বালকের হায়দ্রাবাদ
শৌভিক রায়
(ভাগমতীর কাছে)
শহরের কি জেন্ডার থাকে? ম্যাস্কুইলিন বা ফেমিনিন? ঠিক জানা নেই তা।
তবে এটা জানি যে, নবাব বা সম্রাট বা মহারাজার কীর্তিকে অক্ষয় করতে চেয়ে, তাঁর নামে কোনও স্থান বা শহরের নাম রাখা রীতিমত একটা প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছিল এই দেশে! দস্তুর ছিল এটাই।
তাই কবি যতই শহরকে কল্লোলিনী তিলোত্তমা ভাবুন, মহিলাদের নামে শহর বা স্থাননামের সেরকম উদাহরণ নেই বললেই চলে! এটাই জানতাম। ভুল ভাঙল এই শহরে এসে। একই সঙ্গে জানলাম, শাজাহান বাদেও এদেশে আর এক প্রবল প্রেমিক ছিলেন। কুতুব শাহি বংশের সেই রোমান্টিক প্রেমিকের সেদিনের ভাবনাটা ঠিক কতটা বৈপ্লবিক ছিল সেটা কিন্তু রীতিমত গবেষণার বিষয় হতে পারে!
বলছি কুলি কুতুব শাহের কথা। বানজারা হিলসের সেদিনের নর্তকী, ভাগমতীর প্রেমে পড়েছিলেন মানুষটি। শাহি প্রেম! হতেই পারত অন্যরকম। কিন্তু না, ভাগমতীকে যথার্থ সম্মান দিয়ে বিয়ে করলেন সুলতান। যতটুকু জেনেছি তাতে দেখতে পাচ্ছি যে, একটিবারও ভাগমতীর ধর্ম পরিবর্তনের জন্য অনুরোধ করেন নি তিনি, জোরজার করা তো অনেক দূরের ব্যাপার! উল্টে সবাইকে চমক দিয়ে, নিজের প্রেমের নিদর্শন হিসেবে ভাগমতীর নামে শহরের নাম দিয়ে দিলেন ভাগ্যনগর! কিন্তু ওই যে, মেয়েদের মন.... দেবা না জানন্তি... ভাগমতী নিজেই বেছে নিলেন স্বামীর ধর্ম। নিলেন নতুন নাম- হায়দার মহল। কালক্রমে সেই নাম প্রতিষ্ঠা পেল। ভাগ্যনগর ধীরে ধীরে হয়ে উঠল হায়দ্রাবাদ, ভারতের একমাত্র শহর যার নাম এলো এক নারীর নাম থেকে।
দাঁড়ান দাঁড়ান, তর্কে আসবার আগে আরও কিছু কথা বলে রাখি। চারদিকে 'বাগ' বা বাগান ছিল বলে শহরের নাম ভাগনগর (বাগনগর) সে তত্ব জানি। জানি নবাব পুত্র হায়দারের থেকেও নাম হতে পারে হায়দ্রাবাদ। ঐতিহাসিক পাণ্ডুরঙা রেড্ডির কথাও জানি যে, তিনি ভাগমতীর গল্পটি মানেনই না। নামকরণের এরকম আরও দুই-চারটে তত্ব আমিও বলে দিতে পারব। কিন্তু সব তর্কের শেষেও বেছে নেব হায়দার মহলকে। বেছে নেব কুলি কুতুব শাহ আর ভাগমতীর ভালবাসাকে। কেননা আমার কাছে হায়দ্রাবাদ মানে তুফানি প্রেমের এমন এক স্থান, যা মানে না ধর্মের ভীরু প্রাচীর। যেখানে হাতে হাত ধরে চলে ইতিহাস আর আধুনিকতা, যেখানে চারমিনারের পাশের মক্কা মসজিদের আজান ছড়িয়ে পড়ে হাইটেক সিটির হাইরাইজে, যেখানে রেঞ্জ রোভার ০৬৬৬ নিয়ে গভীর রাতে আল্লু অর্জুন শহর শাসন করেন, যেখানে হুসেন সাগরের জলে ভেসে আসে প্যারাডাইসের বিরিয়ানির গন্ধ, যেখানে সালার জং মিউজিয়ামে গভীর বিস্ময় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কোনও এক বালক.....
(বে-জান পাথর সব)
'অর কুছ নেহি আতা সাব। বচপন সে ইসি কো দেখা, ইসি কো জানা। লকডাউন মে ইধার বৈঠা থা। কোই নেহি আয়া। সব চলা গয়া, সেভিংস ভি। উধার মে চল রহি হুঁ। আভি হালত থোরা আচ্ছা হ্যায়। ট্রাভেলার্স আ রহে হ্যায়। আপকো দেখ কে মালুম হোতা হ্যায়, আপ ইসকো বারে মে থোড়া বহুত জানতে হো....ফির ভি বিনতি হ্যায়...সোচিয়ে আগর হো সকে তো আপকা মেহেরবানি হোগা...`
মনে মনে বললাম ঘন্টা জানি `থোড়া বহুত`! ওই জানা সব্বাই জানে! টুরিস্টের জ্ঞান নিয়ে কি আর ট্র্যাভেলার হওয়া যায়!!
জ্ঞান বলতে তো এটুকুই যে, বিরাট এই দুর্গের নাম এসেছে যাদব দেবতা 'গোল্লাস' থেকে। তবে তেলেগু শব্দ `গোল্লা` আর 'কোন্ডা' দুর্গটির নামকরণের তথ্যটিও জানি। `গোল্লা`অর্থে মেষপালক আর 'কোন্ডা` অর্থে পাহাড়। অর্থাৎ মেষপালকের পাহাড়। এগারো কিমি পরিধির দুর্গপ্রাকারের ওপাশে চোখ রেখে, একবিংশ শতকের এই আধুনিক সময়ে, দেশের অন্যতম আধুনিক শহরের সেদিনের অবস্থাটা কল্পনা করতে অবশ্য খুব একটা বেগ পেতে হয় না। তবে সে কল্পনায় সাহায্য করে ১৫ থেকে ১৮ মিটার উঁচু ৫ কিমি দীর্ঘ দেওয়াল প্রাচীর, গ্রানাইট পাথরের ৮টি প্রবেশদ্বার, ৮৭টি বুরুজ সমৃদ্ধ বিরাট এই নির্মাণ। সত্যি বলতে চোখ টেরিয়ে গেছে দুর্গে প্রবেশ করেই!
ওয়ারাঙ্গলের কাকাতীয় (কুল দেবতা কাকাতি অর্থাৎ দুর্গা থেকে বংশের এই নাম) বংশের রাজা গণপতি ১২ শতকে মাটি দিয়ে এই দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। আরও ২০০ বছর পর দুর্গ চলে যায় বাহমনি শাসকদের হাতে। ১৩৪৬ থেকে ১৫১৮ পর্যন্ত দুর্গ ছিল তাদের দখলে। অবশেষে ১৫১৮ সালে বাহমনিদের প্রতিনিধি, পারস্য থেকে আসা, সুলতান কুলি কুতুব শাহ প্রতিষ্ঠা করেন কুতুব শাহি সাম্রাজ্যের। ইতিমধ্যে দুর্গের পরিবর্তন হয়েছে। মাটির বদলে পাথরে রূপান্তরিত হয়েছে দুর্গ। দীর্ঘ ১৭০ বছরের শাসনের পর কুতুব শাহির পতন হয় ১৬৮৭ সালে। দুর্গের কর্মী আবদুল্লা খান পানি মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের জন্য এক অন্ধকার রাতে খুলে দিয়েছিলেন দুর্গের দরজা। দীর্ঘ আট মাস ধরে দুর্গ অবরোধ করে আওরঙ্গজেব যা পারেন নি, ওই এক রাতেই তা সম্ভব হয়েছিল। 'ফতে দরওয়াজা' দিয়ে প্রবেশ করে দুর্দান্ত মোগল সেনারা কুতুব শাহির শেষ সুলতান আবুল হাসানকে পরাজিত করেছিল ওই অতর্কিত আক্রমণে।
দক্ষিণ ভারতের গ্রানাইট পাথরের পাহাড়চূড়ায় এই দুর্গ অবশ্যই দাক্ষিণাত্যের শান। তাবড় শাসকরা এই দুর্গের দখল নিতে চেয়েছেন নানা সময়ে। আসলে সেই সময়, সারা বিশ্বে ভারত ছিল একমাত্র হীরা-উৎপাদক দেশ। আর গোলকুন্ডার কাছে থাকা কোল্লুর খনি ছিল বিখ্যাত। সেই আমলে 'গোলকুন্ডা হীরা' বলে পরিচিত বিখ্যাত সব হীরা ছিল গোলকুন্ডার নিজস্ব সম্পদ। শিহরণ জাগে ভাবতে যে, কোহিনুর, হোপ, দরিয়া-ই-নূর, রিজেন্ট, ড্রেসডেন গ্রিন, অরলভ, নিজাম, জ্যাকব ইত্যাদি দুনিয়া কাঁপানো হীরা সবই ছিল গোলকুন্ডার সম্পত্তি। দুর্ভাগ্য, আজ সেসবের অনেকেই অন্য রাষ্ট্রের সম্পত্তি।
কী ছিল না দুর্গে! মন্দির, মসজিদ, টার্কিশ বাথ, তোপখানা, কারাকক্ষ, নাগিনা বাগ, জেনানা মহল,হারেম মহল, তানা শাহ কি গদি বা দরবার হল, মাটির নল ও পার্সিয়ান চাকার সাহায্যে ছাদের ওপর জল তুলে ঠান্ডা রাখবার ব্যবস্থা,, দরবার হল থেকে ৮কিমি দূরের গোসা মহলে যাওয়ার সুড়ঙ্গ পথ, রামদাসের কোঠা ও বন্দিঘর, হাবসি কামান....এ বলে আমাকে দেখ, ও বলে তাকে দেখতে!
ইতিমধ্যেই বালা হিসার গেট দিয়ে প্রবেশ করে নাসের (আমাদের সেই গাইড, যার কথা শুরুতে বলেছি) ফতে দরওয়াজায় হাততালি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে সেই আওয়াজ পৌঁছে গেছে ১২৮ মিটার উঁচু দরবার হলে। আক্কানা আর মাডান্না মন্ত্রীদ্বয়ের বাড়ির পাশ দিয়ে ৩৬০টি সিঁড়ি ভেঙে টুকটুক করে পৌঁছে গেছি ৪০০ ফুট উচ্চতায়, পাহাড়ের মাথায়, ১২ খিলান যুক্ত দরবার হলে। নাসের জানিয়েছে মন্দিরের নিচে থাকা মসজিদের মিনার দেখে দেখে নির্মিত হয়েছিল জগৎবিখ্যাত চারমিনার। জনশ্রুতি দুর্গ থেকে হায়দ্রাবাদ শহরের মাঝে অবস্থিত চারমিনার যাওয়ারও সুড়ঙ্গ পথ ছিল সেকালে। দেখে নিয়েছি তখনকার অস্ত্রসম্ভারও।ইউনেস্কোর ওয়ার্লড হেরিটেজ সম্মান পেয়েছে গোলকুন্ডা ২০১০ সালে। সন্ধেবেলায় লাইট এন্ড সাউন্ড-এর আসরও বসে দুর্গে।
দুর্গের ওপর থেকে বানজারা হিলস দেখতে দেখতে নাসের একটা কথা বলেছিল-`নজরিয়া আলগ হ`তে হ্যায় ভাইয়া। এক দিন যো শান থা আজ পাত্থর বন গয়া। যো দেখতা হ্যায় ও ইসি পাত্থর মে সব কুছ দেখতে হ্যায়। যিস কো দেখনা নেহি আতা ও কুছ ভি নেহি দিখতা, স্রিফ পাত্থর হি দেখতা !`
....চলে আসি দুর্গ থেকে। ভারতের বহু প্রান্তের দুর্গ দেখেছি। সেদিক থেকে হয়ত নতুন কিছু নয় গোলকুন্ডা। কিন্তু অস্বীকার করব না যে, গোলকুন্ডার মতো এতটা প্রভাবিত আর কেউ করতে পারেনি।
বে-জান পাথর যে এত প্রাণময় আর বাঙময় হতে পারে তা বোধহয় গোলকুন্ডা না এলে বুঝতে পারতাম না কখনই....
'কাল খেল মে হাম হো না হো
গর্দিস মে সিতারে রহেঙ্গে সদা...'
নির্বাক রাতের ওই নক্ষত্ররা সেদিন সাক্ষী ছিল। আজও সঙ্গী তারাই... মাটির ভেতরে শুয়ে যাঁরা, তাঁরাও ছিলেন নক্ষত্র। ধরিত্রী বুকে! কিন্তু আকাশের নক্ষত্রদের মতো সিতারা হতে পারেন বলেই মিশে গেছেন ধুলোর সঙ্গে। আর আজও সেই ধুলোতে মিশে যাচ্ছে সিতারাদের স্নিগ্ধ আলো।
দাঁড়িয়ে আছি কুতুব শাহি সমাধিক্ষেত্রে। আগ্রার তাজমহল, ঔরঙ্গাবাদের বিবি কে মকবারা, দিল্লির হুমায়ূনের সমাধি সহ বেশ কিছু নামীদামী সমাধি দেখবার সৌভাগ্য হয়েছে আগেই। কিন্তু এখানে এসে এবার সত্যি বড্ড বিষন্ন লাগছে। নিজের দিন শেষ হয়ে আসছে বলে? নাকি পরপর প্রিয়জনের চলে যাওয়ার অভিঘাত মনের গভীরে কোথাও প্রবল ক্ষত সৃষ্টি করেছে! জানিনা।
ফোন বেজে ওঠে। ওপারে রীনা, 'কোথায় ঘুরছ একা একা? এসো তাড়াতাড়ি!`ওর মন বুঝি। চকিতে ফিরে আসি বর্তমানে। দেখি সামনে সুলতান আব্দুল্লার দুই প্রিয় হাকিম নিজামুদ্দিন আহমেদ গিলানি আর আব্দুল জব্বার গিলানির স্মৃতি সৌধের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। ১৬৫১ সালে নির্মিত এই সৌধ দুটি কুতুব শাহি সমাধিতে স্থান পেলেও, মৃত ব্যক্তিরা কুতুব শাহি বংশের কেউ ছিলেন না। এই রাজকীয় সমাধিতে কুতুব শাহি বংশের সদস্য ছাড়া খুব সামান্য কয়েকজন স্থান পেয়েছেন।
একশ ছয় একর জমিতে কুতুব শাহি বংশের এই সমাধি ক্ষেত্রে রয়েছে ৪০টি সমাধি, ২৩টি মসজিদ, ৫টি সিঁড়ি বাঁধানো জলাশয়, একটি হামাম (স্নানক্ষেত্র), বাগান ইত্যাদি। ২০১৩ সালে আর্কিওলজিকাল বিভাগ, কুলী কুতুব শাহ আরবান ডেভেলপমেন্ট অথরিটি ও আগা খান ট্রাস্ট মাইল সম্মিলিতভাবে এই বিরাট সমাধিক্ষেত্রের পুনরুদ্ধার ও সাজসজ্জার দায়িত্ব নিয়েছে। স্যার দোরাবজি টাটা ট্রাস্টও এই কাজে তাদের সহযোগী। গোলকুন্ডা দুর্গ থেকে এর দূরত্ব মাত্র এক কিমি। একসময় দুর্গের ভেতরের ছিল ক্ষেত্রটি। সময়ের দাবি মেনে এখন দুর্গ আর সমাধি আলাদা হয়ে গেছে।
সমাধিক্ষেত্রের বেশিরভাগ সমাধিই কুতুব শাহি বংশের সদস্যরা নিজেদের জীবদ্দশায় তৈরী করেছিলেন। ইন্দো-পার্সিয়ান ও ইন্দো-ইসলামিক সাহিত্য ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক কুতুব শাহিদের সমাধিতেও রয়েছে সেই প্রতিফলন। তবে সমাধি গাত্রের জ্যামিতিক নকশায় বিদারের বাহমনি বংশের সমাধির প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। স্থানীয় গ্রানাইটে নির্মিত সমাধিগুলির অলংকরণ অসাধারণ। সৌধের আর্চ বারান্দা দিয়ে মূল কক্ষে প্রবেশ করে দেখা যায় সমাধি। সমাধিতেও রয়েছে নানা ধরণের নকশা। কুতুব শাহি বংশের সদস্যদের সমাধিগুলিকে আলাদা করে চেনা যায়, কেননা সেগুলির কিছু অংশ সোনার পাতে মোড়ানো।
সুলতান কুলী কুতুব মুলকের সমাধি ৩০মিটার উঁচু। ১৫৪৩ সালে নির্মিত এই সমাধিতে তাঁকে `বড়ে মালিক` বলে সম্বোধন করা হয়েছে। রয়েছে 'ছোটে মালিক' সুভানের সমাধিও। সুভান ছিলেন সুলতান কুলীর নাতি। তিনিও শায়িত বাবা জামশেদের কাছেই। তাঁদের দুজনের সমাধিতে অন্যান্য সমাধির মতো কোনও লেখা চোখে পড়ে না। ইব্রাহিমের সমাধি অসামান্য হলেও ৬৫মিটার টেরেস নিয়ে মহম্মদের সমাধিটি বোধহয় এখানকার সবচেয়ে নজরকাড়া সমাধি। রয়েছেন হায়াৎ বক্শি বেগম (মা সাহেবা বলে পরিচিত হায়াৎ ছিলেন আব্দুল্লার মা)। এখানেই চির নিদ্রায় শুয়ে আছেন প্রখ্যাত সুফি সাধক হুসেন শা ওয়ালি।
রীনা আবার তাগাদা দেয়। বেরিয়ে আসি সমাধিক্ষেত্র থেকে...হালকা হাওয়ায় বিরাট গাছগুলি থেকে শীতের শুকনো পাতা ঝরে পড়ে। মনে পড়ে ঔরঙ্গজেবের কথা। ইলোরার কাছে শায়িত মুঘল সাম্রাজ্যের বলদর্পী সেই মানুষটির সমাধিতে কোনও আচ্ছাদন নেই। সমাধির ওপর রয়েছে বনতুলসির গাছ।
ঔরঙ্গজেব আসতেন কুতুব শাহি সমাধিতে, নামাজ পড়তে। নিজের সমাধিতে আচ্ছাদন না রাখবার সিদ্ধান্ত কি তিনি এই বিরাট বিরাট সৌধ দেখেই নিয়েছিলেন সেদিন? বুঝেছিলেন প্রকৃতির চাইতে বড় আশ্রয় আর নেই? কে জানে!
আসলে `দুনিয়া ফনি হ্যায় ইসমে এক কাহানি হ্যায়...`আর এই 'কাহানি' যে বুঝেছে সে-ই ফকির হয়েছে...
লুম্বিনির গৌতম হুসেনের সঙ্গে
বানজারা হিলস থেকে কখন যে নেমে এসেছি বুঝতেই পারিনি। বুঝব কীভাবে? ট্রাফিক সিগনালে গাড়ি দাঁড়ালে যারা এসে হাত পাতছে, তাদেরকেই খাবারের প্যাকেট বিলোচ্ছে সন্তোষ। ইলেক্ট্রনিক্স নিয়ে পড়াশোনা করা সন্তোষ এয়ার পোর্ট আর কর্পোরেট সেক্টরের চাকরি ছেড়ে দিয়ে এখন ক্যাব চালায়। মিতভাষী, অত্যন্ত ভদ্র, বছর বত্রিশের ছেলেটির আজ উপোষ। সোমবার ও শংকরজীর পুজো করে। সকাল সকাল ওর স্ত্রী ঘুম থেকে উঠে তিরিশজনের মতো রান্না করে প্যাকেট বানিয়ে দেয়। সারাদিন ধরে গাড়ি চালানোর ফাঁকে ফাঁকে, নিরন্ন মানুষকে সন্তোষ সেই প্যাকেট বিলি করে। দক্ষিণ ভারতীয় ভাষার ফিল্মের প্রতি আমার দুর্বলতা জেনে সন্তোষ এতক্ষন ধরে আমাকে আল্লু অর্জুন, মহেশবাবু, বালাকৃষ্ণ প্রমুখের বাড়ি, পূজা হেগড়ে, অনুষ্কা শেঠি, রশ্মিকা মান্দানার এপার্টমেন্ট দেখিয়েছে। আল্লু অর্জুনের অফিস দেখানোর ফাঁকে ওঁর রেঞ্জ রোভার ৬৬৬ নম্বরের গাড়িটিও চিনিয়েছে। সব মিলে তাই সন্তোষে বুঁদ হয়েছিলাম। ঘোর কাটল নেকলেস রোডে এসে। সামনেই পেল্লায় হুসেন সাগর। এশিয়া মহাদেশের, মনুষ্যসৃষ্ট, অন্যতম বৃহৎ এই লেক দেখে চোখ সত্যিই ট্যারা হয়ে গেল!
ইতিহাস বলছে যে, এই লেক তৈরি হয়েছিল ১৫৬২ সালে। অসুস্থ হয়েছিলেন ইব্রাহিম কুলী কুতুব শাহ। আরোগ্য লাভের পর হুসেন শাহ ওয়ালির প্রতি কৃতজ্ঞতা বশত এই লেকের নির্মাণ হয়। হৃদপিণ্ডের আকারের এই বিরাট জলাশয়টি ৫.৭ বর্গকিমি বিস্তৃত। সর্বোচ্চ গভীরতা ৩২ফিট। মুসির উপনদীতে সৃষ্ট এই লেক সে আমল থেকে শুরু করে ১৯৩০ অবধি কৃষি ও পানীয় জলের কাজে লাগত। হায়দ্রাবাদ আর সেকেন্দ্রাবাদ- যমজ দুই শহরের মাঝে হুসেন সাগর যেন বেশ বড় একটি হাইফেন। আজ লেককে ঘিরে পূর্বে রয়েছে ইন্দিরা গান্ধি পার্ক, উত্তরে সানজিভাইয়া পার্ক, দক্ষিণে লুম্বিনী পার্ক আর পশ্চিমে সবুজের সমারোহে রাজভবন রোড ও নেকলেস রোড। লেকের মাঝে জিব্রাল্টার রকে ১৯৯২ সালে স্থাপিত হয়েছে ১৬ মিটার উচ্চতার ও ৩৫০ টন ওজনের গৌতম বুদ্ধের সুবিশাল মনোলিথিক মূর্তি। এই লেকের তীরেই মুঘল আর গোলকুন্ডার মধ্যে সন্ধি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। লেককে ঘিরে দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি রাধাকৃষ্ণণ, তেলেগু মহাভারত স্রষ্টা নান্নায়া, তেলেগু মহাভারতের অন্যতম কবি টিকান্না, তেলেগু রামায়ণ রচয়িতা মোল্লা, কবি শ্রী শ্রী, শিক্ষাবিদ সি আর রেড্ডি, কাকতীয়া বংশের রানি রুদ্রাম্মা, সংগীতজ্ঞ ও অভিনেতা বল্লরী রাঘব প্রমুখ সহ আরও বহু ঐতিহাসিক চরিত্রের মূর্তিগুলিও দৃষ্টিনন্দন। লেকের বোটিং যেমন মনকাড়া, তেমনি লুম্বিনী পার্কে ড্যানসিং ফাউন্টেনটি অনবদ্য। খুব কাছেই নীতিশ রায়ের নকশায়, এ হুডার হাতে তৈরি এন টি আর বাগানটিও চমৎকার। রয়েছে বিড়লা মন্দির। খানিকটা উঁচুতে বলে সেখান থেকে লেকের শোভা মন কেড়ে নেয়। অন্যদিকে প্রাচীন কাট্টা মাইসাম্মা মন্দিরে পুণ্যার্থীদের ভিড় লেগেই থাকে। বিশ্বের বৃহত্তম হৃদপিণ্ডাকার লেকের তকমা পাওয়া হুসেন সাগর নিজের রাজ্যপাট নিয়ে আট থেকে আশি সবারই বড্ড প্রিয়।
সন্ধে নামল হুসেন সাগরে। ভারতের বিরাট পতাকা ধীরে ধীরে নেমে এল নিচে। জিব্রাল্টার রকে বুদ্ধ মূর্তিতে শুরু হল আলোর খেলা।
একটা দুটো করে আলো জ্বলে উঠল লেকের চারধারে। দূরের বানজারা হিলস, জুবিলি হিলসও সেজে উঠল আলোর মালায়।
চা নিয়ে দেখি, প্যাকেটের গায়ে লেখা 'ডুয়ার্স টি'....কোইন্সিডেন্স? হয়ত বা!
আর সেই সমাপতনেই আমি, রীনা আর সন্তোষ এক হয়ে গেলাম হুসেন সাগর তীরে, কুতুব শাহির হায়দ্রাবাদে, বৈচিত্রের ভারতের এক প্রান্তে ....
শিল্প শিল্পের জন্য বনাম শিল্প জীবনের জন্য
'দুর্গম চেরেভু' পার হতেই জুবিলি হিলসের বৈভব চোখে পড়ল। অবশ্য তার আগে হাইটেক সিটির চোখধাঁধানো আধুনিকতায় বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে ভারতবর্ষে রয়েছি। বিত্ত আর বৈভবের সঙ্গে রুচি যোগ হয়ে যে কী কান্ড হতে পারে, সেটা চাক্ষুস না দেখলে বোঝা যাবে না। শিল্পরমমে ঢুকে অবশ্য সব কিছুই উধাও হয়ে গেল। এসে পড়লাম আদি ও অকৃত্রিম গ্রামে!
গন্ডগোল লাগছে তো? বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে তো? হওয়ারই কথা।
শহরের মধ্যে শহর থাকে, গ্রামের মধ্যে গ্রাম - এটা কমবেশি জানি সবাই। কিন্তু শহরের মধ্যে এমন একটি গ্রাম! তা বেশ বেশ। নির্মাতাদের কুর্নিশ, এমন ভাবনা ভাবার জন্য।
সবিস্তারেই বলি।
গন্তব্য হ`ল শিল্পরমম। মেগাসিটির হৈচৈ থেকে খানিকটা দূরে মাধপুর এলাকায় তৈরি করা হয়েছে এই গ্রামটি। শিল্প ও স্থাপত্যের আসর বসেছে এখানে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিল্পীরা এসে সাজিয়ে গেছেন এই গ্রামটিকে। কর্পোরেট দুনিয়ার দেখনদারির মাঝে ৬৫ একর জমি নিয়ে ১৯৯২ সালে নির্মিত কৃত্রিম গ্রামটিতে রয়েছে দুরন্ত সব শিল্পকর্ম। সঙ্গে নিজেদের সৃষ্ট জিনিসের পসরা নিয়ে বসেছেন স্থানীয় শিল্পীরা। চলছে বেচাকেনা। বছরভর লেগে আছে শিল্প-প্রদর্শনী সহ লোকসংস্কৃতি বিষয়ক নানা অনুষ্ঠান। শিল্পরমমের মিউজিয়ামে প্রমান সাইজের ১৫টি কুড়েঘর যেমন গ্রামীণ জীবনকে তুলে ধরেছে, তেমনি রক মিউজিয়ামে দেখা যায় আধুনিক স্থাপত্যের অদ্ভুত সব কাজ। রক মিউজিয়ামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শান্তিনিকেতনের সুব্রত বসুর নাম। এথনিক মোটিফ, টেরাকোটা নিয়ে সুসজ্জিত শিল্পরমম তেলেঙ্গানার শিল্পীদের উদ্দেশ্যে সত্যিকারের শ্রদ্ধাঞ্জলি। হস্তশিল্পের বিপুল সম্ভারের পাশাপাশি কাঞ্জিভরম, টাঙ্গাইল, সম্বলপুরি, কাশ্মীরি, ধর্মাভরম ইত্যাদি নানা ধরণের সিল্কের শাড়ি, সালোয়ার কামিজ ইত্যাদিও পাওয়া যায় এখানে। এম্পিথিয়েটারে প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় বসে কর্ণাটকি বা কুচিপুরি সংগীত বা নৃত্যের অনুষ্ঠান। সামান্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে পাওয়া যায় শিল্পীর তুলিতে নিজের প্রতিকৃতি। রয়েছে বোটিং বা গরুর গাড়িতে চেপে ঘুরে বেড়াবার ব্যবস্থাও।
কিন্তু দুর্গম চেরেভু? আসলে একটি লেক। তিরাশি একর এলাকা জুড়ে থাকা এই লেক একসময়ে মাছ ধরার জায়গা ছিল। কৃত্রিম ঝর্ণা, সুন্দর আলোকসজ্জা, রক ক্লাইম্বের ব্যবস্থা, লেকের চারপাশে ঘুরে বেড়াবার সুন্দর পথ আর লেকের ওপর সুদৃশ্য সেতু তৈরি হয়ে হায়দ্রাবাদের নতুন আকর্ষণে পরিণত হয়েছে দুর্গম চেরেভু।
শহরের ভেতর আজব গ্রাম দেখে উপলব্ধি হল, যতই এগোই সভ্যতার আধুনিকতায়, ভুলতে নেই নিজের শেকড়কে। আজও সারা বিশ্ব গ্রামীণ সভ্যতা ও বিকাশের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাদের গায়ে আধুনিকতার স্পর্শ লাগলেও, আবহমানতা ও চিরন্তনতায় গ্রামজীবন অমলিন রইবে যতদিন সভ্যতা থাকবে।
অতীতকে তাই ভুললে চলবে না। আসলে বর্তমান তো অতীতের ভিতের ওপরেই দাঁড়িয়ে...
('আপ জ্যায়সে মর্দ কো পুরি তসল্লি দেনা চারমিনার কা হি দম হ্যায়')
সারা ভারতে বোধহয় এমন একজন ধূমপায়ীকে পাওয়া যাবে না যিনি চারমিনার সিগারেটে টান দেননি কখনও! একেবারে ছোটবেলায় এই ব্র্যান্ডের সিগারেটের প্যাকেটকে খুব কম দামে বিক্রি হতে দেখেছি। নিজে যখন এঁচোড়ে পাকা হয়ে লুকিয়ে-টুকিয়ে ফুঁকতে শিখলাম তখন একটির দাম ছিল ১০ পয়সা। মাসের প্রথম দিকে পকেটে রেস্ত থাকলে ফিল্টার উইলস, গোল্ড ফ্লেক, স্পেশাল ইত্যাদির বিলাসিতা দেখানো গেলেও, মাস শেষে কিন্তু এক ও অদ্বিতীয় চারমিনার ছিল আমাদের তখনকার পুরুষত্বের (এখন ভাবলে বেশ হাসি পায়) একমাত্র প্রতীক। অবশ্য আমাদের মধ্যে যারা একটু বেশিমাত্রায় পুরুষ ছিল, মানে সো কল্ড রাফ এন্ড টাফ, তারা সবসময়ই চারমিনার টানতো আর আমাদের দিকে ট্যারা চোখে তাকাতো। ভাবটা ছিল 'মর্দ বোলে তো চারমিনার পিনেওয়ালা'!!
লাড বাজারের পাঁচমেশালি ভিড়ে চারমিনারের দিকে এগোতে এগোতে সেসব কোথায় মনে পড়ছিল। তাজমহলকে মনে রেখেও বলছি আমাদের দেশের ভেতর আর কোনও স্থাপত্য বোধহয় চারমিনারের মতো এত পরিচিত নয়! অতীতের নিজামি মুদ্রা, টাকা থেকে শুরু করে সিগারেটের প্যাকেটেও তাই চারমিনার। পাকিস্তানের করাচির বাহাদুরবাদেও রয়েছে বিখ্যাত এই মিনারের রেপ্লিকা। আর একে ঘিরেই শহর হায়দ্রাবাদ বিস্তার লাভ করেছে ধীরে ধীরে।
মহম্মদ কুলী কুতুব শাহের তৈরি এই মিনারের নির্মাণ ১৫৯১-এ শুরু হয়ে শেষ হয় ১৫৯৩ সালে। ঠিক কী কারণে এই মিনার নির্মিত হয় তার সঠিক কারণ অনুমান করা হয় মাত্র। অনেকের মতে, শহর থেকে প্লেগ মহামারী দূর করার স্মারকরূপে তৈরি করা হয়েছিল চারমিনার। সপ্তদশ শতকের ফরাসি পর্যটক Jean de Thévenot মনে করেন, দ্বিতীয় ইসলামিক সহশ্রাব্দকে উদযাপন করতে ১৫৯১ সালে চারমিনারের নির্মাণ করা হয় এবং সেজন্য এই সৌধকে পূর্বের Arc de Triomphe বলা হয়। প্রচলিত আর একটি ধারণা হল, চারমিনারের কাছেই বাস করতেন ভাগমতী। এখানেই তাঁকে প্রথম দেখেন সুলতান। আর সেই দেখার স্মারক হিসেবে তৈরি করেন জগৎবিখ্যাত চারমিনার।
ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যে পারস্য রীতিতে তৈরি হওয়া চারমিনার ঐতিহাসিক 'ট্রেড রুট'-এর সংযোগস্থলে অবস্থিত। এই পথ অতীতে সমুদ্র বন্দর মছলিপত্তনমের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সব দিকে ২০মিটার জায়গা নিয়ে তৈরি হওয়া চারমিনারের চারপাশে রয়েছে বিরাট বিরাট চারটি আর্চ। ডাবল-ব্যালকনি সহ মিনারেটগুলির উচ্চতা ৫৬মিটার। ওপরে উঠবার জন্য রয়েছে ১৪৯টি সিঁড়ি। প্রায় ১৪,০০০টন ওজনের গ্রানাইট, মার্বেল ও চুনাপাথর ব্যবহৃত হয়েছিল চারমিনার তৈরি করতে। পশ্চিমে খোলা বাতায়নে রয়েছে মসজিদ। কুতুব শাহির সময়ে বাকি অংশ রাজসভার জন্য ব্যবহার করা হত। স্থাপত্যের ভিতে দখিনি উর্দুতে খোদাই করা ‘Fill this my city with people as, Thou hast filled the river with fishes, O Lord.’ প্রমাণ করে যে, শহরের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে এই স্থাপত্যের সংযোগ রয়েছে। দুই বছরের নির্মাণে সেসময়ে খরচ হয়েছিল ৯লক্ষ টাকা। একটি মিনারেট ভেঙে পড়েছিল ১৬৭০ সালে। পুনর্নির্মাণে খরচ হয় ৫৮হাজার টাকা। ১৮২০ সালে ২লক্ষ টাকা খরচ করা হয় কিছু অংশ ঠিকঠাক করবার জন্য।
চারমিনারকে ঘিরে রয়েছে শতাব্দী প্রাচীন বাজার। এখানে পাওয়া যাওয়া না এমন জিনিস নেই! খানিক দূরেই রয়েছে দক্ষিণ ভারতের বৃহত্তম মক্কা মসজিদ। এর ভেতরে ১০০০০ পুণ্যার্থী একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারেন। মক্কা থেকে নিয়ে আসা একটি ইট রয়েছে বলে এই মসজিদের নাম মক্কা মসজিদ। অবশ্য মক্কার মসজিদের আদলে তৈরি বলে নাম মক্কা মসজিদ হয়ে থাকতে পারে। ১৬১৪ সালে আবদুল্লা কুতুব শাহের সময় শুরু হলেও ১৬৮৭ সালে ঔরঙ্গজেব মসজিদ নির্মাণ শেষ করেন গোলকুন্ডা দখলের পর। মসজিদের ভেতরের কারুকাজ, ফ্রেস্কো অত্যন্ত নান্দনিক।
মন্দিরের ঘন্টাধ্বনি শুনে সম্বিৎ ফিরল। ফিরে এলাম বর্তমানে। দেখি চারমিনারে ঢুকবার মুখেই একটি মন্দির। মক্কা মসজিদের ওপাশে সূর্য তখন অস্ত যাচ্ছে। চারপাশের ভিড় বহুগুনে বেড়ে গেছে। মুক্তো কিনবার জন্য বিভিন্ন দোকানির ডাক কানে আসছে। সামনের রাজপথে তুমুল ব্যস্ততা, অন্তহীন গাড়ির সারি। চাল-ডাল-তেল-নুন-আটা-ময়দা আর মানুষের ঘাম মিশে এক অদ্ভুত গন্ধে ধীরে ধীরে সন্ধে নামতে লাগল। শোনা গেল নামাজের সুর।
অনুভব করলাম আবার যে, এক বিরাট ভারতে দাঁড়িয়ে আছি, যে ভারতের ইতিহাস লিখেছেন সাধারণ মানুষেরাই আর যুগে যুগে তাদের সঙ্গ দিয়েছেন রাজা, মহারাজা, বাদশা, সুলতানেরা....
ততক্ষণে চোখ ছানাবড়া হয়ে গেছে। একেই তো এত এত সংস্করণ, তায় আবার ১৪০০ সালের! হাতে লেখা! অর্থাৎ আজ থেকে ৬০০ বছর আগের! নিজের চোখকেই বিশ্বাস হচ্ছে না।
কেয়ারটেকার বোধহয় আমার অবস্থাটা বুঝলেন। এগিয়ে এলেন নিজেই। মৃদু হেসে দেখালেন আরও বেশ কিছু। কোনোটায় সোনার জল ব্যবহার করা হয়েছে, কোনোটা রূপো দিয়ে বাঁধাই করা, কোনোটা আনা হয়েছে পারস্য থেকে, কোনোটা আবার আর এক দেশ থেকে! কোনোটা ঢাউস বড্ড, কোনোটা আবার একেবারে ছোট্ট, কোনোটায় লেগে আছে এমন স্মৃতি, যা বুঝিয়ে দেয় 'হায়দ্রাবাদ ডেকান' সে আমলে ঠিক কতটা সমৃদ্ধ ছিল। তা না হলে এত ধরণের কোরান আজকের দিনে বসে দেখা সম্ভব ছিল না! আর এসবই রক্ষিত নিজামদের চৌমহলা প্যালেসে।
সত্যি বলতে, চৌমহলা প্যালেস নিয়ে আমার খুব একটা উৎসাহ ছিল না। এর সম্পর্কে জানতামও না সেভাবে। ফলকনামা প্যালেস আমার যতটা পরিচিত, সেই তুলনায় চৌমহলা প্যালেস, অন্তত আমার কাছে, প্রায় অপরিচিতই ছিল। এখন এখানে ঢুকে হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছি যে, না এলে কী ভুলটাই না করতাম!
আসফ জাহি বংশের বা নিজামদের সরকারি বাসস্থানই হল চৌমহলা প্যালেস। নিজাম সালাবত জঙের তৈরি চৌমহলা প্যালেস ইতিমধ্যেই পেয়েছে ইউনেস্কোর 'কালচারাল হেরিটেজ কনজারভেশন' পুরস্কার। তবে তিনি প্যালেস নির্মাণের উদ্যোগ নেন ১৭৫০ সালে, আর তা শেষ হয় ১৮৫৭ থেকে ১৮৬৯-এর মধ্যে, বর্তমানে চৌমহলা প্যালেসের মালিক হলেন বরকত আলি খান মুক্কারম জাহ। প্যালেসে নিজামদের অন্যান্য বংশধরেরা না থাকলেও, তাঁদের বিয়ের অনুষ্ঠান এখনও এখানে হয়ে থাকে।
এতদিন কুতুব শাহি, কুতুব শাহি করছিলাম। এখন আবার বলছি নিজাম। গন্ডগোল লাগছে তো? লাগবারই কথা। অত্যন্ত স্বাভাবিক। চলুন একটু বুঝে নেওয়া যাক নিজাম ব্যাপারটি কী ও কেন।
নিজাম শব্দটি এসেছে 'নিজাম-উল-মূলক' থেকে। 'নিজাম-উল-মূলক'-এর অর্থ হল শাসনকর্তা। নিজাম উপাধিটি নিয়েছিলেন প্রথম আসফ জাহ, যদিও তাঁর আসল নাম ছিল মির কামার-উদ্দিন-সিদিক্কি। গোলকুন্ডা দখলের পর আওরঙ্গজেব তাঁর হাতে হায়দ্রাবাদের শাসনভার তুলে দিয়েছিলেন। আসলে তিনি আওরঙ্গজেব নিযুক্ত ভাইসরয়। কিন্তু তখন মুঘল সাম্রাজ্য পতনের মুখে। আলগা হচ্ছে বাঁধন। তাই, আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর আসফ জাহ শাসনাধীন হায়দ্রাবাদ ১৭২৪ সালে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। কিন্তু সেসময় মারাঠারাও ছিল প্রবল শক্তিশালী। ফলে অনবরত যুদ্ধ-বিবাদ লেগেই থাকত দুই প্রতিবেশীতে। অবস্থা পাল্টালো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আসরে নাম্বার পর। তাদের সহযোগিতায় করদ রাজ্য হিসেবে নিজামরা স্বাধীনভাবে নিজেদের ক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন ১৯৪৮ সাল অবধি। অবশেষে ওই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর হায়দ্রাবাদ যোগ দেয় ভারতীয় প্রজাতন্ত্রে।
আরও কয়েকটি তথ্য জানাবার লোভ সামলাতে পারছি না। নিজাম ওসমান আলি খান বা সপ্তম আসফ জাহ ছিলেন সে আমলের পৃথিবীর সেরা ধনী। ১৯৩৭ সালে তাঁর সম্পত্তির পরিমান ছিল ৬৬০ কোটি টাকা। তাঁদের রত্নভাণ্ডার রিজার্ভ ব্যাঙ্কে রক্ষিত। ফোবস ম্যাগাজিনের ২০০৮ সালের পৃথিবীর সর্বকালের সেরা ধনীর তালিকায় নিজাম পঞ্চম স্থান পেয়েছেন। স্যার রবার্ট লেথব্রিজের মতে, হজরত মহম্মদের বংশের সঙ্গে নিজামদের আত্মীয়তা ছিল। সমরখন্দের তুর্কমান আবিদ খান এই বংশের প্রতিষ্ঠা পুরুষ বলে স্বীকৃত। নিজামদের বিপুল সম্পদের পেছনে রয়েছে গোলকুন্ডার হীরের খনি। সে আমলে সারা বিশ্বে একমাত্র ভারতেই হীরে পাওয়া যেত।
লাড বাজারের উত্তরে ৪৫ একর জমি নিয়ে তৈরি চৌমহলা প্যালেস তেহেরানের শাহ প্যালেসের রেপ্লিকা। দক্ষিণ কোর্ট ইয়ার্ড হল প্যালেসের পুরোনো অংশ। এখানে রয়েছে আফজল মহল, মেহতাব মহল, তাহনিয়াত মহল আর আফতাব মহল। খিলায়াত মুবারকে রয়েছে দরবার হল। এখানেই দেখা মেলে তখ্ত-এ-নিশান বা রাজসিংহাসনের। উত্তর কোর্ট ইয়ার্ড বড়া ইমামে সজ্জিত। নিজামদের শাসনকার্য চলত এই অংশের বিরাট করিডোর ও তার সংলগ্ন ঘরগুলি থেকে।
চৌমহলা প্যালেসে প্রদর্শিত হয়েছে নিজামদের বিভিন্ন সামগ্রী। সালার জং সংগ্রহশালার পাশে সেসব পরিমাণে অনেকটা কম হলেও ধারে বা ভারে কোনও অংশে তারা কম নয়। প্যালেসের আভিজাত্য, বিশালত্ব ও গাম্ভীর্য, কারুকাজ, মনোরম বাগান দেখেই বোঝা যায় যে, রুচি আর বিত্তের মিশেলে অবাস্তব কীভাবে বাস্তবে পরিণত হয়। এ এক তুমুল ব্যাপার। না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।
সব দেখে-টেখে যখন বেরিয়ে আসছি তখন খিলায়েৎ ঘড়িতে ঘন্টা বাজল। আড়াইশ বছরের পুরোনো ঘড়িটিকে প্রতি সপ্তাহে ঘড়ি-বিশেষজ্ঞ একটি পরিবার দম দেন। মনে মনে বলি, আরও অনেক আড়াইশ বছর পরেও যেন এই ঘড়ি এরকমই থাকে কোনও এক বালকের জন্য....
অবশেষে সালার জং
ভূমিকা
This is no Museum-as it is said/ For, as you know, a Museum is dead/ And this which millions shall come to see/ Is all alive with immortality- Harendranath Chattopadhyaya
সত্যি বলতে খুব রাগ হচ্ছিল! এই রাগ আসলে অক্ষমতা থেকে। এত জলদি দেখা যায় নাকি এসব! কে দিব্যি দিয়েছিল এত কিছু সংগ্রহ করতে? সবকিছুর তো একটা সীমা আছে! কিন্তু এ তো সীমাহীন ব্যাপার। এত পারা যায় নাকি? এ কি কয়েক ঘন্টা বা গোটা একদিনের বিষয়? ইহজীবন শেষ হয়ে যাবে যদি খুঁটিয়ে দেখতে চাই সবকিছু।
কিন্তু এ তো গেল আমার দিক। উল্টোদিকে, যিনি এই সংগ্রহগুলি করেছিলেন ভাবছি তাঁর কথা। একক প্রচেষ্টায় এইরকম একটি সংগ্রশালা পৃথিবীতে আর একটি আছে কিনা সন্দেহ। হায়দ্রাবাদে পৌঁছোনো ইস্তক ছটফট করছিলাম, কখন চাক্ষুস দেখব মিউজিয়ামটিকে। অবশ্য এই ছটফটানি তো তৈরি হয়েছে সেই কবে কোন ছোট থেকে। জীবন শেষের পথে এসে তাই বিরাট এই অট্টালিকার সামনে দাঁড়িয়ে চোখ চিকচিক করে উঠল। আমার সামনে সালার জাং মিউজিয়াম। অবশেষে স্বপ্ন পূরণ, সার্থক জীবন!
সালার জাং মিউজিয়াম নিয়ে লিখতে গেলে আস্ত একটা বই লিখে ফেলা যায়। ব্যক্তিগত সংগ্রহে এভাবে একটি বিরাট সংগ্রশালা গড়ে ওঠার নজির এই দেশে আর একটিও নেই। কিন্তু তার আগে বোধহয় একটু বলা বলা দরকার, সালার জং কে বা কারা।
কুতুব শাহি শাসনের পর হায়দ্রাবাদে চলে গিয়েছিল নিজামদের হাতে। ১৭২০ থেকে ১৯৪৮ পর্যন্ত নিজামরা ছিলেন হায়দ্রাবাদের সর্বেসর্বা। কিন্তু ২০০ বছরের ওপর এই দীর্ঘ শাসন সম্ভব হত না যদি না পাইঘা ও উমরা-এ-উজ্জাম পরিবার থাকত। পদমর্যাদার দিক থেকে পাইঘারা ছিলেন নিজামদের ঠিক পরেই। আর উমরা-এ-উজ্জামদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সালার জং পরিবার। পাইঘাদের পরই গুরুত্ব পেতেন তারা। ঊনবিংশ শতাব্দীতে তাঁদের গুরুত্ব আরও বাড়ে। Grand Viziers হিসেবে হায়দ্রাবাদের নিজামদের সাহায্যকারী প্রধান পাঁচটি পরিবারের একটি হয়ে ওঠেন তাঁরা। ইসলামিক দুনিয়ায় Grand Viziers বলতে বোঝায় সার্বভৌম কোনও রাষ্ট্রের শাসনকর্তাদের প্রধানকে। এর থেকেই বোঝা যায় যে, সালার জংরা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন নিজামদের হায়দ্রাবাদে। ঐতিহাসিক মতানুসারে, দেওয়ান দেবদি (দেওয়ান= প্রধানমন্ত্রী, দেবদি= হায়দ্রাবাদের বিখ্যাত পরিবারের প্রাসাদ) অট্টালিকার সালার জংরা হজরত মহম্মদের সমসাময়িক ওয়াসিস আল কারানির বংশধর। ওয়াসিস আল কারানির দশম বংশধর দ্বিতীয় শেখ ওয়াসিস বিজাপুরের সম্রাট আলি আদিল শাহের সময় ভারতে এসেছিলেন। সালার জং পরিবারের অধীনে যে ছয়টি জায়গীর বা তালুক ছিল তার মধ্যে অন্যতম ছিল অজন্তা।
সালার জংদের বংশ নিয়ে আরও অনেকটা বলা যায়, কিন্তু সেটি দীর্ঘায়িত না ক`রে এটুকু জানাই যে, এই বংশের মুনির-উল-মুলকের পৌত্র তুরাব আলি ১৮৪১ সালে সালার জং বাহাদুর উপাধি পান। ছোটবেলায় পিতা সুজা-উদ-দৌল্লাকে হারানো প্রথম সালার জং ১৮৪৭ সালে খাম্মাম জেলার তালুকদার হন। পিতার অনুপস্থিতিতে প্রথম সালার জঙের পালনকর্তা কাকা সিরাজ-উল-মুলক ছিলেন সেই জেলার দিওয়ান। ১৮৫৩ সালে কাকার মৃত্যুর পর সমস্ত দায়ভার এসে পড়ে তাঁর ওপর। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সেসব সামলান তিনি। শিল্প-সংস্কৃতির অন্যতম পৃষ্ঠপোষক হিসেবেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁরই পরম্পরা বর্তায় তৃতীয় সালার জং ইউসুফ আলি খানের ওপর। মাঝে দ্বিতীয় সালার জং মীর লায়েক আলি খান যেন নিজের পিতা ও পুত্রের প্রবল ব্যক্তিত্বের মাঝে খানিকটা নিষ্প্রভ হয়ে গেছেন। তৃতীয় সালার জঙের প্রাসাদ হয়ে উঠেছিল তদানীন্তন হায়দ্রাবাদের শিল্প-সংস্কৃতির মূল কেন্দ্র। তাঁর বিপুল সংগ্রহের নিট ফল আজকের সালার জং মিউজিয়াম, যার পরিচয় পৃথিবীব্যাপী। এখানে রাখা শিল্প সামগ্রীর সংখ্যা হল ৪৬০০০। রয়েছে ৮০০০ পাণ্ডুলিপি, ৬০০০০ মুদ্রিত বই। এই বিপুল সংগ্রহের কিছু প্রথম সালার জং হলেও, অধিকাংশই করেছেন তৃতীয় সালার জং। একক প্রচেষ্টায় এত বিপুল মিউজিয়াম ভারত তো বটেই, সারা দুনিয়াতেও বোধহয় দ্বিতীয়টি নেই।
বলব, বলব....রয়েসয়ে বলব সব....
প্রবেশ
Prince of Collectors; you have come to stay/ You are immortal and shall never pass away- Harendranath Chattopadhyaya
তৃতীয় সালার জঙের ইচ্ছে ছিল মীর আলম ট্যাঙ্কের কাছে খওয়াজা পাহাদি অথবা মৌলা আলিতে একটি মিউজিয়াম তৈরি করবার। পুনা ও উটিও ছিল তাঁর পছন্দের তালিকায়। কিন্তু দুর্ভাগ্য, তাঁর প্রচেষ্টা সফল হওয়ার আগেই ১৯৪৯ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। শেষ যে শিল্পসামগ্রীটি তিনি কিনেছিলেন সেটি হল, টিপু সুলতানের হাতির দাঁতের চেয়ার আর সেটি টিপুকে উপহার দিয়েছিলেন ষোড়শ লুই। এই বস্তুটি তাঁর মৃত্যুর পর এসে পৌঁছায়।
চিরকুমার তৃতীয় সালার জঙের মৃত্যুর পর, ভারত সরকার বিশেষ অর্ডিন্যান্স জারি করে একটি কমিটি গঠন করেন সালার জং এস্টেটের দেখভালের জন্য। তদানীন্তন হায়দ্রাবাদের চিফ সিভিল এডমিনিস্ট্রেটর এম কে ভেলোডি প্রখ্যাত শিল্প-সমালোচক ডক্টর জেমস কাজিনকে অনুরোধ করেন সালার জঙের সংগ্রহ নিয়ে একটি মিউজিয়াম গড়ে তুলতে। ডক্টর কাজিন অন্য কাজে ব্যস্ত থাকায়, তাঁরই পরামর্শে জি ভেঙ্কটচলম দায়িত্ব নেন। এর পরই শুরু হয় প্রস্তাবিত মিউজিয়াম তৈরির কাজ। ঠিক হয়, সালার জংদের পৈতৃক বাড়ি দেওয়ান দেবদিতে এই মিউজিয়াম গড়ে তোলা হবে। সেভাবেই কাজ শুরু হয়। অবশেষে ১৯৫১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু মিউজিয়ামের উদ্বোধন করেন। কিন্তু বিভিন্ন কারণে দেওয়ান দেবদি আধুনিক মিউজিয়ামের জন্য উপযুক্ত ছিল না। ফলে সালার জং এস্টেট কমিটি মুসি নদীর দক্ষিণ প্রান্তে ৫.৮ একর জমি দান করেন। কেনা হয় আরও ৪.৭৫ একর জমি। রাজ্য সরকার মিউজিয়ামের জন্য ৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করেন। কিন্তু নতুন মিউজিয়াম তৈরি করতে যে বিপুল টাকা লাগছিল তার সংস্থান কোনোভাবেই হচ্ছিল না। তাই সিদ্ধান্ত হয়, ধাপে ধাপে মিউজিয়ামটি তৈরি করা হবে। ১৯৬৩ সালের ২৩ জুলাই পন্ডিত নেহেরু নতুন ভবনের ভিত স্থাপন করেন। ১৯৬৮ সালে তৈরি হয় সেন্ট্রাল ব্লক। ততদিনে খরচ হয়ে গেছে ৩৮.৪৬ লক্ষ টাকা। ওই বছরের ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতি জাকির হোসেন জনসাধারণের জন্যনতুন মিউজিয়াম উদ্বোধন করেন। বিপুল সংগ্রহের জন্য পরবর্তীতে আরও দুটি ব্লক তৈরি করা হয় ১৯৯৯ সালে। এই মুহূর্তে মিউজিয়ামে তিনটি ব্লকে গ্যালারির সংখ্যা ৩৯টি। ইন্ডিয়ান ব্লকে রয়েছে ৩০টি, ওয়েস্টার্ন ব্লকে ৭টি ও ইস্টার্ন ব্লকে আছে ২টি গ্যালারি। মিউজিয়ামের প্রদর্শিত সংগ্রাহকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে- ভারতীয়, পার্সিয়ান, নেপালি ও তিব্বতি, সিনো-জাপানিজ ও পাশ্চাত্য শিল্প। ধীরে ধীরে বলা যাবে তাদের কথা। শোনা যায়, জায়গার অভাবে আরও অনেক সংগ্রহ প্রদর্শিত করা যায় নি। টিপু সুলতানের হাতির দাঁতের চেয়ার ছাড়াও নূরজাহানের ড্যাগার, ঔরঙ্গজেবের তরোয়াল, জাহাঙ্গীরের মদ্যপানের কাপ, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর- রবি ভার্মার ছবি....কোনটা ছেড়ে বলব কোনটা!
দর্শন
সালার জং মিউজিয়ামের শিল্প সংগ্রহ চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। একক সংগ্রহে এত কিছু রয়েছে যে সব দেখে শেষ করে যায় না। সমগ্র দাক্ষিণাত্য তো বটেই, কলকাতা বাদে সারা ভারতের খুব কম মিউজিয়ামেই এত সংগ্রহ রয়েছে! ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের শিল্পকীর্তির পাশাপাশি রয়েছে রাজস্থানি, বাশোলি, কাংড়া ইত্যাদি রীতির শিল্পকর্ম। চিত্রকলায় রয়েছেন নন্দলাল বোস, বিনোদবিহারী মুখার্জি, মকবুল ফিদা হুসেন সহ আরও অনেক প্রখ্যাত শিল্পীরা। অষ্টম শতকের জৈন ধর্মের ও ৯০০ খ্রিস্টাব্দের ভগবান বিষ্ণুর মূর্তি সহ ব্রোঞ্জের মূর্তির সংখ্যা প্রায় ২০০। কাশ্মীরি শালের পাশাপাশি বাঁধনি, জামদানি, বালুচরি, গোলকোন্ডা কটন, কচ্ছ ও কাথিওয়ারের এম্ব্রয়ডায়ারি, চাম্বার রুমাল, গুজরাটি পাটোলা ইত্যাদি ভারতীয় শিল্প সংগ্রহের অন্যতম। হাতির দাঁতের বিভিন্ন সামগ্রী দেখে তাক লেগে যায়। মনুষ্য মূর্তি থেকে হাতির দাঁত সুতো হিসেবে ব্যবহার করে বানানো ম্যাট দেখে নিজের চোখকেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। নানাবিধ রত্নরাজি খচিত মুঘল ও তার পরবর্তী আমলের কাপ, হুক্কা, প্লেট, বেল্ট, বই রাখবার স্ট্যান্ড, আংটি, চুলের কাঁটা ইত্যাদি দেখে ভাবছিলাম যে, একসময়ে কী সমৃদ্ধ-ই না ছিল আমাদের দেশ! মিউজিয়ামে সংগৃহিত অস্ত্রের সংখ্যা ১২০০, আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে ১৯৬টি। বিভিন্ন সাইজের, বিভিন্ন ধরণের, বিভিন্ন ধাতুর এই অস্ত্র শুধু ভারত থেকেই নয়,আনা হয়েছে বিশ্বের নানা দেশ থেকে। কুতুব শাহি আমলের দুটি তরোয়াল, জাহাঙ্গীর, শাজাহান ও আওরঙ্গজেবের ব্যবহৃত অস্ত্রও বিশেষ আকর্ষণ। ভারতীয় সংগ্রহের মধ্যে পালকি, চন্দন কাঠের চেয়ার, কাঠের নানা সামগ্রী ইত্যাদি মিলে এক এলাহি কান্ড!
পার্সিয়ান সংগ্রহের মধ্যে পোর্সেলিন, কাঁচ, এনামেল, টেক্সটাইল, পেন্টিং ইত্যাদির পাশাপাশি কার্পেটগুলিও অসামান্য। নেপালি, তিব্বতি, বার্মিজ সংগ্রহে আকর্ষণ করে তামা ও ব্রোঞ্জের নানা ধরণের স্থাপত্য, খুকরি, মসলার বাক্স ইত্যাদি। চাইনিজ ও জাপানিজ বস্তু সংগ্রহে সালার জং মিউজিয়াম ভারতের অন্যতম সেরা। রয়েছে ৫০০০-এর বেশি প্রদর্শিত সামগ্রী। মিং সাম্রাজ্যের থেকে শুরু করে আধুনিক কালের নানা জিনিষ সত্যিই দেখবার। তবে চাইনিজ ও জাপানিজ শিল্প সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকলে এদের রস আস্বাদন করা কঠিন। তবু ভাল লাগে মিনিয়েচার পেন্টিং, সামুরাই তরোয়াল, সিল্ক এমব্রয়ডারি ও অন্যান্য জিনিষগুলি। পাশ্চাত্য গ্যালারিও অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ইংরেজ, ইতালিয়ান, ফরাসি শিল্পীদের আঁকা ছবি মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখতে হয়। ইতালিয়ান শিল্পী ক্যানালেত্তর Piazza San Marco চিত্রকলাগুলির মধ্যে সবচেয়ে নামী। আর স্থাপত্যে বেনজোনির Veiled Rebecca তো জগৎবিখ্যাত। একই কাঠের গুঁড়িতে সৃষ্ট অনামী শিল্পীর মেফিস্টোফিলিস-মার্গারেট মূর্তিটি বিস্মিত করে তোলে। রয়েছে ভেনিস, ফ্রান্স, বোহেমিয়া, আমেরিকা, বেলজিয়াম, ইস্তাম্বুল, চেকোস্লোভাকিয়া থেকে আনা কাঁচের নানা সম্ভার। ঘড়ি রয়েছে জার্মানি, হল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ইত্যাদি দেশের। ঘড়ি প্রসঙ্গে বলি সেই বিখ্যাত ঘড়িটির কথা। ইংলিশ ব্র্যাকেট ক্লিক নামে বিখ্যাত এই ঘড়িটি ইংল্যান্ডে তৈরি হয় আর ঘড়ির বিভিন্ন অংশ জোড়া লাগানো হয় ঊনবিংশ শতাব্দীতে কলকাতা শহরে। কুক এন্ড কেলভি কোম্পানির থেকে তৃতীয় সালার জং ঘড়িটি কিনেছিলেন। মোট ৩৫০টি পার্টস থাকা এই ঘড়িটি প্রত্যেক ঘন্টার তিন মিনিট আগে দাড়িওয়ালা একটি মূর্তি বেরিয়ে এসে ঘন্টা বাজিয়ে আবার ঘড়ির ভেতরে চলে যায়। আর একটি মূর্তি হাতুড়ি নিয়ে, না থেমে, সেকেন্ড ঘোষণা করে। সালার জং মিউজিয়ামের এই ঘড়িটি দেখতে নানা জায়গা থেকে ছুটে আসেন দর্শনার্থীরা। আসবাবপত্রের বর্ণনায় আর গেলাম না। সোফা সেটের সমাহার দেখে নিজের জন্য করুণা হচ্ছিল। আর এখানে কী নেই! তবে মিউজিয়ামের লাইব্রেরি সম্পর্কে না বললেই নয়। মুদ্রিত বইয়ের সংগ্রহ মাত্র(!) ৬২,৭২২ টি। এর মধ্যে ইংরেজি বই ৪১,২০৮, উর্দু ১৩,০২৭, হিন্দি ১১০৮, তেলেগু ১১০৫, পার্সিয়ান ৩৫৭৬, আরবি ২৫৮৮, তুর্কিশ ১৬০ টি। আরবি, পার্সিয়ান, উর্দু ও অন্যান্য ভাষার পাণ্ডুলিপি রয়েছে মাত্রই (!) ৮০৫৫৬টি।
সব দেখে শুনে চক্ষু চড়কগাছ করে যখন সালার জং মিউজিয়াম থেকে বাইরে এসেছি তখন বিকেল। পাঁচটা বেজে গেলেও আকাশে যথেষ্ট আলো। অদূরে দেখা যাচ্ছে হাইকোর্ট আর তার উল্টোদিকে ওসমানিয়া হাসপাতাল। তাদের সুন্দর স্থাপত্য আর বিশালত্ব দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও মন তখন আচ্ছন্ন হয়ে আছে সালার জং মিউজিয়ামে। মুসি নদীর তীরে হাঁটতে হাঁটতে আর একবার ফিরে তাকালাম মিউজিয়ামের দিকে। জীবন সার্থক হল ঠিকই, কিন্তু ইচ্ছে যেন আরও বেড়ে গেল। প্রতিজ্ঞা করলাম, যদি সুযোগ হয়, তবে শুধু সালার জং দেখতেই আবার আসব নিজামের শহরে....
রামোজি রাও, নীতিশ রায় আর একটি পার্ক, সঙ্গে বাহুবলী
চড়া রোদে ভিনটেজ বাসে চেপে ঘুরতে ঘুরতে মনে পড়ছিল ১৯৮৮ সালের কথা। মাইশোরের বৃন্দাবন গার্ডেনে ঢুকবার মুখে আমাদের সেদিনের গাইড মোট ১৮টি বিশেষণ প্রয়োগ করেছিলেন সেদিন। সেই শব্দগুলির বেশ কিছু মনে পড়ল আবার। ভাবছিলাম সেই ভদ্রলোক আজ থাকলে কী কী বলতে পারতেন! কেননা কাবেরী নদীর বাঁধের নিচে বৃন্দাবন গার্ডেনও থিম পার্ক। আর এটাও একধরণের থিম পার্ক। বৃন্দাবন গার্ডেনে বহু ছায়াছবির শুটিং হয়েছে। এখানেও হয়। সেট তৈরী করাই আছে, শুধু কলাকুশলীদের এনে শুরু করেই দিল হল!
বলছি রামোজি ফিল্ম সিটির কথা। এ এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার। ভারতের একমাত্র 'থিমেটিক হলিডে ডেস্টিনেশন উইথ সিনে ম্যাজিক' নামে পরিচিত রামোজি ফিল্ম সিটি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ফিল্ম ষ্টুডিও কমপ্লেক্স হিসেবে ইতিমধ্যেই স্পর্শ করেছে গ্রিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড। ২০০০ একর জায়গা নিয়ে গড়ে ওঠা এই ফিল্ম সিটির ভেতর রয়েছে চার তারা ও তিন তারা হোটেল, ভিলা, এপার্টমেন্ট, গ্ৰুপ স্টে-এর ব্যবস্থা। বিভিন্ন বিনোদন পার্কে সারা বছর লেগে আছে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড়। নতুন বছর বরণ অনুষ্ঠান, কার্নিভাল, বিয়ে বাড়ির ব্যবস্থা সবকিছু মিলে একেবারে হৈ হৈ কান্ড! এনাডু পত্রিকার মালিক রামোজি রাও-এর স্বপ্নকে পূরণ করেছেন স্থপতি নীতিশ রায় তাঁর অসামান্য কল্পনায়।
আমরা ছিলাম হাইটেক সিটির কাছে। বুঝতে পারিনি একেবারে উল্টোদিকে প্রায় ৬০কিমি দূরে রামোজি ফিল্ম সিটি। ভেবেছিলাম সকালে ক্যাব বুক করে পৌঁছে যাব। কিন্তু কোনও ক্যাব আর রাজি হয় না। শেষে কিষান নামের এক তরুণ অটো ড্রাইভার রাজি হল। ততক্ষণে অনেক বেজে গেছে। ফিল্ম সিটির প্রবেশ দ্বারে পৌঁছতে হবে সকাল সাড়ে ন`টার মধ্যে। সেখান থেকে ওদের নিজস্ব বাস নিয়ে যাবে ভেতরে। এই গলি সেই গলি দিয়ে টিকিয়া উড়ান চালিয়ে কিষান ঠিক সময়েই পৌঁছে দিল। অনলাইন টিকিট করা ছিল। তাই ঝক্কি অনেক কম। লাইনে দাঁড়িয়ে অবশ্য আটকে গেলাম। ক্যামেরার বড় লেন্স নিতে দেবে না। ছোট লেন্স চলবে। এসব পর্ব শেষে অবশেষে বাস, আর তারপর ফিল্ম সিটির মূল প্রবেশ দ্বারে!
নাচগানে দর্শকদের স্বাগত জানিয়ে খুলে গেল বিরাট দরজা। এবার প্রবেশ ভেতরে আর একে একে উপভোগ করা রামোজি ফিল্ম সিটির নানা কিছু। মুভি ম্যাজিক পর্যায়ে ছবি নির্মাণ, স্পেস রাইড, টয় জোন ইত্যাদি শেষে স্টান্টবাজি আর প্রেক্ষাগৃহে অনুষ্ঠানও দেখা গেল। এরপর ভিনটেজ বাসে চেপে ষ্টুডিও টুর আর এই পর্বে নর্থ টাউন, ভাগবতম সেট, প্রিন্সেস স্ট্রিট, আসকারি গার্ডেন, জাপানি গার্ডেন, সান ফাউন্টেন গার্ডেন, মুঘল গার্ডেন, স্যাংচুয়ারি পার্ক, এঞ্জেল ফাউন্টেন, কৃপালু কেভ দেখতে দেখতে ভাবছিলাম কী কান্ডই না করেছেন রামোজি রাও আর নীতিশ রায়। তবে এখানেই শেষ যায়। রয়েছে ইকো জোন। আর সেখানে বাটারফ্লাই পার্ক, বামন-বনসাই গার্ডেন,বার্ড পার্ক, কালার গার্ডেন ইত্যাদিও নজরকাড়া। এর মাঝেই দেখে নেওয়া হয়েছে হৈ চৈ ফেলে দেওয়া বিখ্যাত 'বাহুবলী' ছবির সেটটিও।
রামোজি ফিল্ম সিটির মোটামুটি সবকিছুই ফিল্মি। এই জগতের বেশিটাই কৃত্রিম। স্টেশন রয়েছে, স্টেশনে দেব দাঁড়িয়ে, ট্রেনের চাকা দেখলে বোঝা যাবে নকল। কেননা সেখানে বাসের মতো টায়ার লাগানো। এয়ারপোর্ট আছে। সেটিও নকল। তাই প্রাথমিক চোখ ধাঁধানো বিস্ময় কেটে গেলে আর মন টিকলো না। কিন্তু সেটা আমার ব্যক্তিগত মতামত। পরিবার-সহ সারাদিনের ট্যুরের জন্য রামোজি ফিল্ম সিটির তুলনা নেই। এখানকার হোটেলে রাত্রিবাস করে নিজের মতো হেঁটে-চলে ফিল্ম সিটির আনন্দ নেন যারা, তাদের অভিজ্ঞতাও অত্যন্ত সুখকর। ফিরবার পথে পেলাম শ্রীনিবাস বা শ্রীনু নামের এক ড্রাইভারকে। রিং রোড ধরে গাছিবাউলি ফিরতে ফিরতে শ্রীনুর সঙ্গে গল্প জমে উঠল। সারাদিনের ক্লান্তি কেটে গেল শ্রীনুর খাওয়ানো ইরানি চা আর অনর্গল কথা বলায়। হায়দ্রাবাদ ভ্রমণ শেষ হয়ে আসছে। শ্রীনুর বকবকানি শুনতে শুনতে ভাবছিলাম সে কথাই....
রইল পড়ে স্মৃতিটুকু....
হায়দ্রাবাদের এই অঞ্চল এখনও ফাঁকা ফাঁকা। চারদিকে বিরাট বিরাট বিল্ডিং উঠছে। হাইটেক সিটি লাগোয়া গাছিবাউলি এই মুহূর্তে পেটরোগা বাঙালিদের কাছে একটি বিশেষ হাসপাতালের জন্য পরিচিত। হাসপাতালের সামনের মাইন্ডস্পেস রোড দিয়ে প্রতিদিন হেঁটে হেঁটে বানজারা বস্তির একটি খাবারের দোকানে। বানজারা বস্তি অবশ্য নামেই বস্তি। এখানে অত্যাধুনিক শপিং মল থেকে শুরু করে বহুতল হাউসিং, ঝাঁ-চকচকে খাবারের দোকান, দামি হোটেল, ফ্লাই ওভার সবকিছুই রয়েছে। পশ্চিম হায়দ্রাবাদের এই অঞ্চল দিয়েই রাস্তা চলে গেছে মুম্বাইয়ের দিকে। এখানেই উদিপি উপহারের চেইন রেস্টুরেন্টে খাই প্রতি রাতে।দোকানের কর্মীরা চিনে গেছে, চিনে গেছে পাশের নবাব রেস্টুরেন্টের দু-চারজন। নবাবে ঢুকলেই ছুটে আসে কামাল। যত্ন করে খাওয়ায়। কটক থেকে এখানে এসেছে সে। খাওয়া-থাকা ফ্রি, ফি মাসে দশ হাজার টাকা মায়না। হাতখরচের সামান্য টাকা নিজের কাছে রেখে বাকিটা পাঠিয়ে দেয় বাড়িতে। উদিপি উপহারে রয়েছে ঝাড়খণ্ডের ছেলে। আমার মুখে শিলিগুড়ি শুনে মহা খুশি সে। দেশের সর্বত্র বাঙালি মানেই কলকাতাবাসী। বড্ড বিরক্ত লাগে। আমিও খুশি হই ছেলেটি শিলিগুড়ি চেনে বলে।
নিজেদের মতো ঘুরে বেড়াই এদিক ওদিক। আর এই ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে একদিন চলে গেলাম করাচি বেকারিতে। মোয়াজ্জম জাহি বাজারের এই দোকানটি খুলেছিলেন শ্রী খানচাঁদ রামমানি। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে তিনি করাচি ছেড়ে চলে আসেন এদেশে। ১৯৫৩ সালে সিনা বেকারির পাশে নিজের প্রিয় জন্মভূমির নামে শুরু করেন বেকারিটি। আজ সারা হায়দ্রাবাদে করাচি বেকরির ২৩টা স্টল রয়েছে। ব্যাঙ্গালোর, চেন্নাই, মুম্বাই, দিল্লিতে নিজেদের স্টলের পাশাপাশি তাঁরা মধ্যে প্রাচ্য, আমেরিকা ও ইংল্যান্ডেও ছড়িয়ে রয়েছেন। মোয়াজ্জম জাহি বাজারের মূল স্টলে অত্যন্ত সাদরে আমাদের সব দেখালেন বেকারির বর্তমান প্রজন্ম। বাঙালি শিক্ষক ও লেখালিখি করি শুনে নিজেরা বলে দিলেন তাঁদের প্রসিদ্ধ খাবারের কথা। কেনা হল বিখ্যাত মাইশোর পাক-সহ আরও কিছু খাবার। ১৯৩৫ সালে তৈরি হওয়া মোয়াজ্জম জাহি বাজারের আরও কিছু দোকান চিনিয়ে দিল হায়দ্রাবাদের অন্য দিককে।
এই বাজারের কাছের গান্ধি ভবন মেট্রো স্টেশন থেকে আমির পেট অবধি গিয়ে গ্রিন লাইন ছেড়ে রেড লাইনে হাইটেক সিটির মেট্রো চাপাটাও মনে থাকবে বহুদিন। এক মাঝবয়স্ক ব্যর্থ স্বামীর দুর্ব্যবহার ভুলিয়ে দিয়েছিল তরুণ একটি ছেলে সঠিক রাস্তা চিনিয়ে দিয়ে। গান্ধি ভবনের মেট্রো কর্মীদের সাহায্যের হাতও ভুলব না কোনোদিন। আসলে কলকাতা মেট্রোর মতো এক লাইনে চলে না হায়দ্রাবাদ বা দিল্লি মেট্রো। ফলে আমাদের মতো অনভ্যস্ত মানুষদের কাছে একটু সমস্যা হয় বৈ কী! মেট্রোতেই দেখতে পাচ্ছিলাম রাতের মোহময়ী হায়দ্রাবাদকে। ওপর দিয়ে যায় মেট্রো থেকে অপূর্ব সুন্দর লাগে শহরটিকে। ঝকঝকে মেট্রোর যাত্রীরাও সকলে সুবেশ। বুঝতে পারছিলাম আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম অনেক এগিয়ে গেছে বা যাচ্ছে। ভাল লাগছিল ভাবতে। আমাদের তো দিন শেষের দিকে, এগিয়ে যাক দেশ আর দেশের মানুষ।
সেকেন্দ্রাবাদের বেগমপেটের কাছে প্যারাডাইসের বিরিয়ানি খাওয়াটাও অন্য অভিজ্ঞতা। ১৯৫৩ সালে প্যারাডাইস সিনেমা হলের সামনে একটি ছোট্ট ক্যাফে আর ক্যান্টিন থেকে আজকের বিখ্যাত বিরিয়ানির দোকানটির যাত্রা শুরু। ষাটের দশকের শুরুতে সেই ক্যাফে ১০০ জনের মতো বসবার ব্যবস্থা করে নিজেদের মেনুতে যোগ করে হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানিকে। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয় নি। ১৯৭৮ সালে এ. হেমতি প্যারাডাইসের দায়িত্ব নেওয়ার পর, মেনুতে যোগ হয় ভারতীয় অন্যান্য কিছু খাবার। ১৯৮৭ সালে প্যারাডাইস সিনেমা হল ও ক্যান্টিন বাঁধা হয়ে গেলেও ক্যাফে ও রেস্টুরেন্ট চলতে থাকে। ১৯৯৬ সালে আমূল বদল আসে দোকানের। আধুনিক সব ব্যবস্থা যোগ হয়, বাড়ে দোকানের পরিসর। আজ ব্যাঙ্গালোর, চেন্নাই, বিশাখাপত্তনম, বিজয়ওয়ারা, গুন্টুর, গুরুগ্রাম, কলকাতাতেও রয়েছে প্যারাডাইস। হায়দ্রাবাদ-সেকেন্দ্রাবাদে রয়েছে বহু আউটলেট।
আজকের হায়দ্রাবাদ আর এক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিছুদিন আগেও যে হায়দ্রাবাদকে কেউ ধর্ত্যবের মধ্যে আনতো না, সেই হায়দ্রাবাদ আজ হেলথ সিটি নামে সারা ভারতে পরিচিত। বিদেশ থেকেও মানুষ আসছেন এখানকার চিকিৎসা পরিষেবার সুযোগ নেওয়ার জন্য। কম খরচে সু-চিকিৎসার এই ব্যবস্থাপনা নিঃসন্দেহে হায়দ্রাবাদের মুকুটে নতুন পালক। ভাল লাগে দেখে যে, বালাকৃষ্ণার মতো ফিল্মি তারকাও মায়ের নামে ক্যান্সার হাসপাতাল খুলে সামান্য খরচে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। অন্যদিকে সাইবার সিটি হিসেবে হায়দ্রাবাদ পেছনে ফেলে দিচ্ছে ব্যাঙ্গালোর, পুনে বা দিল্লিকেও। আজ ভারতে তথ্য-প্রযুক্তির যে বিস্ফোরণ ঘটেছে, তার জন্য অনেক অংশেই ঋণী রইব হায়দ্রাবাদের কাছে। খেলাধুলার জগতেও হায়দ্রাবাদের সুনাম অস্বীকার্য।
আমাদের সেই ড্রাইভার বন্ধু সন্তোষ বলেছিল শপিং মল ইত্যাদিতে ঢুকতে। ইচ্ছে করেনি। যাই নি সেসবে। বারবার মনে পড়ছিল জীবনের প্রথম তিনটে টেস্টেই সেঞ্চুরি করা ভারতীয় ক্রিকেট দলের একদা ক্যাপ্টেন আজহারউদ্দিনের কথা। ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিমা রাও-ও জড়িয়ে রয়েছেন এই শহরের সঙ্গে। নভোশ্চর রাকেশ শর্মা, টেনিস খেলোয়াড় সানিয়া মির্জা, কব্জির মোচড়ের জাদুগর ক্রিকেটার ভি ভি এস লক্ষ্মণ, কবি সরোজিনী নাইডু, ব্যাডমিন্টন তারকা সিন্ধু, চিত্র পরিচালক শ্যাম বেনেগাল, চিত্র তারকা শাবানা আজমী, তাব্বু প্রমুখেরাও তো এই শহরের মুখ। অতীতের সেই লিগ্যাসি আজও যেন হাদরাবাদের সর্বত্র। সেই লিগ্যাসির অন্যতম নিজানদের বিখ্যাত ফলকনামা প্যালেস দেখবার ইচ্ছে ছিল। পৌঁছেও গেছিলাম গেট অবধি। কিন্তু প্যালেস বদলে পাঁচ তারা হোটেল হয়ে যাওয়া ফলকনামার সিকিউরিটরা বিনয়ের সঙ্গে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন। দূর থেকে এক ঝলক দেখেই সাধ মেটালাম। আসলে ফলকনামা নামটি এক সময় হায়দ্রাবাদের সঙ্গে জুড়ে থাকত। হাওড়া থেকে বোধহয় আজও চলে সেকেন্দ্রাবাদগামী ফলকনামা এক্সপ্রেস। মনে পড়ল মছলিপত্তনম ও কুচিপুড়ি গ্রাম দেখে একবার বিজয়ওয়ারা থেকে ওই ট্রেনে হাওড়া ফিরেছিলাম।
ফিরলাম এবারও। নিজের মতো হায়দ্রাবাদ দেখে...একগাদা স্মৃতি নিয়ে আবার নিজের জায়গায়, সেই একই কাজে, একই জীবনে। নিজের মতোই লিখে রাখলাম সেই স্মৃতি। আজ থেকে বহু বছর পরে যদি কেউ এই লেখা পড়তে পড়তে সেদিনের হায়দ্রাবাদের সঙ্গে আমার দেখা এই হায়দ্রাবাদের কিছু মিল খুঁজে পায়, আমার মতোই অনুভব করে হায়দ্রাবাদি ফ্লেভার, তবে জানব শহরের মৃত্যু নেই, ভাগমতীরও মৃত্যু নেই। হ্যাঁ, সশরীরে সেদিন আমি থাকব না জানি কিন্তু থাকবে হায়দ্রাবাদ আর কোনও এক বালক, যে লিখবে আমার মতোই তার নিজস্ব হায়দ্রাবাদের কথা.....
No comments:
Post a Comment