মা? পুজো হবে?
কেন হবে না? মাটিই তো আসল। মাটি থেকেই তো মূর্তি। তাতে প্রাণ দান। মাটিতে পরে থাকা ফুলেই তো পুজো তাই। বিশুদ্ধ।
মা বলে। আমি বুঝি না।
সকালে উঠি। চলে যাই ওভারব্রিজে। ওখান থেকে পাহাড় দেখা যায়। দেখা যায় গাছ। শিমুল, পলাশ, ওদাল, মাদার। লাল চারদিক।
আমার মন কেমন করে। মায়ের কথা মনে পড়ে। ফিরে আসি বাড়িতে। মা-কে ডাকি। মা-কে জড়িয়ে ধরি। মা চুলে বিলি কেটে দেয়। কপালে চুমু দেয়।
দাদা হাসে। হিংসের হাসি।
হাওয়া দেয় বড্ড। হু হু হাওয়া। সারাদিন। ঠাণ্ডা লাগে।
শীত ছেড়ে যাচ্ছে। বাতাসে ধুলো। কাশি হয়।
বাসক পাতার রস করে দেয় মা। আমাদের বাগানের বেড়া ওই গাছ দিয়েই। তেতো লাগে বড্ড। খেতে চাই না।
তেতো খেলেই ঠিক থাকে সব। কেন মা? চারদিকে মিষ্টি কত!
মিষ্টির স্বাদ বোঝা যায় তেতো খেলেই। জীবন মিষ্টি। তেতো তাই জরুরি।
মা বলে। আমি বুঝি না।
তবু খাই। তেতো। মিষ্টি পাব বলে।
আমাকে দেখ। কালো আমি। তেতো আমি।
তাই দূরে থাকে কেউ কেউ। ফর্সা খোঁজে। আলো খোঁজে।
কিন্তু আমাকে না দেখলে, বুঝত কি সে ফর্সার মানে? আলোর মানে? বুঝত কি মিষ্টি কাকে বলে?
মায়ের চোখে জল। চিকচিক করে। মুখে তবু হাসি। আমার ভয় হয়।
মা কি কিছু বলতে চায়? মা কি কিছু বোঝাতে চায়?
আমি বুঝি না। সত্যিই বুঝি না। .....
ছবি- ফালাকাটা
সিরিজ- মা/ শৌভিক রায়
অর্ঘ্য সেন গান গাইছেন। `....ও পারেতে উপবনে/ কত খেলা কত জনে / এ পারেতে ধু ধু মরু/ বারি বিনা রে/ কে যাবি পারে ওগো তোরা কে/ আমি তরী নিয়ে বসে আছি নদী কিনারে...`। বসবার ঘরে। রেকর্ড প্লেয়ারে। ছোট রেকর্ড। পঁয়তাল্লিশ আর পি এমে চলে। তেত্রিশে চলে বড় রেকর্ড। আটাত্তরের রেকর্ড এখন নাকি পাওয়া যায় না।
মা গলা মেলান। অর্ঘ্য সেনের সঙ্গে। আমি মায়ের গান শুনি। সোফায় বসে।
এই রেকর্ড প্লেয়ারটা পুরোনো। অটোমেটিক। নিজে নিজেই বন্ধ হয়ে যায়। আগেরটা বন্ধ করতে হত।
মা গান ভালবাসে। বাবা কিনে এনেছে। হরিশ পালের দোকান থেকে। রাজনগরে সেই দোকান। মস্ত বড়।
বাবা রেকর্ড কেনে। কলকাতায় গেলে। রাজনগরেও। আমাদের ওই বাড়ি যে শহরে, দোকান আছে সেখানেও।
কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায় যখন গান `আমি অকৃতী অধম বলেও তো কিছু কম করে মোরে দাওনি....` বাবার চোখ তখন ছলছল করে।
বাবারা কি কাঁদে? জানা নেই ঠিক।
কিন্তু অখিলবন্ধু ঘোষের `ও দয়াল বিচার করো...` শুনে বড্ড কষ্ট হয়।
আমার কান্না পায়। ছোটরা কি কাঁদে? গান শুনে?
গান না সুর? কান্না কীসে আসে মা?
প্রণব গান ভালবাসে। বাড়িতে আসে। দুজনে গান শুনি। পুটনও আসে। বাপিও। পিকু আসে কখনও। সবাই মিলে গান শুনি।
মানবেন্দ্র গান `পলাশ ফুলের মউ পিয়ে ওই বৌ-কথা-কও উঠল ডেকে`।
প্রণব গলা মেলায়। আমি গাইতে পারি না।
মিশনের রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে প্রণব গায় `পথ হারাবো বলে এবার পথে নেমেছি`।
বুক কেমন টনটন করে। পুটন হাত চেপে ধরে। শক্ত করে। বাপি চুপ হয়ে যায়।
মেঠো পথ চলে যায় সর্ষে ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে।
ফুলের গন্ধে নেশা লাগে। গানের সুরে নেশা লাগে। গানের কথায় নেশা লাগে।
রাতের বেলায় বারান্দায় বসি। রেকর্ড প্লেয়ার চলতে থাকে। সব্যসাচীর গলা শুনি। আবার হারায়ে যাই/ হেরি চারিধার, বৃষ্টি পড়ে অবিশ্রাম....`
সুর এখানেও। চুঁইয়ে চুঁইয়ে সেই সুর নামে অবিরত।
হাত বাড়াই। স্পর্শ করতে চাই। পারি না।
সুরহীন আমি। বড্ড।
আমার সুর কেন নেই, মা? কেন বাঁচি না সুরে?
সুর ছেড়ে কি বাঁচা যায়? মা ছাড়া কি সুর থাকে জীবনে?
(ভিডিও- সেই রেকর্ড প্লেয়ার)
মেলা এসেছে। শিল্প মেলা। ভ্রাম্যমাণ। বিএলআরও অফিসে মাঠে। নাগরদোলা। কথা বলা পুতুল। চিড়িয়াখানায় কুমির।
গান বাজে। হিন্দি। দুপুর থেকে। নাগরদোলা ঘোরে। বনবন করে।
প্রণব উঠতে ভয় পায়। আমি পাই না। পুটনকে নিয়ে উঠি। আট আনার টিকিট। চার পাক। লোক নেই। সাত পাক ঘোরে। উঁচুতে উঠি। অনেক। প্রণব ছোট্ট হয়ে যায়।
ওই দূরে মুজনাই। টাউন ক্লাবের মাঠ। অন্য দিকে। পুরোনো চৌপথি। পেছনে। পাখি মনে হয়। নিজেকে।
কথা বলা পুতুল হাত পা নাড়ে। টকটক কথা বলে। অঙ্ক করে দেয়। ইংরেজি বলে। মজার মজার কথা বলে। আমরা হাসি। গায়ে ঢলে পড়ি। কাঠগোলাপের গন্ধ ভাসে। বাতাসে। দুটো গাছ। টেরাবাঁকা। জড়িয়ে। একে অন্যকে। অফিসের সামনে।
উঁচু পিলার। ইঁটের। দেড় মানুষ সমান। তার ওপরে অফিস। কাঠের। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয়। অফিসে হাত টানা পাখা। লাল রঙের। বড় বড় ঘর। বাবুরা কাজ করে। অফিসের নিচে বহু মানুষ থাকে। ওদের বাড়ি নেই। ঘর নেই। দেশ নেই। গায়ে নোংরা। চুলে জট। ওরা উদ্বাস্তু। মা বলে। আমোদি ওদের একজন।
আমোদি কাজ করে। আমাদের বাড়িতে। ওর মেয়ে অমলা। ছোট। শুধু কাঁদে। মা মুড়ি দেয়। এনামেলের বাটিতে। অমলা খায়। পা ছড়িয়ে বসে। ওর খুব খিদে। আমোদিরও খুব খিদে। অমলার বাবা নেই। মরে গেছে। দাঙ্গায়। দাঙ্গা কী মা? দাঙ্গা কেন হয়? আমিও কি দাঙ্গা করব?
- চুপ! ও কথা বলতে নেই। মানুষ দাঙ্গা করে না। অমানুষ করে। অমানুষ মানে কিন্তু পশু নয়। পশুরা ভাল। অমানুষরা নয়। আর যা হোস, অমানুষ হোস না।
বিপ্লব কথা বলা পুতুল সাজে। ক্লাসে। বাপি প্রশ্ন করে। বিপ্লব উত্তর দেয়। পুতুলের মতো। নাকি সুরে। আমরা হাসি। মজা লাগে বড্ড।
রথীন হাঁটে। বেঁটে জোকারের মতো। সার্কাসে দেখেছিল। আমরা হাসি। মজা লাগে বড্ড।
পুলককাকুও হাসেন। ওদের প্রাইজ দেন। চকোলেট। পুলককাকু ক্লাস নেন। আমাদের। এলোকিউশন। সপ্তাহে একদিন।
আমি আবৃত্তি করি। প্রণব গান। পুটন স্পিচ দেয়। ঋত্বিক ছবি আঁকে।
মা বেছে দেয় কবিতা। যখন আসে। মা শোনে না। আমার আবৃত্তি। ব্লকের ফাংশনে নাম দিই। হিটস হয়। ফাইনালে যাই।
রাইচাঙায় অনুষ্ঠান হয়। থার্ড হই। মিলিদি সেকেন্ড। সুকুমারদা ফার্স্ট। আনন্দে ভাসি। প্রথম প্রাইজ।
বাড়ি ফিরি। বেণুদার সাইকেলে চেপে। চাঁদের আলোর বন্যায়। অনেক রাতে।
মা দরজা খোলে। প্রাইজ দেখাই। মা বুকে চেপে ধরে।
আমার অমলার কথা মনে হয়। অমলার বাবা নেই। অমলার মা আমোদি আছে। আমোদি কি অমলাকে কবিতা বেছে দেয়? আমোদি কি অমলাকে আবৃত্তি শেখায়?
জানতে চাই। মায়ের কাছে।
- তুই শেখাস। মানুষই মানুষকে শেখায়। অমানুষরা নয়.....
সমা ইন্টারভিউ দেবে। এই শহরের স্কুলে।
মা চায় এই শহরে থাকতে। বাবার কাছে। আমার কাছে। দাদার কাছে।
এই শহরের লোক চায় না। হয়ত।
মায়ের অভিজ্ঞতা অনেক। চাকরির। চব্বিশ বছরের।
অভিজ্ঞতার দাম অনেক। অভিজ্ঞতার নম্বর অনেক।
মায়ের চাকরি হবেই।
অসন্তোষ দানা বাঁধে। মিছিল হয়। স্লোগান ওঠে। বাবার বিরুদ্ধে। মায়ের বিরুদ্ধে।
- এই শহরে যখন আসি তখন কথা হয়েছি তোমার মা-কেও পরের সুযোগেই নিয়ে আসা হবে। হয়েছিল সুযোগ। কিন্তু তোমার দিদার কাছে সেই দিদিমণি এলেন। তাঁর চাকরিটার প্রয়োজন ছিল। তোমার দিদা অর্থাৎ আমার মায়ের কথা ফেলতে পারিনি। তোমার মা-কে না করেছিলাম। একই ভাবে আরও দুবার সুযোগ ছেড়েছি। কিন্তু আর তো পারছি না। তুমি জানো আমার শরীর....
বাবা বলে। ছাদের দিকে তাকিয়ে। বাবার মুখে কষ্ট। বাবার অপারেশন হয়েছে। কিছুদিন আগে। খাদ্যনালী অন্য দিকে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। আমি বাবার দিকে তাকাই। খারাপ লাগে। বুঝি না কী বলব। দরজায় ঢিল পড়ে। টিনের চালে ঢিল পড়ে। বাগানে ঢিল পড়ে। কেউ নোংরা কথা বলে। চিৎকার করে। রেগে উঠি। আক্রোশে। কিন্তু কিছু করতে পারি না। খারাপ লাগে। বুক মোচড়ায়। বাবা সিঁটিয়ে যায়। ভয় হয় না। রাগ হয়। অক্ষম রাগ।
কেউ কেউ আসেন। পাশে দাঁড়ান। মা ইন্টারভিউ দেন। মা এক নম্বরে থাকে। মা কাঁদে।
অনেক ফুল আসে। শিউলি গাছে। ছড়িয়ে থাকে। সকালবেলায়। মাটির ওপর। কালো মাটি। সাদা ফুল। বোঁটা কমলা।
- জীবন সাদা কালো। এই ফুল আর মাটির মতো। কিন্তু রং আছে তাতে। অল্প হলেও। এবার হয়ত সেই রং পাবো।
মা ফুল কুড়োয়। পরনে শাড়ি। সাদা। লাল পার। কপালে টিপ। লাল। বাবার মুখে হাসি। স্মিত। মায়ের মুখ লাজুক।
রাতের কালবৈশাখী থেমেছে। সকালের নরম আলো। গন্ধরাজ আর শিউলি সুবাস। ভেজা গন্ধ মাটির। বড্ড আরাম। শীতল যেমন।
বাবা স্কুলে যায়। মা স্কুলে যায়। একসঙ্গে।
আমি দেখি। ভাল লাগে। সুখ জেগে ওঠে। চোখে আরাম লাগে।
দূর থেকে কেউ বলে,
- রং আসছে রং। দেখবি কাল রাতের জলের দাগের মতো রংহীন রঙে কত রং.......
রং দেখি। চোখ মেলি।
সাদা কালো।
আর তার মাঝে রঙিন কিছু।
জীবন?
ছবি- হলদিয়া
সিরিজ- মা/ শৌভিক রায়
কা
গাজনের দল। লাল শালু পরা সন্ন্যাসী। লাল লাল চোখ। কপালে লাল টিপ। সিঁদুরের। ঢাক বাজে। ঢাকের সঙ্গে নাচে সব। বিড়বিড় মন্ত্র বলে। `পদ্মের ফুলে তুষ্ট আমার অমিয় সাগর/ ধুতরার ফুলে তুষ্ট আমার সন্ন্যাসী নাগর/ কালীদহে তুল্লাম ফুল জাহ্নবীতে ধুলাম/ গঙ্গাজলে শুদ্ধ ফুল গাজনে আনিলাম॥` আবার কেউ বলে, `স্বগোত্রং পরিত্যজ্য শিবগোত্রে প্রবিশয়।`
ইতিকাকুর দোকানের সামনে। গাজনের সং নাচে। ভিড় করে সবাই দেখে। আমিও দেখি। লুকিয়ে। মা জানে না। মা ভয় পায়। গাজন সাধুকে।
মায়ের ভয় দেখে সাধু হাসে। খলখল। বলে, `দেবগোত্রং পরিত্যজ্য স্বগোত্রে প্রবিশয়। দে মা ভিক্ষে দে। তোর মঙ্গল হবে। স্বামী সন্তান নিয়ে সুখে থাকবি। চড়কে ঘুরতে ঘুরতে তোর কথা বলব আমি। পিঠে বড়শি থাকবে। জিভে শলাকা ফুটবে। দে মা। ভিক্ষে দে। তোর মঙ্গল হবে।`
মা ভিক্ষে দেয়। তাড়াতাড়ি। আঁচল জড়ায়। গলায়। লাল শিমুল গাছ থেকে ঝরে। লাল রক্ত নামে শরীর বেয়ে। মায়ের কপালে লাল সিঁদুর। মা-কে শিব গৃহিণী মনে হয়। লাল পার শাড়ি। সাধুর দল গর্জন করে। গর্জন থেকে গাজন? সৃষ্টির মূলে এই গর্জন?
পয়লা বৈশাখ। আর কয়েকদিন পর। নতুন খাতা। হালখাতা। বাবা টাকা দেবে। দোকানে দোকানে যাব। নব পত্র। নব পঞ্জিকা। টাকা রাখব থালে। মিষ্টির প্যাকেট পাবো। ক্যালেন্ডার। নতুন। ক্যালেন্ডারের গন্ধ ভাল লাগে। খুব। ক্যালেন্ডারে লেখা থাকে `নববর্ষের সদর সম্ভাষণ গ্রহণ করুন`। কার্ড এসেছে মেলা। কোনও কোনও কার্ডে অগুরুর গন্ধ। চিকমিক চুমকি বসানো। হাতে লেগে যায়। বাবা বাকি রাখে না। তাও কার্ড পায়। বাবার সঙ্গে দোকানে যাই। সবাই আদর করে। নতুন জামা পরি। বেশি দামি নয়। পুজোয় দামি জামা। দামি জুতো। বৈশাখে কম কম। বাবা রেকর্ড চালায়। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। `এসো হে বৈশাখ....`
নতুন বাড়ি হবে। আমাদের। জায়গা কেনা হয়েছে। অনেকটা দূরে। কোয়ার্টার্স থেকে। শান্ত পাড়া। নির্জন। ছিমছাম। ফাঁকা ফাঁকা। বাড়ি হলে চলে যাব। মন খারাপ হয়। এই কোয়ার্টার্স। এই মাঠ। এই শিমুল আর কৃষ্ণচূড়া গাছ। লং জাম্পের পিট। মায়া বড়।
চালে উঠি। পেয়ারা গাছে বসে থাকি। ঘুঘু ডাকে একটানা। বিকেল নামে। দেরি ক`রে সন্ধ্যা হয়। আলো নেভে। জোনাকি জ্বলে সারা মাঠে। দিনের বেলা ওরা কোথায় যায়?
- মন খারাপ?
মা বলে।
হাসি। আমি। কিছু বলি না।
- হবেই তো। তোর তো এখানেই জন্ম। তবে ছেড়ে যেতে হয় সবই। একদিন। এক জায়গায় আটকে থাকলে হবে?
কিছু বলি না। চুপ করে থাকি।
- এটাই নিয়ম। আমরা চলে যাব। অন্য কেউ আসবে। তার হবে এই কোয়ার্টার্স। তারপর কোনও দিন দেখবি হয়ত বাড়িটাই নেই। কেউ ভেঙে ফেলেছে।
বুক কেঁপে ওঠে। আমার। মা কেন বলে এসব?
- বুঝবি আমার কথা। কোনও একদিন। ছেড়ে না গেলে, নতুন আসবে কীভাবে? ভেঙে না গেলে, সৃষ্টি হবে কীভাবে? এই বছরটাই ধর। এটা না শেষ হলে নতুন আসত? হালখাতা হত? তোর নতুন জামা কিনে দিতাম?
- তুমি যে ভয় পাও। গাজনের সাধু দেখে!
- সেটা স্বাভাবিক। একটা অভ্যাস ছাড়তে ভয় তো হয়। মন খারাপও হয়। আর সেসব যারা মনে করে তাদের দেখে মনে হয় এবার ছাড়তে হবে। ভয় পাই তাই। কিন্তু সাহায্য তো করি। করি না? নতুনকে আহ্বানও তো করি। মন খারাপ হোক তোর। পুরোনোর জন্য মন খারাপ না হওয়া খারাপ। কেননা অতীতের ওপরেই বর্তমান। কিন্তু পুরোনোকে ছাড়তে হয়। নতুনকে আঁকড়ে ধরতে হয়।
গাজনের ঢাকের আওয়াজ ভাসে। রাতেও। কান পেতে শুনি। বছর চলে যাচ্ছে। বছর আসছে।
ভোরবেলায় গা শিরশির করে। আলো ঢোকে ঘরে। নতুন সূর্য। আজকের।
আগামীর?
আগামী বলে কিছু হয় না। সব আগামী আজ হয়ে যায়।
থেকে যায় গতকাল শুধু।
* ছবি- শাখাম
সিরিজ- মা/ শৌভিক রায়
ট্রেনের চাকার শব্দ। ব্রিজের ওপর। বিকট। ঘুম জড়ানো চোখ। খুলতে আর চায় না।
মা ধাক্কা দিতেন।
- ওঠ ওঠ।
উঠব কী! ঘুম যে আমার বড্ড। শুধু ঘুম?
সব কিছুই বড্ড। খিদে। খেলা। পড়াশোনা? না না। সেটি বাদ।
- ছেলের ঘুম দেখেছ? ওঠ। দক্ষিণেশ্বর মন্দির তো। গঙ্গা পেরোচ্ছি। প্রণাম কর।
কাকে প্রণাম করব মা?
- উফফ। মা কে। ওই দ্যাখ মন্দির। রামকৃষ্ণদেব পুজো করতেন এখানে। প্রণাম কর শিগগির।
বুঝে না বুঝে প্রণাম। আকাশের গায়ে আঁকা মন্দির। পাশে গঙ্গা। জল টলটল।
- কলকাতা চলে এলো প্রায়। এরপর বরানগর। দমদম। তারপরেই শেয়ালদা। ঘুমিও না আর।
বাবার গলা কানে আসত।
ধোঁয়া ধোঁয়া চারদিক। উঁচু উঁচু বাড়ি। গা ঘেঁষাঘেষি সব। এঁকেবেঁকে ট্রেন ঢুকত শেয়ালদায়।
প্রথম কবে গেছি দক্ষিণেশ্বর? মনে পড়ে না। আমাদের প্রথম কোনও কিছুই আসলে মনে থাকে না- হাঁটা, বলা, শেখা....। বোধহয় মায়ের জন্য।
তার কাছেই তো সব শেখা। তার কাছেই তো থাকা। সারা জীবন ধরে। মায়ের কাছে আবার প্রথম বা শেষ কী! সবই চিরদিনের।
তাই ওসব হিসেব বাদ। যতবার যাই মায়ের কাছেই ফিরি। কবে প্রথম গেছি, কতবার গেছি এসব ভেবে লাভ!
তবে একটা কথা। মা অন্য রূপেও আছেন কাছে। আর একটি জায়গায়। সেটা জানি। কিন্তু মা ডাকে না সেখানে।
গত সন্ধেয় সে ডাক এলো। কসবার আদ্যাশক্তি কালী মন্দিরে তখন সন্ধ্যারতি। মা চাইলেন আদ্যাপীঠে যাই। সকালে তাই আদ্যাপীঠে। তার আগে দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরে।
শুধু মা কে ভালবাসি। মায়ের কাছে আসি। জগৎ জননী মা তো আমার। কতভাবেই না কাছে থাকেন।
মা ঈশ্বর হয়ে গেলে স্পর্শ করে জীবন। সেই স্পর্শে মায়ের স্নেহ। আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখা।
মায়ের কাছে এটাই তো পাওয়া....
* ছবি: দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির ও আদ্যাপীঠ
পড়তে বসেছি। বড় ঘরে। এই ঘরেই থাকি। এখানে এলে। সিঠাণ্ডায় জুবুথুবু। চাদরের তলায় হাত। হাত বাড়ালেই চাঁদ ধরা যাবে। চা বাগানের মাথায়। হাতে ট্রফি। থার্ড প্রাইজ।
ফুলকপির ক্ষেত। গন্ধ ভাসে। বাতাসে। হিম ভাসে। সাইকেলে হাওয়া লাগে।
সুকুমারদা ফার্স্ট। মিলিদি সেকেন্ড। আবৃত্তিতে। পুরাতন ভৃত্য।
উড়ে উড়ে ফিরি। বেণুদার সাইকেলে। শুনশান চারধার। ক্যাঁচকোচ চাকার আওয়াজ।
ফটফটে সাদা চারধার। কুয়াশা জড়ানো। লম্বা চাদরের মতো। ঢেকে রেখেছে হরিতকি গাছ। শিরীষের মাথায় মেঘ যেন।
শিশির নেই। ঝরবে ভোর রাতে। আওয়াজ হবে। টিনের চালে। কাঁথা টানব। গায়ে। নকশি কাঁথা। মায়ের তৈরি। ওম পাবো। মায়ের।
বড্ড আনন্দ। বড় প্রতিযোগিতা। বড়দের গ্ৰুপ। বড় কবিতা। প্রাইজ তবু। বড়দের মাঝে।
বেণুদা প্রাইজ পায়নি। তাও নিয়ে চলে। সাইকেলে। হ্যান্ডেলে বসেছি। ডাবল ক্যারি। প্যাডেল ঘোরে। সাইকেল এগোয়।
ফুলকপির পাশে বেগুন। এত গাঢ় কালো দেখায়। তিরতির করে কালো জল। ছোট নদীর।
ডিম খেতে ইচ্ছে হয়। হাঁসের। হলুদ কুসুম। বড় বড় আলু। কষকষে ঝোল। হাপুস হুপুস। মা রাঁধে।
মা কোথায়! বাবা দরজা খোলে। বেড়ে রাখা ভাত। ঠাণ্ডায় নেতানো। ঠাণ্ডা ডাল। ঠাণ্ডা সবজি। ঠাণ্ডা ঢ্যাঁড়স সেদ্ধ। ডিম হয় না। দিদা ডিম খায় না। দিদা বৈষ্ণব। মালা জপে। তিলক কাটে। দিদা ঘুমোয়। ভাত খাই। প্রাইজ পাশে রাখি। ভাল লাগে।
মা আসে। সপ্তাহ শেষে। ট্রফি দেখে। কপালে চুমু দেয়। চিঠি লেখে।
`....ছোট ছেলে আবৃত্তিতে প্রাইজ পেয়েছে। ব্লকের প্রতিযোগিতায়। আমি খুব খুশি হয়েছি। বড়দের সঙ্গে ও পারবে ভাবিনি কখনও। আমার তো এটুকুতেই আনন্দ। এই কালো মেয়ের কপালে ঈশ্বর এরকম আনন্দ দেবেন কল্পনাতেও ছিল না। ঠিক বলেছি কিনা বলো দাদা। তুমি তো সব জানো। সংসারে এই ছেলে দুটোর মুখ চেয়েই টিকে আছি। তা না হলে তোমার হাত ধরে ভাই-বোনে কোথাও চলে যেতাম!.....দেখো কাণ্ড! তোমাকেও দলে টানছি। আর বলো কেমন আছো। বৌদি কুশল তো? গোপা লিপি? সৰু আর কুন্তু? অনেকদিন দেখি না ওদের। একবার তো এলেও পারো। আমার তো যাওয়াই হয় না সবদিক সামলে। মা`কে দেখতে ইচ্ছে করে। ভাবছি শীতের ছুটিতে যদি একবার যেতে পারি। কাটিহারে ঠাণ্ডা পড়লেও এদিকের মতো নয়। দেখি তোমার জামাইকে বলে.....`
মায়েরও ইচ্ছে হয়। মা`কে দেখতে। অবাক লাগে আমার। মায়ের দিকে তাকাই। টলটল করছে কি জল? মায়ের চোখে?
তাকিয়ে থাকি। বুঝতে চেষ্টা করি। বুঝি না।
মায়েদের বোঝা যায় না। কেউ বোঝে না।
শীত জড়িয়ে আসে শরীরে। কাঁথা টেনে নিই। নকশি কাঁথা। মায়ের তৈরি। মায়ের ওম।
উষ্ণ হই। আরাম লাগে। চোখ বন্ধ হয়ে আসে।
ঘুমিয়ে পড়ি। ব্লকের প্রতিযোগিতা...কবিতা...প্রাইজ...ফুলকপির ক্ষেত...চাঁদের আলো....
ঘুম নামে। সাদা চোখে। কালো ঘুম। জ্বলজ্বল করে মা শুধু। মনে পড়ে মায়ের চিঠি.....
ছবি- চা-বাগান, আপার ফাগু
রিজ:খিচুড়ি। মুসুর ডালের। ডুম ডুম পেঁয়াজ তাতে। রসুন কোয়া। দু`একটা। কাঁসার বাটি। মাঝারি। ভর্তি সেটা।
- খেয়ে নে। পুরোটা।
মাধ্যমিক পরীক্ষা। দশটা থেকে একটা। দুটো থেকে পাঁচটা। মার্চ মাস। সকাল রাতে ঠাণ্ডা। হালকা। দিনে গরম। খুব নয়।
বাড়ি নতুন। অনেক দূরে। সাইকেল চালিয়ে আসি। পরীক্ষা দিতে। খিদে পায়। দুপুরে।
বাণী কাকিমার কাছে খাই। দুপুরে।
কৌশিক মিষ্টি খায়। ওর বাবা আসেন। সঙ্গে মা। গোপাল করের দোকানে। ডিমের মতো দেখতে ছানাবড়া। মাঝখানটা হলুদ। কৌশিকের বাবা কিনে দেন না। পরীক্ষার সময় ডিম খেতে নেই। নম্বর তবে ডিমের মতো হবে। গোল।
প্রণব বাড়ি যায়। পুটন। বাপিও। ওদের মা খেতে দেন।
আমার মা স্কুলে। পরীক্ষার ডিউটিতে।
বাণী কাকিমা আমার মা। আর এক।
আগের বেঞ্চে পুচি। ওকে অঙ্ক জিজ্ঞাসা করি। ইংরেজি বলে দিই।
আড়ি ছিল। পুচির সঙ্গে। ভাব হয়েছে। আবার।
ব্যথা করে। হাতে। বিকেলের দিকে টান ধরে। আঙুলে। বড় বড় উত্তর। লিখতে হয় অনেক। মাঝে একদিন গ্যাপ। তারপর আবার। পরীক্ষা।
অঙ্ক সব শেষে। একবেলা। বাণী কাকিমা ছাড়ে না। খিচুড়ি দেয়। বাসি। বাসি খিচুড়ি ভালবাসি। ঠাণ্ডা। মুসুর ডালের। ডুম ডুম পেঁয়াজ। রসুন কোয়া। গরম বেগুন ভাজা। তেলতেলে। হাপুস হুপুস খাই। খিদে পায় খুব।
- খিদের বয়স। খাবেই তো দিদি। খাক....
কাকিমা বলে। মা হাসে। মা এসেছে। বাণী কাকিমার বাড়ি।
দৌড়ে যাই। পুটন ডাকি। বাপিকে ডাকি। প্রণব আসে। সিনেমা দেখতে যাই। পুটনের বাবা ম্যানেজার। টিকিট লাগে না। সিট হাতড়ে বসি। অন্ধকারে।
উত্তমকুমার হাসেন। আমরাও হাসি। গড়িয়ে পড়ি। পুটন মিঠুনকে ভালবাসে। প্রণব উত্তমকুমারকে। বাপি? আমি? জানি না....
পরীক্ষা শেষ। মাধ্যমিক।
- জীবনের শুরু এবার।
মা বলে। চারজনকে। আমাদেরকে।
বুঝি না। জীবন তো শুরু কবেই হয়েছে। তবু কেন মা বলে!
- বড় হয়ে গেলি তোরা।
বড় হলাম কি? বড় কি হওয়া যায়? আদৌ?
তবু কেন মা বলে? কেন বলে মা?
বাপির চোখ ছলছল করে। পুটন তাকিয়ে থাকে। প্রণব চুপ।
কেন বলো মা? কেন বলো? বড় হতে চেয়েছি কি?
চাইনি। কেউ চাইনি।
বড় হলেই বাঁধন। আষ্টেপৃষ্ঠে। জানি।
তবু বড় হতে হয়। মা.....বড় হতে হয়.....
ট্রেনের চাকার শব্দ। ব্রিজের ওপর। বিকট। ঘুম জড়ানো চোখ। খুলতে আর চায় না।
মা ধাক্কা দিতেন।
- ওঠ ওঠ।
উঠব কী! ঘুম যে আমার বড্ড। শুধু ঘুম?
সব কিছুই বড্ড। খিদে। খেলা। পড়াশোনা? না না। সেটি বাদ।
- ছেলের ঘুম দেখেছ? ওঠ। দক্ষিণেশ্বর মন্দির তো। গঙ্গা পেরোচ্ছি। প্রণাম কর।
কাকে প্রণাম করব মা?
- উফফ। মা কে। ওই দ্যাখ মন্দির। রামকৃষ্ণদেব পুজো করতেন এখানে। প্রণাম কর শিগগির।
বুঝে না বুঝে প্রণাম। আকাশের গায়ে আঁকা মন্দির। পাশে গঙ্গা। জল টলটল।
- কলকাতা চলে এলো প্রায়। এরপর বরানগর। দমদম। তারপরেই শেয়ালদা। ঘুমিও না আর।
বাবার গলা কানে আসত।
ধোঁয়া ধোঁয়া চারদিক। উঁচু উঁচু বাড়ি। গা ঘেঁষাঘেষি সব। এঁকেবেঁকে ট্রেন ঢুকত শেয়ালদায়।
প্রথম কবে গেছি দক্ষিণেশ্বর? মনে পড়ে না। আমাদের প্রথম কোনও কিছুই আসলে মনে থাকে না- হাঁটা, বলা, শেখা....। বোধহয় মায়ের জন্য।
তার কাছেই তো সব শেখা। তার কাছেই তো থাকা। সারা জীবন ধরে। মায়ের কাছে আবার প্রথম বা শেষ কী! সবই চিরদিনের।
তাই ওসব হিসেব বাদ। যতবার যাই মায়ের কাছেই ফিরি। কবে প্রথম গেছি, কতবার গেছি এসব ভেবে লাভ!
তবে একটা কথা। মা অন্য রূপেও আছেন কাছে। আর একটি জায়গায়। সেটা জানি। কিন্তু মা ডাকে না সেখানে।
গত সন্ধেয় সে ডাক এলো। কসবার আদ্যাশক্তি কালী মন্দিরে তখন সন্ধ্যারতি। মা চাইলেন আদ্যাপীঠে যাই। সকালে তাই আদ্যাপীঠে। তার আগে দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরে।
শুধু মা কে ভালবাসি। মায়ের কাছে আসি। জগৎ জননী মা তো আমার। কতভাবেই না কাছে থাকেন।
মা ঈশ্বর হয়ে গেলে স্পর্শ করে জীবন। সেই স্পর্শে মায়ের স্নেহ। আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখা।
মায়ের কাছে এটাই তো পাওয়া....
ছবি: দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির ও আদ্যাপীঠ
ছবি: শৌভিক রায়
শৌভিক রায়
ট্রেনের চাকার শব্দ। ব্রিজের ওপর। বিকট। ঘুম জড়ানো চোখ। খুলতে আর চায় না।
মা ধাক্কা দিতেন।
- ওঠ ওঠ।
উঠব কী! ঘুম যে আমার বড্ড। শুধু ঘুম?
সব কিছুই বড্ড। খিদে। খেলা। পড়াশোনা? না না। সেটি বাদ।
- ছেলের ঘুম দেখেছ? ওঠ। দক্ষিণেশ্বর মন্দির তো। গঙ্গা পেরোচ্ছি। প্রণাম কর।
কাকে প্রণাম করব মা?
- উফফ। মা কে। ওই দ্যাখ মন্দির। রামকৃষ্ণদেব পুজো করতেন এখানে। প্রণাম কর শিগগির।
বুঝে না বুঝে প্রণাম। আকাশের গায়ে আঁকা মন্দির। পাশে গঙ্গা। জল টলটল।
- কলকাতা চলে এলো প্রায়। এরপর বরানগর। দমদম। তারপরেই শেয়ালদা। ঘুমিও না আর।
বাবার গলা কানে আসত।
ধোঁয়া ধোঁয়া চারদিক। উঁচু উঁচু বাড়ি। গা ঘেঁষাঘেষি সব। এঁকেবেঁকে ট্রেন ঢুকত শেয়ালদায়।
প্রথম কবে গেছি দক্ষিণেশ্বর? মনে পড়ে না। আমাদের প্রথম কোনও কিছুই আসলে মনে থাকে না- হাঁটা, বলা, শেখা....। বোধহয় মায়ের জন্য।
তার কাছেই তো সব শেখা। তার কাছেই তো থাকা। সারা জীবন ধরে। মায়ের কাছে আবার প্রথম বা শেষ কী! সবই চিরদিনের।
তাই ওসব হিসেব বাদ। যতবার যাই মায়ের কাছেই ফিরি। কবে প্রথম গেছি, কতবার গেছি এসব ভেবে লাভ!
তবে একটা কথা। মা অন্য রূপেও আছেন কাছে। আর একটি জায়গায়। সেটা জানি। কিন্তু মা ডাকে না সেখানে।
গত সন্ধেয় সে ডাক এলো। কসবার আদ্যাশক্তি কালী মন্দিরে তখন সন্ধ্যারতি। মা চাইলেন আদ্যাপীঠে যাই। সকালে তাই আদ্যাপীঠে। তার আগে দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরে।
শুধু মা কে ভালবাসি। মায়ের কাছে আসি। জগৎ জননী মা তো আমার। কতভাবেই না কাছে থাকেন।
মা ঈশ্বর হয়ে গেলে স্পর্শ করে জীবন। সেই স্পর্শে মায়ের স্নেহ। আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখা।
মায়ের কাছে এটাই তো পাওয়া....
ছবি: দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির ও আদ্যাপীঠ
ছবি: শৌভিক রায়
বড় খাট। বাবা বসে আছে। পড়া দেখছে। আজ পড়তে হয়। না হলে মা রাগ করেন। মা বলেছে।
ছোট ঘরে বাবা থাকে। এই ঘরে মা, আমি, ঝিনি। দাদা ন কাকুর ঘরে। কাকুদের আলাদা আলাদা ঘর। পিঁড়ি পেতে রান্না ঘরে খাই। সবাই। দিদা দেখে। তৃপ্তি নিয়ে। মালা জপে।
ঝিনি পড়ে। আমার সঙ্গে। লেখে। স্লেটে। ট্যারাবেকা। মোছে। জল দিয়ে। জলের পোকা জলে যা, আমার স্লেট শুকিয়ে যা। বিড়বিড় করে। আমি হাসি। ঝিনি গলা জড়িয়ে ধরে।
মাংস রান্না হচ্ছে। মেজ কাকা নিয়ে এসেছে। বালিকা থেকে। কচি পাঁঠা। নলি হাড় ভাল লাগে। চুষি। আর এক টুকরো মেটে দেয় বড় কাকিমা। লুকিয়ে। বড় কাকিমার ছেলেমেয়ে নেই।
মা মণ্ডপে যায়। সঙ্গে তিন কাকিমা। সিঁদুর পরিয়ে দেয় মায়ের কপালে। সন্দেশ ঠেকায় মুখে। আমি বই ছুঁইয়ে নিই। মায়েকো। যেন নিয়ে যাচ্ছে। মা কে।
বুধানিদার রিকশায় চাপি। মায়ের সঙ্গে। মা চুপ। কথা বলে না। কলেজ হল্ট ছাড়িয়ে যাই। কোয়ালিদহের রাস্তা ধরি। শীত শীত লাগে। হিম পড়ে। দূরে বুড়ির গড়। বাঁশ ঝোপ। অন্ধকার। ভাঙাচোরা রাস্তা। চাঁদের আলোয় আবছায়া।
বুধানিদা