অনুষ্ঠান তো কতই হল, জানলাম আর কী!
শৌভিক রায়
একের পর এক অনুষ্ঠান। পত্রিকা প্রকাশ। মোড়ক উন্মোচন। সম্মাননা প্রদান। ভাষণ। বিতর্ক। আলোচনা। সঙ্গীত। নৃত্য। নাটক।
একবার এক কবি বলেছিলেন, 'কবিতাই তো লিখছে, আর যাহোক, এ কে ৪৭ তো হাতে তুলে নেয়নি!' সত্যিই তো। কবিতা বা সাহিত্য তো সন্ত্রাস ছড়ায় না। কিন্তু তাঁকে বোঝাতে পারিনি যেটা কবিতার 'ক' পর্যন্ত হয়নি, সেটা নিজের চোখে পড়া বা কানে শোনাও কিন্তু কম যন্ত্রণাদায়ক নয়। আসলে 'সকলেই কবি নন, কেউ কেউ কবি' আপ্তবাক্যটি ভুলে গিয়ে যদি হঠাৎ করে বৃহৎ সংখ্যক মানুষ যা ইচ্ছে লিখতে শুরু করেন, তার অভিঘাত মারাত্মক হতে বাধ্য। হচ্ছেও তাই।
বিগত দেড় -দুই দশকে, এসব কিছুই যেন হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। বিভিন্ন পত্রিকা গোষ্ঠী নিজেদের মতো গ্রুপ করে পত্রিকা প্রকাশ থেকে অনুষ্ঠান সব চালিয়ে যাচ্ছে। অনুষ্ঠানে বৈচিত্র্য আনবার জন্য কখনও তার আয়োজন করা হচ্ছে নদীর তীরে, কখনও জঙ্গলে, কখনও সুসজ্জিত বৈঠকখানায়। তাতে অংশ নিতে আশেপাশের বিভিন্ন জায়গা থেকে স্থানীয় লেখক শিল্পীরা ছুটে আসছেন। পড়া হচ্ছে কবিতা, আঁকা হচ্ছে ছবি, চলছে নানা আলোচনা। কিন্তু একটু লক্ষ্য করলেই বোঝা যায়, এইসব অনুষ্ঠানের মুখগুলি প্রায় সর্বত্রই এক। আজ যে মানুষটি এই সাহিত্য গোষ্ঠীর উৎসবে, কাল সে আবার এক অন্য জায়গায়। সেই অর্থে নতুন মুখ নেই। একই শ্রোতা ও দর্শক একই কবি বা শিল্পী বা বক্তার কথা শুনছেন। এতে আখেরে লাভ কতটা হচ্ছে? শিল্প সাহিত্যকে কতটা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে? এটা ভাবার বোধহয় সময় হয়েছে।
সমাজ মাধ্যম শুরু হওয়ার পর শিল্প সাহিত্যের এই জোয়ারে আরও হাওয়া লেগেছে। কখনও কখনও মনে হয়, এই মাধ্যমে ছবি পোস্ট করাই বোধহয় এইসব অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য। এমনিতেই সমাজ মাধ্যম প্রত্যেক পত্রিকা গোষ্ঠীর নিজস্ব অ্যাকাউন্ট রয়েছে। সেখানে দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক অনলাইন পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। সঙ্গে রয়েছে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের খবরাখবর। আর সেসব করতে কখনও কখনও পত্রিকা গোষ্ঠীর কর্মকর্তারা এমন এমন কাণ্ড ঘটান, যা সত্যিই তাঁদের কাণ্ডজ্ঞানহীন করে তোলে। সস্তা প্রচারের লোভে তাঁদের এই জাতীয় কাজ যে শেষ পর্যন্ত শিল্প সাহিত্যকে হাসির খোরাক করে তুলছে, সেটা তাঁরা বুঝেও বোঝেন না।
যদি ভাবেন আর যাই হোক, এসবের মধ্যে রাজনীতি নেই, তবে ভুল। রাজনীতি ছাড়া কিছু হয় না। ফলে যে 'দাও ও নাও' নীতিতে সারা দুনিয়া চলে, এখানেও সেই একই অবস্থা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নির্লজ্জ চাটুকারিতা। তথাকথিত বড়র পেছনে মেজো আর তার পেছনে ছোট। সিঁড়ি বেয়ে আরও ওপরে উঠবার তাড়নায় হারিয়ে যাচ্ছে সাধনা। সামান্য যে দু-চারজন সাধক আছেন, তাঁরা এসব দেখে অনেকটা দূরে সরে গেছেন। আর তাঁদের জায়গা দখল করছেন স্তাবকের দল। প্রকৃত সাহিত্য বা শিল্প? দূর অস্ত। আত্মরতিতে মুগ্ধ অক্ষরকর্মী বা শিল্পী প্রসব করছেন এমন সব বস্তু যাতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে তাঁর আগামীর ধুরন্ধর ধান্দা।
আর একটা প্রবণতাও আজকাল বেশ দেখা যাচ্ছে। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের নিয়ে এসে ভজনা করা। এতে বেশ লাভ হয়। তথাকথিত ওপরতলার নজরে আসা যায়। পাওয়া যায় নানা সুযোগ সুবিধে। 'অনেকের সঙ্গে চেনা জানা' থাকার সুবাদে সমাজেও একটা বিশেষ জায়গা মেলে। শিল্প সাহিত্য চর্চার সঙ্গে এর কী সম্পর্ক জানি না। দিনের শেষে রয়ে যায় নিজের সৃষ্টি। সেটিই বলে শেষ কথা। এটা যদি ভুলে যাই, তবে শিল্পী বা লেখক কবির মৃত্যু হয় তৎক্ষণাৎ। দুর্ভাগ্য, সেটাই হচ্ছে। নিজের সৃষ্টিতে উত্তরণের চেষ্টার চাইতে যাঁরা মই ধরতে ব্যস্ত, তাঁরা আর যা হন, সৃষ্টিশীল নন।
কিছুদিন আগে দুই সহকর্মীর কথা শুনছিলাম। একজন অন্যজনকে বলছিলেন, 'এরা নিজেরাই নিজেদেরকে পুরস্কার দেয় রে! এদের লেখা পড়ে কে ?' কথাটা কিছুটা হলেও সত্যি। এটা ঠিক কোনও একটি ফ্রেটার্নিটি নিজেদের মধ্যে থাকা ব্যক্তিকেই চিনবে। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তার বাইরে কেউ তাকে চিনবে না, এটাও ঠিক নয়। কিন্তু হচ্ছে উল্টো। আর এটা তো সত্যি, এত লেখার ভিড়ে পাঠক কোথায়? বিভিন্ন জনপদে আগে তবু কিছু বইয়ের দোকান দেখা যেত। এখন সেসব আর ভাবা যায় না। বইমেলাগুলিতে যতটা ভিড়, সেই তুলনায় পাঠক কোথায়? বইয়ের বিক্রি ঠেকেছে তলানিতে। দুই একজন প্রথিতযশা কবি শিল্পী ছাড়া সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছতে পারছেন না কেউই। তারপরেও এত অনুষ্ঠান যে স্রেফ দেখনদারি সেটা বুঝতে কষ্ট হয় না।
আসলে বর্তমান সময় বড্ড হালকা। আজকাল ভাঁড়ামিকেও মানুষ 'ভাল হাস্যরস' মনে করেন। আমাদের সুস্থিত চিন্তা ভাবনায় এমন এক তালা লেগেছে যে, ভাল মন্দের বিচার করতেও ভুলে গেছি আমরা। সেখানে শিল্প সাহিত্য ইত্যাদি তো অনেক উঁচুদরের ব্যাপার। এত অনুষ্ঠান, এত প্রকাশ ইত্যাদির পরেও সমরেশ বসু, অমিয়ভূষণ মজুমদার, দেবেশ রায়, অরুণেশ ঘোষ, পুণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত, জগন্নাথ বিশ্বাস, বেণু দত্তরায়, পীযুষ ভট্টাচার্য প্রমুখদের নাম সাধারণদের জানাশোনার বাইরেই থেকে যায়, তবে কী লাভ এসব লোক দেখিয়ে!
(প্রকাশিত- প্রবাহ তিস্তা তোর্ষা/ সম্পাদক- শ্রী কৃষ্ণ দেব)











































