Saturday, May 31, 2025


 

অনুষ্ঠান তো কতই হল, জানলাম আর কী!
শৌভিক রায়
একের পর এক অনুষ্ঠান। পত্রিকা প্রকাশ। মোড়ক উন্মোচন। সম্মাননা প্রদান। ভাষণ। বিতর্ক। আলোচনা। সঙ্গীত। নৃত্য। নাটক।
কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ একই চিত্র। আর এই সব দেখে মনে হচ্ছে, বঙ্গে যেন সাহিত্য সংস্কৃতির জোয়ার এসেছে। চারদিকে গিজগিজ করছেন লেখক-কবি-শিল্পীরা। ইনি বলছেন, 'আমাকে দেখ', উনি বলছেন তাঁকে দেখতে!
একবার এক কবি বলেছিলেন, 'কবিতাই তো লিখছে, আর যাহোক, এ কে ৪৭ তো হাতে তুলে নেয়নি!' সত্যিই তো। কবিতা বা সাহিত্য তো সন্ত্রাস ছড়ায় না। কিন্তু তাঁকে বোঝাতে পারিনি যেটা কবিতার 'ক' পর্যন্ত হয়নি, সেটা নিজের চোখে পড়া বা কানে শোনাও কিন্তু কম যন্ত্রণাদায়ক নয়। আসলে 'সকলেই কবি নন, কেউ কেউ কবি' আপ্তবাক্যটি ভুলে গিয়ে যদি হঠাৎ করে বৃহৎ সংখ্যক মানুষ যা ইচ্ছে লিখতে শুরু করেন, তার অভিঘাত মারাত্মক হতে বাধ্য। হচ্ছেও তাই।
বিগত দেড় -দুই দশকে, এসব কিছুই যেন হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। বিভিন্ন পত্রিকা গোষ্ঠী নিজেদের মতো গ্রুপ করে পত্রিকা প্রকাশ থেকে অনুষ্ঠান সব চালিয়ে যাচ্ছে। অনুষ্ঠানে বৈচিত্র্য আনবার জন্য কখনও তার আয়োজন করা হচ্ছে নদীর তীরে, কখনও জঙ্গলে, কখনও সুসজ্জিত বৈঠকখানায়। তাতে অংশ নিতে আশেপাশের বিভিন্ন জায়গা থেকে স্থানীয় লেখক শিল্পীরা ছুটে আসছেন। পড়া হচ্ছে কবিতা, আঁকা হচ্ছে ছবি, চলছে নানা আলোচনা। কিন্তু একটু লক্ষ্য করলেই বোঝা যায়, এইসব অনুষ্ঠানের মুখগুলি প্রায় সর্বত্রই এক। আজ যে মানুষটি এই সাহিত্য গোষ্ঠীর উৎসবে, কাল সে আবার এক অন্য জায়গায়। সেই অর্থে নতুন মুখ নেই। একই শ্রোতা ও দর্শক একই কবি বা শিল্পী বা বক্তার কথা শুনছেন। এতে আখেরে লাভ কতটা হচ্ছে? শিল্প সাহিত্যকে কতটা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে? এটা ভাবার বোধহয় সময় হয়েছে।
সমাজ মাধ্যম শুরু হওয়ার পর শিল্প সাহিত্যের এই জোয়ারে আরও হাওয়া লেগেছে। কখনও কখনও মনে হয়, এই মাধ্যমে ছবি পোস্ট করাই বোধহয় এইসব অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য। এমনিতেই সমাজ মাধ্যম প্রত্যেক পত্রিকা গোষ্ঠীর নিজস্ব অ্যাকাউন্ট রয়েছে। সেখানে দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক অনলাইন পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। সঙ্গে রয়েছে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের খবরাখবর। আর সেসব করতে কখনও কখনও পত্রিকা গোষ্ঠীর কর্মকর্তারা এমন এমন কাণ্ড ঘটান, যা সত্যিই তাঁদের কাণ্ডজ্ঞানহীন করে তোলে। সস্তা প্রচারের লোভে তাঁদের এই জাতীয় কাজ যে শেষ পর্যন্ত শিল্প সাহিত্যকে হাসির খোরাক করে তুলছে, সেটা তাঁরা বুঝেও বোঝেন না।
যদি ভাবেন আর যাই হোক, এসবের মধ্যে রাজনীতি নেই, তবে ভুল। রাজনীতি ছাড়া কিছু হয় না। ফলে যে 'দাও ও নাও' নীতিতে সারা দুনিয়া চলে, এখানেও সেই একই অবস্থা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নির্লজ্জ চাটুকারিতা। তথাকথিত বড়র পেছনে মেজো আর তার পেছনে ছোট। সিঁড়ি বেয়ে আরও ওপরে উঠবার তাড়নায় হারিয়ে যাচ্ছে সাধনা। সামান্য যে দু-চারজন সাধক আছেন, তাঁরা এসব দেখে অনেকটা দূরে সরে গেছেন। আর তাঁদের জায়গা দখল করছেন স্তাবকের দল। প্রকৃত সাহিত্য বা শিল্প? দূর অস্ত। আত্মরতিতে মুগ্ধ অক্ষরকর্মী বা শিল্পী প্রসব করছেন এমন সব বস্তু যাতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে তাঁর আগামীর ধুরন্ধর ধান্দা।
আর একটা প্রবণতাও আজকাল বেশ দেখা যাচ্ছে। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের নিয়ে এসে ভজনা করা। এতে বেশ লাভ হয়। তথাকথিত ওপরতলার নজরে আসা যায়। পাওয়া যায় নানা সুযোগ সুবিধে। 'অনেকের সঙ্গে চেনা জানা' থাকার সুবাদে সমাজেও একটা বিশেষ জায়গা মেলে। শিল্প সাহিত্য চর্চার সঙ্গে এর কী সম্পর্ক জানি না। দিনের শেষে রয়ে যায় নিজের সৃষ্টি। সেটিই বলে শেষ কথা। এটা যদি ভুলে যাই, তবে শিল্পী বা লেখক কবির মৃত্যু হয় তৎক্ষণাৎ। দুর্ভাগ্য, সেটাই হচ্ছে। নিজের সৃষ্টিতে উত্তরণের চেষ্টার চাইতে যাঁরা মই ধরতে ব্যস্ত, তাঁরা আর যা হন, সৃষ্টিশীল নন।
কিছুদিন আগে দুই সহকর্মীর কথা শুনছিলাম। একজন অন্যজনকে বলছিলেন, 'এরা নিজেরাই নিজেদেরকে পুরস্কার দেয় রে! এদের লেখা পড়ে কে ?' কথাটা কিছুটা হলেও সত্যি। এটা ঠিক কোনও একটি ফ্রেটার্নিটি নিজেদের মধ্যে থাকা ব্যক্তিকেই চিনবে। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তার বাইরে কেউ তাকে চিনবে না, এটাও ঠিক নয়। কিন্তু হচ্ছে উল্টো। আর এটা তো সত্যি, এত লেখার ভিড়ে পাঠক কোথায়? বিভিন্ন জনপদে আগে তবু কিছু বইয়ের দোকান দেখা যেত। এখন সেসব আর ভাবা যায় না। বইমেলাগুলিতে যতটা ভিড়, সেই তুলনায় পাঠক কোথায়? বইয়ের বিক্রি ঠেকেছে তলানিতে। দুই একজন প্রথিতযশা কবি শিল্পী ছাড়া সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছতে পারছেন না কেউই। তারপরেও এত অনুষ্ঠান যে স্রেফ দেখনদারি সেটা বুঝতে কষ্ট হয় না।
আসলে বর্তমান সময় বড্ড হালকা। আজকাল ভাঁড়ামিকেও মানুষ 'ভাল হাস্যরস' মনে করেন। আমাদের সুস্থিত চিন্তা ভাবনায় এমন এক তালা লেগেছে যে, ভাল মন্দের বিচার করতেও ভুলে গেছি আমরা। সেখানে শিল্প সাহিত্য ইত্যাদি তো অনেক উঁচুদরের ব্যাপার। এত অনুষ্ঠান, এত প্রকাশ ইত্যাদির পরেও সমরেশ বসু, অমিয়ভূষণ মজুমদার, দেবেশ রায়, অরুণেশ ঘোষ, পুণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত, জগন্নাথ বিশ্বাস, বেণু দত্তরায়, পীযুষ ভট্টাচার্য প্রমুখদের নাম সাধারণদের জানাশোনার বাইরেই থেকে যায়, তবে কী লাভ এসব লোক দেখিয়ে!
(প্রকাশিত- প্রবাহ তিস্তা তোর্ষা/ সম্পাদক- শ্রী কৃষ্ণ দেব)

Wednesday, May 28, 2025


 

এবারে, পয়লা বৈশাখে, রঙালি বিহু দেখতে পৌঁছে গিয়েছিলাম অহম রাজ্যের একদা রাজধানী শিবসাগরে। ইতিমধ্যে দুটি ছবি সহ সেই আখ্যান প্রকাশিত হয়েছে উত্তরবঙ্গ সংবাদের রংদার রোববারের (১৮ মে, ২০২৫) `আয় মন বেড়াতে যাবি...` বিভাগে। শিবসাগর নিয়ে নতুন কিছু বলছি না। শুধু পোস্ট করছি অপ্রকাশিত কিছু ছবি।






















Monday, May 26, 2025








টিভির পর্দায় নন্দীঘোষ, তালধ্বজ এবং দর্পদলন বা পদ্মধ্বজ-কে দেখি প্রতিবারই। একবার অবশ্য চাক্ষুস দেখেছিলাম। টেনেও ছিলাম। গা বেয়ে উঠে ওদের তিন মালিককেও তিন-চার হাত দূরত্ব থেকেও দেখেছি।

কিন্তু কীভাবে ওদের বানানো হয়, সেটা দেখিনি আগে। এবার সৌভাগ্য হল সেটারও।কারা এরা? পুরীর জগন্নাথদেবের রথের নাম নন্দীঘোষ। বলরামের নিজস্ব রথ তালধ্বজ। দর্পদলন বা পদ্মধ্বজে আসীন হন সুভদ্রা। নিজেদের আবাস ছেড়ে গুন্ডিচা বাড়িতে মাসির কাছে যান বিশ্রাম নিতে।
এর বেশি না বললেও হবে। সকলেই জানেন.....

ইউটিউব লিংক

Saturday, May 24, 2025




ঘরের কাছেই (চতুর্থ পর্ব)

শৌভিক রায় 

অর্কিড পার্কের অনুষ্ঠান শুরু হল সন্ধ্যায়। আগে থেকে টিকিট সংগ্রহ না করলে প্রথম দিকে বসবার সুযোগ পাওয়া যায় না। শুরুতেই ঝংকার নামের বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের ফিউশন। কী নেই তাতে? অসমের ঐতিহ্যবাহী ঢোল থেকে শুরু করে মোষের শিংয়ের পেপা, বাঁশ নির্মিত গগনা, খুটুলি, টোকা, দোতারা, টোকারি, শিফুঙ, নাগারা সহ নানা বাদ্যযন্ত্র। মিনিট দশকের সেই অনুষ্ঠান মুহূর্তেই মন কেড়ে নিল। 

এরপর শুরু হল বর্ণময় অসমের বিভিন্ন জনজাতির নৃত্য ও গীত। উল্লেখ্য অসমের জনজাতির মধ্যে রয়েছে বোরো, মিরি, কাৰ্বি, রাভা, কাছারি ইত্যাদি। মঞ্চ ভরে উঠলো তাদের ঘূর্ণন, বাগরুমবার, হামজার, মাটিয়াখাড়া, খামসামসুয়া, দেওধনি, ডোমেদিরাং এবং অতি অবশ্যই বিহু নাচ দিয়ে। এইসব নাচের নামগুলি মঞ্চ থেকে ঘোষিত হচ্ছিল। তখন জেনেছি। যদি কোনও নাম ভুল লিখে থাকি, তবে আগেই ক্ষমা চাইছি। শুনে শুনে লেখায় ভুল হতে পারে নিজের।  


























অনুষ্ঠান শেষে সঞ্চালক ও শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলবার সুযোগ হয়েছিল। আমরা কোচবিহারের মানুষ শুনে তাঁরা খুব খুশি হলেন। কোচবিহারের মধুপুর সত্ৰ অসমের মানুষদের কাছে পবিত্র স্থান। এখানে শংকরদেবের মন্দিরে তাঁদের নিত্য আগমন। এই জায়গাটির দেখভালও করেন অসম সরকার। 

কাজিরাঙ্গা আপাতত এই অবধিই। নদী, পাহাড়, চা বাগান, জনজাতি, বিহু, সবুজ অরণ্য মিলিয়ে কাজিরাঙ্গা যেন এক অলৌকিক ভ্রমণ। শুধু বন্যপ্রাণী নয়, তার সব রূপ-রস-গন্ধ-শব্দ-স্পর্শ নিয়ে কাজিরাঙ্গা এক অসামান্য স্মৃতি হয়ে রইল।  

(শেষ)

Friday, May 23, 2025


 

ঘরের কাছেই (তৃতীয় পর্ব)
শৌভিক রায়   

অরণ্য কি শুধুই উপভোগের? কিছু শেখার নেই তার কাছে? 

প্রশ্নটা সঙ্গত। বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বাসস্থান, সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট ইত্যাদির পরেও, রয়ে যায় আরও কিছু। 

নিশার কথাই ধরা যাক। ঝকঝকে হাসির এই ছোট্ট মেয়েটির বাবা কাজিরাঙ্গা অরণ্যের কর্মী। গ্রাজুয়েশন করে নিশা পারিবারিক ছোট্ট দোকানটি দেখভাল করছে। পাশাপাশি চলছে চাকরির প্রস্তুতি। চা, পিঠে, সিঙাড়া, চিপস, অর্ডার করলে মুরগির মাংস ইত্যাদি সবই পাওয়া যায় ওদের দোকানে। দুদিন বেশ আড্ডা জমল ওদের সবার সঙ্গে। বিহুর জন্য তৈরি পিঠে দিয়ে ওরা পরদিন আমাদের আপ্যায়ন করল। 

কাজিরাঙ্গাকে কেন্দ্র করে এরকম অজস্র ছোট-বড় দোকান রয়েছে। জখলাবাঁধা পার করেই শুরু হয়ে যায় সেসব। রয়েছে প্রচুর রিসোর্ট, হোটেল, হোমস্টে। তবে সাধারণ মানুষদের বাড়িঘরে কিন্তু দারিদ্রের স্পর্শ টের পাওয়া যায়। কিন্তু দারিদ্র যে পরিচ্ছন্নতার অন্তরায় হতে পারে না, সেটা শিখতে হয়ে তাঁদের কাছে। প্রতিটি বাড়ি দৃষ্টিনন্দন, পরিষ্কার ও যত্নে রাখা। 

পর্যটন আর চা বাগান এখানকার মূল জীবিকা। ফলে স্থানীয় মানুষদের পাশাপাশি হোটেল ও রিসোর্টে মানুষের ভিড় যথেষ্ট। এসব কিছুই কাজিরাঙ্গার বাস্তুতন্ত্রে কোনও প্রভাব ফেলছে কিনা সেটা নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে। তবে কাজিরাঙ্গা যে প্রচুর সংখ্যক মানুষকে অন্ন সংস্থান করছে সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। 

এই প্রসঙ্গে বলব অর্কিড পার্কের কথা। ইতিমধ্যে উত্তরবঙ্গ সংবাদে (১২ মে, ২০২৫) উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় সেই বিষয়ে লিখেছি। তাই বিস্তারিত যাচ্ছি না।  ষোলো বিঘা জমির ওপর, ৫০০ প্রজাতির অর্কিড নিয়ে গড়ে তোলা, দেশের বৃহত্তম অর্কিড পার্কটি না দেখলে বোঝা ঠিক যায় না। অর্কিড ছাড়াও এখানকার মিউজিয়ামে অসমের চিরাচরিত বাদ্যযন্ত্রের বিপুল সম্ভার রয়েছে। দেখা যায় কীভাবে তাঁত বোনেন স্থানীয়রা। কোহরা রেঞ্জের এই পার্কে প্রতি সন্ধ্যায় বর্ণময় অসমের সংস্কৃতি তুলে ধরেন স্থানীয় শিল্পীরা। বিভিন্ন জনজাতির নৃত্য-গীত পরিবেশিত হয়। পরবর্তী পর্বে বিশেষ কিছু না লিখে সেই অনুষ্ঠানের কিছু ভিডিও পোস্ট করব। আমি নিশ্চিন্ত, সেগুলি রসিকজনের ভাল  লাগবে। অর্কিড পার্কের এই অনুষ্ঠানের কথা আমাকে প্রথম বলেছিল শিলিগুড়ির ভাই চন্দ্রাংশু। কৃতজ্ঞ রইলাম ওর কাছে।
























কাজিরাঙ্গায় আমাদের রিসোর্টে পেলাম কফি গাছে ধরে থাকা কফি ফল। রইল তার ছবিও। রিসোর্টের মালিক অহমিয়া যুবক অর্পণ নিজে ফিজিওথেরাপিস্ট। বাবা ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার, মা কলেজে পড়াতেন। ছেলেটির সরল ও সুন্দর ব্যবহার মন ভরিয়ে দেয়। এতটাই মিশে গেল আমাদের সঙ্গে, রীনাকে রান্নাঘর ছেড়ে দিল নিজেদের মতো খাবার বানানোর জন্য। 

এই পোস্টের সঙ্গে নিজেদেরও কিছু দিচ্ছি। ছবি রইল আমাদের সঙ্গী কুরবানের। ওর গাড়িতেই আমরা ঘুরে বেড়াই এদিক-ওদিক।

যাঁরা আগামীতে কাজিরাঙ্গা যেতে চান, তাঁদের বলব অর্কিড পার্কের অনুষ্ঠান অবশ্যই দেখবেন। যদি চারটি জোনেই সাফারি করতে চান, তবে দুদিন লাগবে। দেড় দিনে তিনটে করা যায়। তবে বাগোরি আর কোহরাতেই বেশি চলে সাফারি। বুড়া পাহাড়ের চাহিদাও কম নয়। 

অন্যদিকে পক্ষীপ্রেমীদের স্বর্গ হল কাজিরাঙ্গা। ভাল ক্যামেরা থাকলে ছবি তুলে মজা পাওয়া যায়। তবে তার জন্য বিশেষ সময় হল শীতকাল, যখন পরিযায়ীরা ভিড় করে আগরতলি জোনে। অন্যান্য জোনে তাদের দেখা মিললেও, সংখ্যায় ও বৈচিত্রে কিছুটা কম। 

কাজিরাঙ্গার বন্যা মারাত্মক। এর আগে খবরের কাগজে এখানকার বন্যায় পশুদের ভেসে যাওয়া বা জাতীয় সড়কে আশ্রয় নেওয়ার কথা পড়লেও, ব্যাপারটা বুঝে বিস্মিত ও অবাক হলাম। এতটাও ভয়ানক হতে পারে ডিফলু সহ অন্যান্য নদীর বন্যা! কে বলবে একদিকে পাহাড় আর তার পাদদেশে ছবির মতো কাঞ্চনগুড়ি, হাতিখুলি, মেঠানি ইত্যাদি চা বাগান আর অসাধারণ ল্যান্ডস্কেপের অরণ্য সুন্দরী কাজিরাঙ্গা কখনও কখনও অত্যন্ত ভয়ানক!

(ক্রমশ)

Thursday, May 22, 2025





ঘরের কাছেই (দ্বিতীয় পর্ব)

শৌভিক রায়


মেরি কার্জন। নামটা চেনা? না বোধহয়।
লর্ড কার্জন? হ্যাঁ। জানা।
কিছু বোঝা গেল?
ঠিক ধরেছেন। ভাইসরয় লর্ড কার্জনের স্ত্রী।
কিন্তু কাজিরাঙ্গা প্রসঙ্গে হঠাৎ এঁদের কথা কেন? আসলে এঁরা না থাকলে কাজিরাঙ্গাকেই হয়ত পেতাম না আমরা। ইংরেজরা আমাদের দেশ থেকে বেশিটাই নিয়েছে। কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু দিয়েছেও অনেকই। অস্বীকার করার উপায় নেই।
সেদিন যদি মেরি কার্জন তাঁর ভাইসরয় স্বামীকে কাজিরাঙ্গা গঠনের কথা না বলতেন, তবে হয়ত হতই না এটি।
মেরি গিয়েছিলেন কাজিরাঙ্গায়। ভারতের বিখ্যাত এক শৃঙ্গ গণ্ডার দেখতে। এমনই দুর্ভাগ্য যে, একটিও দেখতে পারেননি তিনি। তাঁর বুঝতে অসুবিধে হয়নি যে, এই অত্যন্ত বলশালী নিরীহ প্রাণীটির অস্তিত্ব বিপন্ন। সুতরাং দেরি না করে লর্ড কার্জনের কাছে দরবার করেন মেরি। আর তার ফলেই ১৯০৮ (অনেকের মতে ১৯০৫) সালে গড়ে ওঠে ২৩২ বর্গ কিমির পৃথিবীখ্যাত এই পার্ক।
আজ অবশ্য পার্কের এলাকা আরও বড়। ৪৩০ বর্গ কিমি। গণ্ডারের সংখ্যা এই মুহূর্তে ২২০০-এর বেশি। পৃথিবীর তিন ভাগ গণ্ডারের দুই ভাগই কাজিরাঙ্গার। রয়েছে হাতি, হরিণ, বুনো মোষ ইত্যাদি নানা প্রাণী। বিভিন্ন প্রজাতির পাখিদেরও দেখা মেলে কাজিরাঙ্গায়। এলিফ্যান্ট ঘাসের প্রান্তর, জলাশয় আর গভীর অরণ্যের কাজিরাঙ্গায় বাঘ দেখা যাচ্ছে বলে, ২০০৬ থেকে টাইগার রিজার্ভের মর্যাদা পেয়েছে এটি।
আর ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের তকমা? সে তো লেগেছে সেই ১৯৮৫ সালে!
চারটি ভাগে বিভক্ত কাজিরাঙ্গা। সেন্ট্রাল বা কোহরা জোন, ওয়েস্টার্ন বা বাগোরি জোন, ইস্টার্ন বা আগরতলি জোন এবং ঘোড়াখাটি বা বুড়া পাহাড় জোন। সাফারি চলে সব জায়গাতেই। তবে পাখির দেখা বেশি মেলে ইস্টার্ন বা আগরতলি জোনে। বিশেষ করে শীতকালে। বুড়া পাহাড়ের নৈসর্গ অত্যন্ত সুন্দর। যারা আগে পাহাড় ও চা বাগান দেখেননি, তাদের ভাল লাগতে বাধ্য। অন্য সব সাফারিতেই মোটামুটি একই ধরণের বনচরদের দেখা পাওয়া যায়।




















আমরাও পেলাম। এত গণ্ডার...এত গণ্ডার যে কী আর বলব! কবিতার লাইন বদলে বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল, `এখানে গণ্ডার গাভীর মতো চরে`। পাওয়া গেল হাতি, হরিণ, মোষ আর নানা ধরণের পাখিও। গত সন্ধ্যায় হামলে পড়ে ছবি তুলে সত্যিই যে বোকামি করেছি, সেটা বুঝতে পেরে নিজেরই তখন হাসি পাচ্ছিল।
হাতিরা অবশ্য একটু বিরক্ত হয়েছিল আমাদের ওপর। বিশেষ করে দলপতিটি। রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে থাকল খানিকক্ষণ। শেষটায় আমাদের গাইড সাইদুল প্রার্থনার মতো বিড়বিড় করে বলতে শুরু করল, `বাবা জাআআ এ বাবা যাআআ..মোরা তোর ব্যাটা রে....যাতি দে বাবা...এ বাবা...` সাইদুলের প্রার্থনার জন্যই হোক বা অন্য কোনও কারণে, শেষটায় তিনি পথ ছাড়লেন। আমরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
গণ্ডার আর হাতির অবাধ বিচরণ সত্বেও আমার কিন্তু ভাল লাগল বুনো মোষগুলোকে দেখে। কী রাজকীয় চেহারা। চোখের দৃষ্টি কখনও সরল, কখনও ক্রুর। হবেও সেটা। ওদের এলাকায় আমাদের এই দখলদারি কত আর সহ্য করবে! প্যাঁচার বসে থাকা, কচ্ছপদের রোদ পোহানো ইত্যাদি দেখে একটি জায়গায় এসে চোখ কপালে উঠল।
সেখানকার পিলারে মার্ক করা রয়েছে, বর্ষায় কাজিরাঙ্গায় জলস্তর কোথায় ওঠে! কী মারাত্মক কাণ্ড। কীভাবে সামলায় এই বুনোরা?
প্রকৃতির কাছে এরা সত্যিই অসহায়....