Thursday, September 26, 2024

 র-য়ে রাজস্থান 

শৌভিক রায় 



বিদ্যাধর ভট্টাচার্য? না। নামটি তিনি শোনেননি। জয়পুরের আদি বাসিন্দা সত্তোরোর্ধ জগৎকুমার মিনা ও তাঁর সঙ্গীদের কেউই জানেন না। 
না জানাটাই স্বাভাবিক। আমরা বাঙালিরাই বা কজন জানি! 

নিউ দিল্লি স্টেশনে নেমে সোজা রাজেশের গাড়িতে চেপেছি। গুরগাঁয়ের এক রেস্টুরেন্টে খানিক দাঁড়িয়ে দিল্লি-জয়পুর এক্সপ্রেস হয়ে সোজা জয়পুর। এই রাস্তাটি আমার চেনা। আগেও গেছি। তবু রেওয়ারি, মহেন্দ্রগড়, আলোয়ার ইত্যাদি নামগুলি দেখে মন চনমনে হয়ে উঠল। আসলে রাজস্থানের আবহাওয়াটাই এমন। কিছুতেই ঝিমিয়ে থাকতে দেয় না। সেটা অবশ্য ঋষিকে দেখেও বুঝতে পারছি। ট্রেনের ধকলে বেচারা কাহিল হয়ে পড়েছিল। এখন মোটামুটি ঠিক। 

অবশ্য এর জন্য রাজেশকে কৃতিত্ব দিতে হয়। ওর কথাতেই গুরগাঁতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হল যে, যোধপুর নয়, জয়পুর দিয়ে ভ্রমণ শুরু হোক। তার কারণ ঋষি। জয়পুর পৌঁছে যাব চার-পাঁচ ঘন্টায়। যোধপুর অনেকটা সময় নেবে। তবে আমি জানি, রাজেশের যে দক্ষতা তাতে জয়পুর তিন/ সাড়ে-তিন ঘন্টায় পৌঁছে দেবে। আগেও ওর সঙ্গে গেছি। যতটা আগে পৌঁছনো যায়, তত ভাল। ঋষিকে বিশ্রাম দেওয়া প্রয়োজন। 

জয়পুরে ঢুকতেই অম্বর আর নাহানগড় ফোর্টের ঝলক। আর নাহারগড়ের নিচে গৈতর বা মহারাজাদের সমাধিভূমি। তার উল্টোদিকে মানসাগর লেক। লেকে প্রতাপ সিংয়ের নির্মিত জলমহল। ট্যারা চোখে দেখলাম ঋষির চোখেমুখে উত্তেজনা। বুঝলাম বিপদ কেটে গেছে। 



জগৎকুমার মিনা ও তাঁর সঙ্গীরা মর্নিং ওয়াক শেষে চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছিলেন। দোকানটি আমাদের হোটেলের সামনে। আমিও তখন দোকানে। ভাব জমে গেল। প্রবীণ মানুষদের আমার একটু বেশি পছন্দ। সেটার পেছনে অবশ্য নিজের স্বার্থ আছে কিছুটা। কেননা তাঁদের কাছে অনেক কিছু জানা যায়। আর এই জানাটা জেনে নিতে পারলে অতীতের অনেক কিছু চোখে ভেসে ওঠে। 

কিন্তু তাঁরাও কেউ বিদ্যাধর ভট্টাচার্য সম্পর্কে কিছুই বলতে পারলেন না। আমি নিজেও যে খুব কিছু জানি তেমন নয়। শুধু এটুকু জেনেছি, এই মানুষটির সহযোগিতায় ১৭২৭ সালে সোয়াই জয় সিং আধুনিক জয়পুর নির্মাণে হাত দেন। তদানীন্তন রাজধানী অম্বরে তখন জলের অভাব দেখা দিয়েছিল। বেড়েছিল জনসংখ্যা। সিটি প্যালেসকে মাঝখানে রেখে শহরকে নয়টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। রাখা হয় আটটি প্রবেশদ্বার। ১৮৭৬ সালে প্রিন্স অফ ওয়েলসকে স্বাগত জানাতে শহরকে সাজানো হয়েছিল গোলাপি রঙে। সেই থেকেই এই শহর পিঙ্ক সিটি নামে পরিচিত। যদিও তার নাম জয় সিংয়ের নামেই জয়পুর। 

সকাল নয়টা নাগাদ চললাম সিটি প্যালেস। বিত্ত, বৈভব আর রুচির ত্রহ্য স্পর্শে যে কী হতে পারে সেটি বোঝা যায় এই প্যালেস দেখলে। জয় সিংয়ের হাতে গড়ে উঠলেও এই প্যালেস কিন্তু পরবর্তীতে তাঁর বংশধরদের হাতে আরও সেজে উঠেছে। রাজপুত ও মুঘল ঘরানার সিটি প্যালেসের অনেক কিছুই তাক লাগানো।  মহারানি মহলের অস্ত্রসম্ভার, মুবারক মহলের বস্ত্র সামগ্রী, দেওয়ান-ই-আমের শিল্পকলা দেখে বিস্মিত হতে হয় বারবার। আবার দেওয়ান-ই-খাসে জল রাখবার রূপোর মহাপাত্র দুটি না দেখলে বোঝা যায় না সে দুটি সত্যিই কত বড়! গিনেজ বুক অফ রেকর্ডসে জায়গা পেয়েছে দ্বিতীয় মাধো সিংয়ের এই মহাপাত্র দুটি। চন্দ্রমহলে প্রবেশ নিষেধ। ওখানে রাজপরিবারের সদস্যরা আজও রয়েছেন। আমরা কোচবিহারের শুনে প্যালেসের কর্মীদের কাছে একটু বাড়তি খাতির পেলাম। কেননা তাদের রাজমাতা গায়েত্রী দেবীর শহর তো সেটা! 

যন্তর মন্তরে ঢুকে আমার বহুদিনের ইচ্ছে পূর্ণ হল। চোখের সামনে বিশ্বের বৃহত্তম ও উচ্চতম সূর্যঘড়ি। জ্যোতির্বিজ্ঞানী জয় সিং এই অনন্য ঘড়ির পেছনে। তবে জয়প্রকাশ যন্ত্র, লঘু সম্রাট, গ্রেট রাম, স্মল রাম, চক্র যন্ত্র ইত্যাদিও ধারে ও ভারে কম নয়। দিল্লির যন্তর মন্তর মাথায় রেখেও নির্দ্বিধায় বলা যায়, জয়পুরের গ্ল্যামার আর কোথাও পাওয়া যায় না। এতটাই দুর্দান্ত সে। চমক লাগল রামনিবাস বাগানের আলবার্ট হলে গিয়েও। অসামান্য মিউজিয়াম এটি। স্যার সুইনটন জ্যাকবের নক্সায় নির্মিত এই বিরাট হলটি দুষ্প্রাপ্য সব ছবি, চোখ-ধাঁধানো কার্পেট, হাতির দাঁতের তৈরি মহামূল্যবান শিল্পকর্ম, স্বচ্ছ স্ফটিকের পাত্র ইত্যাদি নিয়ে দেশের অন্যতম সেরা সংগ্রহশালা। চমৎকৃত ও রোমাঞ্চিত হতে হয় সোয়াই প্রতাপ সিং নির্মিত হাওয়া মহলে গিয়ে। ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়ার পোস্টারে দেখা হাওয়া মহলের ৯৫৩টি জানালার প্রত্যেকটিই ইতিহাসকে স্পর্শ করে আছে। এই জানালাগুলি দিয়েই রাজবধূর শহর জীবন দেখতেন। পাঁচতলা অবধি উঠে গেলাম। শহরের `বার্ডস আই ভিউ` সহ প্রাণ জুড়িয়ে দিল ফুরফুরে হাওয়া। দেখে নিলাম মতি ডুঙরিও। এখানকার প্রাসাদেই থাকতেন গায়েত্রী দেবী। সঙ্গের গণেশ মন্দিরটিও দ্রষ্টব্য। বিড়লা  মন্দিরে অবশ্য আর গেলাম না। একটি বিড়লা  মন্দির দেখলেই মোটামুটি অন্যান্য বিরল মন্দির সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে ১১ কিমি দূরে সাদা মার্বেল ও লাল বালি পাথরের তৈরি অম্বর ফোর্ট বোধহয় জয়পুরের সেরা গর্ব। প্রবেশদ্বার সূরজ পোল দিয়ে ঢুকতেই ইতিহাস সামনে এসে দাঁড়ায়। জালেব চক, দেওয়ানি আম, শিশ মহল, যশ মন্দির, সোহাগ মন্দির, সুখ মন্দির, জেনানা মহল, যশোরেশ্বরী মন্দির....কাকে ছেড়ে কার কথা বলব! পাহাড়ের ওপরে দীর্ঘ এলাকা জুড়ে থাকা এই ফোর্ট যেন রাজস্থানের অতীত গৌরবকে সযত্নে ধরে রেখেছে। কাছেই ৭ কিমি দূরে নাহারগড় ফোর্ট সম্পর্কেও একই কথা বলা চলে। তবে এর সৌন্দর্য চাঁদনি রাতে। অপার্থিব হয়ে ওঠে সে। 

জয়গড় ফোর্টটিও সুন্দর। প্রায় সাড়ে আট কিমি এর বিস্তৃতি। অস্ত্রভাণ্ডার, সেনানিবাস, ধনাগার ইত্যাদি নিয়ে সে যেন কিছুটা আলাদা। যেমনটি শিশোদিয়া রানির বাগান আর বিদ্যাধরজি কি বাগ। আমরা অবশ্য এই যাত্রায় বাদ রেখেছিলাম আলোয়ার, সরিসকা, দীগ, ভরতপুর আর রণথম্বর। ফলে বাদ পড়ে রইল মনসুন প্যালেস, লৌহগড় দুর্গ, গোলবাগ প্রাসাদের মতো কিছু নামি জায়গা। কিন্তু এক যাত্রায় সব সম্ভব নয়। এমনিতেও আমাদের প্ল্যানে রাজস্থানের অনেকটা অংশই রয়েছে। 













জয়পুর থেকে আজমের পথেই যেন  আসল রাজস্থান দর্শন হল। সৌজন্যে রাজেশ। ঝাঁ চকচকে রাস্তা ছেড়ে গ্রামের ভাঙাচোরা রাস্তায় ঝাঁকুনি খেতে খেতে প্রশ্ন করলাম, 
- রাস্তা কে হাল ইতনা বুরা কিউ ভাই?
- বাবুজি, আপ তো রাইটার হ্যায় না? দেখিয়ে হালত। ট্যুরিস্ট লোগ তো চকাচক রাস্তে সে ইঁহা ওহা ঘুমতে হ্যায়। ফরেনার ভি। জারা দেখিয়ে এহি হাল হ্যায় রাজস্থান কা। 
হাতে গোনা কয়েকটি বাড়ি আর দু`চারটে দোকান। জলের কলের সামনে মহিলাদের ভিড়। রুক্ষ বাতাসে মোচে তা দিয়ে বসে থাকা দেহাতি পুরুষ। বেঁটে বেঁটে কাঁটা গাছ। বালি বালি লাল মাটি। মরুভূমি না হলেও, তার ছাপ স্পষ্ট। উন্নয়ন বা বিকাশ এখানে রাস্তায় দাঁড়িয়ে নেই। আসলে ভারতের অধিকাংশ গ্রামাঞ্চলে তারা থাকে না। রাজস্থান আলাদা নয়। তাই সে আর ব্যতিক্রম হবে কেন? 

পারস্য থেকে আসা সুফি সাধক মঈনুদ্দিন চিস্তির দরগা হল আজমেরের প্রধান আকর্ষণ। মুঘল সম্রাট হুমায়ুন দরগাটি নির্মাণ করলেও তার শ্রীবৃদ্ধি ঘটান আকবৰ ও শাজাহান। মসজিদটি তাঁরাই তৈরি করেন। খাজা সাহিব দরগায় সোনায় মোড়ানো গম্বুজ, রূপোর প্রবেশদ্বার, ৪৪৮০ ও ২২৪০ কেজি ভাত রান্না করবার বিরাট দুই পাত্র ইত্যাদি তো আছেই, কিন্তু এখানে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হল মানুষের ঢল। সর্ব ধর্ম বর্ণ ভাষার মানুষ দলে দলে এসে যে মিলনমেলা তৈরি করছেন প্রতিদিন তা সত্যিই অতুলনীয়। সেই মেলায় অংশ নিয়ে ধুপ-ফুলের গন্ধে সুরভিত হয়ে চলে আসি তারাগড় ফোর্টে। আজমেরের তারাগড় ফোর্টের কথা অনেকেই জানেন না। ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যের অসামান্য নিদর্শন এই ফোর্টটি। এখানেই দেখা মেলে মাত্র আড়াই দিনে তৈরি হওয়া বিখ্যাত আড়াই-দিন -কা-দরওয়াজা। আরাবল্লি পর্বতের নাগপাহাড়ি রেঞ্জের এই ফোর্টে রয়েছে একদা গভর্ণর মিরন সাহেবের দরগাও। 

আজমেরে আমার আরও দুটো দ্রষ্টব্য ছিল। প্রথমটি অতি পরিচিত আনা সাগর লেক। কৃত্রিম এই লেক সে আমলে শহরের জলকষ্ট মেটাত। এখন পর্যটকদের খুব প্রিয় জায়গায় পরিণত হয়েছে এটি। সকাল সন্ধ্যা গমগমে থাকে লেকের চারদিক। লেকের বরাদরি প্যাভিলিয়নটি আলাদা মাত্রা পেয়েছে স্বয়ং শাজাহানের তৈরি বলে। দ্বিতীয়টি ছিল মেয়ো কলেজ। ভারতের অতি বিখ্যাত এই কলেজের ভেতরে ঢুকতে পারলাম না ঠিকই, কিন্তু বাইরে থেকে দেখেও শান্তি পাওয়া গেল। একটা তথ্য একটু উল্লেখ করতে চাই। এই কলেজে ভর্তি হতে গেলে দুরন্ত রেজাল্ট ও এডমিশন টেস্টের পাশাপাশি লাগবে পকেটের রেঁস্ত। কেননা এখানে এককালীন সিকিউরিটি মানি লাগে চার লক্ষ পাঁচ হাজার টাকা (সর্বশেষ খবর অনুযায়ী)। আনুষঙ্গিক ফি লাখ দুয়েকের ওপরে। 

দিগম্বর জৈনদের নাসিয়ান টেম্পল দেখে চললাম পুষ্করে। ভারতের একমাত্র ব্রহ্মা মন্দিরের জন্য পরিচিত পুষ্কর। যদিও উরস উৎসবের জন্যও তার খ্যাতি রয়েছে। রয়েছে আত্মতেশ্বর মহাদেব মন্দির, বরাহ মন্দির, মান মন্দিরও। সরস্বতী মন্দিরটিও অনবদ্য। আর পাহাড় ঘেরা ৫২ ঘাটের পুষ্কর লেকের কথা কে না জানে! হিন্দু পূরণের পাঁচ সরোবরের অন্যতম এই লেকটি ব্রহ্মার হাত থেকে পদ্ম পড়ে গিয়ে তৈরি হয়। এমনই বিশ্বাস হিন্দুদের। কার্তিক পূর্ণিমাতে এই সরোবরে স্নান যে পুণ্য দান করে তা কয়েক হাজার বছরের তপস্যায় মেলে। নাগকুন্ড ঘাটে স্নানে মেলে উর্বরতা, রূপতীর্থে পাওয়া যায় সৌন্দর্য, কপিলব্যাপীতে হয় কুষ্ঠ রোগ নিরাময়। টুক করে স্নান করে নিলাম পুষ্করে। না কোনও পুণ্য লাভের জন্য নয়। শুকনো গরমে জেরবার অবস্থা। সঙ্গে বেড়ানোর ক্লান্তি। স্নান মাত্রই নিমেষেই উধাও সব। ঝকঝকে হয়ে গেল মন প্রাণ দুইই।   













গড়ের রাজ্য রাজস্থান। এখানকার বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গড় বা ফোর্ট `এক সে বড় কর এক`। কিন্তু চিতোরগড়? না তাকে টেক্কা দিতে কেউ পারেনি। আয়তনে, ইতিহাসে, ঐতিহ্যে এর তুল্য কেউ আছে কি? না, আমি অন্তত পাইনি। ইতিহাসের কথাই ধরা যাক। এই ফোর্টের সঙ্গে জড়িয়ে উদয় সিং, রানা প্রতাপ, ধাত্রী পান্না, রানি পদ্মিনী, আলাউদ্দিন খিলজির নাম। বর্ণময় চরিত্র প্রত্যেকেই। আয়তনের কথা যদি ধরি তবে পাচ্ছি ২৪০ হেক্টর জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে ফোর্টটি। উচ্চতা ১৮০ মিটার। সারা ফোর্টে রয়েছে দেখবার মতো বহু কিছু। আরাবল্লির এই ফোর্টের গা ঘেঁষে নিচে বয়ে চলেছে গম্ভীরা নদী।

ফোর্টে উঠতে পাড়ি দিতে হল এক কিমি পথ। মূল ফটক রামপোল পার হয়েই নজরে এলো ১৫৬৮ সালের দুই নায়ক জয়মল ও কেল্লার ছত্তিশ। এরপর দেখা মিলল প্রধান ফটক সূরজপোলের। ১৩০৩ সালে রানি পদ্মিনীর রূপে পাগল হয়ে আলাউদ্দিন খিলজি ফোর্ট আক্রমণ করেন। আবার ১৫৩৫ সালে গুজরাট রাজ্ বাহাদুর শাহ ফোর্টে ধ্বংস করেছিলেন। সম্ভ্রম বাঁচাতে সেই সময় বত্রিশ হাজার রাজপূত রমণী জহরব্রতে প্রাণ বিসর্জন দেন। ১৫৬৮ সালে আকবর দখল নেন ফোর্টের। তবে রাজপুত সখ্যের প্রমান হিসেবে জাহাঙ্গির ফিরিয়ে দেন চিতোর।

১৫৭ সিঁড়ির ৯ তলা বিজয়স্তম্ভ দিয়ে শুরু হল ফোর্ট দেখা। এই স্তম্ভ নির্মাণ করেছিলেন মহরানা কুম্ভ। কাছেই মহাসতী বা রানাদের শবদাহের স্থান। একটু নিচে গোমুখ জলাধার। গরুর মুখের আকারের উৎস থেকে এখানে জল আসছে। রানা কুম্ভের রত্নসিং প্যালেস চোখ ধাঁধিয়ে দিল বিত্ত ও বৈভবে। মোহিত হলাম কুম্ভশ্যাম মন্দিরটি দেখে। ভোজরাজের স্ত্রী মীরাবাঈ এই মন্দিরে বসেই গাইতেন।

লোটাস পুলের পাশে পদ্মিনী মহলে ঢুকে মন খারাপ হল। রতন সিংয়ের সুন্দরী পত্নী বিধর্মীদের হাত থেকে বাঁচতে এখানেই নাকি প্রাণ দিয়েছিলেন। চিরন্তন প্রেমের সেই কাহিনী আজও পল্লবিত হয় গাইডের গলায় আর পর্যটকের কল্পনায়। যদিও অনেকেই বলেন, কাহিনীটি মন গড়া। তবে কালিকা মাতা মন্দিরে আজ দেবী কালী পূজিতা হলেও মন্দিরটি প্রথমে ছিল সূর্য মন্দির। মন্দির গাত্রের সূর্যমূর্তি সহ নানা পৌরাণিক কাহিনী সেই কথাই বলে।

জৈন গুরু আদিনাথকে উৎসর্গ করা কীর্তি স্তম্ভটি চিতোরের স্থাপত্যের এক অসামান্য নিদর্শন। ফেলনা নয় গুজরাটের চালুক্য রাজ্যের চিত্র ভ্রমণের স্মারক শিলালিপি, বাবরের কামান, পাট্টা প্রাসাদ ইত্যাদিও। আর রাতের লাইট এন্ড সাউন্ড দেখে নিতে পারলে তো কোনও প্রশ্নই নেই। রাজস্থানের সমৃদ্ধ ইতিহাস এত সুন্দরভাবে বিবৃত হয়েছে সেখানে যা ভারতবাসী হিসেবে নিজেকে গর্বিত করে।

চিতোরগড়ের ভগ্ন পাথরের ওপর বসে থাকি। সূর্য পশ্চিমে নামছে। এদিকে সন্ধে নামে অনেকটা পরে। আমাদের ওদিকে এখন অন্ধকার। কী অদ্ভুত এই পৃথিবী আর তার পরিক্রমণ। একদিকে আলো, একদিকে অন্ধকার। আলোয় আলোকিত হয়ে থাকা কোনও এক সময়ের চিতোর আজ অন্ধকারে ডুবে আছে। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অতীত ইতিহাস আর শৌর্য-বীর্যের কত গল্প। কিন্তু নির্মম পরিক্রমণ আজ অন্ধকারে ঢেকে দিয়েছে চিতোরকে। আলো কি আসবে আবার তার জীবনে? নাকি ইতিহাসের ফিসফিস কথা নিয়ে সে অপেক্ষায় রইবে আমার মতো অকিঞ্চিৎকর সাধারণের!

















অবশেষে প্রাচ্যের ভেনিসে। নাকি সিটি অফ লেকস বলব? কিংবা সূর্যোদয়ের শহর?
নামে কী এসে যায়!
উদয়পুরে যে পৌঁছেছে সে যদি একটিবারও `আহা` না বলে, তবে বুঝতে হবে তার মতো বেরসিক আর নেই।

পিছোলা লেকের ধরে বসে এমনটাই মনে হচ্ছিল। মনে মনে ধন্যবাদ দিচ্ছিলাম সেই পরম পুরুষকে যাঁর আদেশে মহরানা উদয় সিং চিতোর থেকে রাজধানী স্থানানতরিত করেছিলেন এখানে। আরাবল্লি, অরণ্য আর লেকের শহর উদয়পুরের ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে পরাক্রান্ত মুঘলরাও এখানে আক্রমণ শানাতে পারেনি। ১৫৭৬ এর হলদিঘাটের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সহ বিভিন্ন উত্থান-পতন উদয়পুরকে স্পর্শ করতে পারেনি।

গোটা উদয়পুরটিই ইতিহাস। কিন্তু অমোঘ আকর্ষণ সিটি প্যালেস। মহারানা উদয় সিংয়ের হাতে পত্তন হলেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রানারা প্যালেসটিকে অত্যন্ত আকর্ষক করে তুলেছেন। এই মুহূর্তে ১১টি মহল রয়েছে এখানে। রয়েছে লাইট আইন সাউন্ডের ব্যবস্থাও। কী নেই প্যালেসে? মিনিয়েচার পেন্টিং, হাওদা, পালকি, ঘোড়ার গাড়ি, টালির অলংকরণ, পাঁচ হাজার কাঁচের টুকরোয় নির্মিত ময়ূরের প্রতিকৃতি, কাঁচ ও পোর্সেলিনের নানা মূর্তির পাশাপাশি শিশ মহল, দিলখুশ মহল, মানক মহল, মোতি মহল, বড়ি মহল দেখে স্তম্ভিত হতে হয়! গ্রানাইট পাথরের এই প্যালেস সত্যি বলতে এক অসামান্য কবির শ্রেষ্ঠ কবিতা।

লেক প্যালেসে যাওয়ার ক্ষমতা হল না। সেটি এখন তারকা হোটেল। তবে বংশীঘাট থেকে বোটে চারপাশ ঘুরে আসা গেল। তবে লেক প্যালেসের সৌন্দর্য পূর্ণিমা রাতে। জলের ওপর থাকা সাদা রঙের এই প্রাসাদকে দূর থেকে দেখে মনে হয় অপার্থিব এক সৃষ্টি। ফতে প্রকাশ প্যালেসও আজ হোটেলে পরিণত। পিছোলা লেকের মাঝে ছোট্ট দ্বীপে থাকা বেলেপাথরের জগমন্দির দেখে নেওয়া ভাল। এই দ্বীপেই পিতা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে শাজাহান আশ্রয় নিয়েছিলেন। আইল্যান্ড হোটেল নাম পরিচিতি পেলেও এখানকার কাঁচের কারুকাজ অত্যন্ত বিখ্যাত। শহরের উপকণ্ঠে সজ্জন শিং নির্মিত ২২৬৮ উচ্চতায় সজ্জনগড় প্যালেস থেকে চারদিকের দৃশ্য নয়নমনোহর।

পিছোলা লেক থেকে উদয়পুর দেখাটা স্মরণীয় হয়ে রইল। লেক ধরেই চলে যাওয়া হল ফোটে সাগর আর নেহেরু লেকে। মাঝে মাঝে দ্বীপ, পাহাড় সব মিলে অভিজ্ঞতা হল অনন্য। মহরানা প্রতাপ ও তাঁর ঘোড়া বহিতকের বিরত স্ট্যাচু, সহেলিয় কি হাভেলি, শিল্পগ্রাম ইত্যাদি ছিল উদয়পুর ভ্রমণের উপরি পাওনা। ভেনিস কোনও দিন যেতে পারব কিনা জানি না। কিন্তু উদয়পুর যা দিল তা কোনও অংশে ভেনিসের চাইতে কম নয় বলেই মনে হল। সুপ্ত একটা ইচ্ছেও জাগল। যদি এখানেই হতো আমার বাড়ি তবে খুব বদলে যেত কি দুনিয়া!




মন্দির ঠিক কত দেখেছি? সংখ্যা অবশ্যই বলতে পারব না। কিন্তু বহু মন্দির মনে আছে তাদের সৌন্দর্যের জন্য।
কিন্তু এরকম সৌন্দর্য? না। দেখিনি। বলতে দ্বিধা নেই আর দেখবও না। কেননা শ্বেত পাথরে নির্মিত দিলওয়াড়ার মতো মন্দির বহু-ভারতে আর দ্বিতীয়টি নেই। কারুকাজ, অলংকরণ, ভাস্কর্যে এই মন্দির সাদা মার্বেলের এক পরম বিস্ময়।

সত্যি বলতে মাউন্ট আবুতে এসেছি এই মন্দিরটিই দেখতে। তা না হলে, আরাবল্লির ১২১৯ মি উচ্চতার মাউন্ট আবু খুব কিছু আকর্ষণীয় বলে মনে হয়নি। যদিও পাহাড়ি পথে পাখির ডাক আর নির্জনতাকে সঙ্গী করে লং ড্রাইভ মন্দ লাগে না। যেমন লাগত না সেই আমলের রাজাদের। তাদের গ্রীষ্মাবাস ছিল এটি। কিন্তু ওই যে বললাম দিলওয়াড়া। অতুলনীয় এর সৌন্দর্য। অতুলনীয় এর রূপ। আদিনাথ, নেমিনাথ, মহাবীর, ঋষভদেব ও পার্শ্বনাথ- মোট পাঁচ মন্দিরের সমাহার এখানে। আদিনাথের অষ্টভূজাকার গম্বুজ, ৪৮ পিলারের অলিন্দ, ৫২ দেবকুঠুরি, কারভিং আর খিলান যে কী বিস্ময় সেটা না দেখলে বোঝা যায় না। ঋষভদেব মনিরের পঞ্চধাতুর মূর্তির, মহাবীরের অসমাপ্ত কাজ এক বিস্ময়। শ্বেত পাথরের ঝালর, স্তম্ভ, পদ্ম, তোরণ ইত্যাদিতে সেজে উঠেছে তেজপাল নামের অনন্য মন্দিরটি। কিছু তথ্য দেওয়া জরুরি। আদিনাথ মন্দির তৈরিতে ছিলেন ১৫০০ শিল্পী ও ১২০০ শ্রমিক। সময় লেগেছিল ১৪ বছর। সোলাঙ্কিরাজ ভীমদেবের মন্ত্রী বিমল শাহ এই মন্দিরের জন্য খরচ করেছিলেন ১৮ কোটি ৫৩ লক্ষ টাকা। সময়টা ছিল ১০৩১ সাল। নেমিনাথ তৈরি হয় ১২৩১ সালে। খরচ ১২ কোটি ৫৩ লক্ষ টাকা। দিয়েছিলেন দুই বণিক ভাই বাস্তুপাল ও ক্ষেত্রপাল। আজকের দিনে সেই টাকা কতটা হতে পারে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। ভাবতেই পারি না। কিন্তু এটুকু বুঝেছি যে, তাঁদের সেই দান বৃথা যায়নি। যে সৃষ্টিতে তাঁরা সাহায্য করেছিলেন সেটি তো অক্ষয় অমর হয়েইছে, সঙ্গে তাঁরাও ইতিহাসে ঢুকে গেছেন। কিন্তু এসবের চাইতেও বড় কথা সৃষ্টির প্রথম দিন দিলওয়াড়া যে শিহরণ জাগিয়ে তুলেছিল সেদিনের দর্শকদের মনে ও প্রাণে, সেই একই শিহরণ আজও খেলে যায় দিলওয়াড়া দর্শনার্থীদের।

মাউন্ট আবুর নাক্কি লেক কৃত্রিম হলেও পাহাড়ঘেরা পরিবেশে অন্যরকম লাগে। লেকে ব্যাঙের আকারের টোড রক বেশ দর্শনীয়। কিছুটা ওপরে গুরুশিখরের মাথায় মন্দিরটিও দেখে নেওয়া গেল। ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর এখানে পূজিত হচ্ছেন। রয়েছে গুরু দত্তাত্রেয়র পায়ের ছাপ। কাছেই বিখ্যাত অচলাগড় কেল্লা দেখে মন খারাপ হল। ভোগেন দোষ তার। মান সিংয়ের সমাধি, ওচলেশ্বর শিব মন্দির, দশাবতার বিষ্ণু মোদির, মন্দাকিনী কুন্ডও রয়েছে এই অঞ্চলে।

কোডরা ড্যামের পথে অধরাদেবী দেবী মন্দিরে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে দেবী দুর্গার দর্শন সেরে ব্রহ্মাকুমারী স্পিরিচুয়াল ইউনিভার্সিটির ওঁম শান্তি ভবনও দেখা গেল। মধুবন নামে এই অঞ্চলটি পরিচিত। পিলারহীন কক্ষে ৩৫০০ জনের বসবার ব্যবস্থা স্পিরিচুয়াল ইউনিভার্সিটির বিশেষত্ব। বাকি যার যার বিশ্বাস তার কাছে।

মাউন্ট আবু আর একটি উপহার দিয়েছিল। সেটি হল সূর্যাস্ত। শহর থেকে তিন কিমি দূরের সানসেট পয়েন্ট থেকে সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখে নবকুমারের মতোই বলতে ইচ্ছে হল, `জন্ম-জন্মান্তরেও ভুলিব না`।

















রাজস্থানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর যোধপুরে পৌঁছেই প্রথমে নজর পড়ল গোদাগিরি পাহাড়ের ওপর ১২১মি উচ্চতায় ৯.৫ কিমি দীর্ঘের মেহেরনগড় ফোর্ট। রাজস্থানের সবচেয়ে সুরক্ষিত ফোর্ট বলে পরিচিত মেহেরনগড়ের টানে কে আসেনি? শের শাহ থেকে সেদিনের ইংরেজ-মারাঠা সবাই চেষ্টা করেছে এর দখল নিতে। বারবার রক্তাক্ত হয়েছে ফোর্ট। ফোর্টের সাত নম্বর গেট লোহা পোলে এখনও দেখা যায় ১৫জন সতীর হাতের ছাপ যাঁরা ১৮৪৩ সালে মহারাজা মান সিংয়ের চিতায় আত্মাহুতি দেন। রয়েছে আরও ছয়টি গেট। অতীতে ছিল ১০১টি বুরুজ। সিঙ্গার চক পেরিয়ে মিউজিয়াম দেখে চোখ যারা হয়ে গেল। করোনেশন থ্রোন, ৮০ কেজি সোনায় অলংকৃত ফুল মহল, সাড়ে সতেরো কেজি ওজনের তালা, অস্ত্রসম্ভার, একের পর এক কামান এবং আরও বহু বহু কিছু। কেল্লার ওপর থেকে ব্লু সিটি যোধপুরের দৃশ্যও দুর্দান্ত। এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা হয়ে রইল এই ফোর্ট দর্শন।

কেল্লার ঠিক নিচে যশোবন্ত থাডা। এটি নির্মাণ করেন যশোবন্ত সিংয়ের বিধবা পত্নী। ১৮৯৯ সালে। অত্যন্ত সুন্দর এই স্মারকটিতে মার্বেলের জাফরী আর সূর্যের আলো প্রবেশের বৈজ্ঞানিক প্রথা বিস্মিত করে।

প্রাসাদের রাজ্য রাজস্থানের যোধপুরেও কিন্তু রয়েছে উমেদ ভবন প্যালেস। ১৯২৯ থেকে ১৯৪২ সময়কাল জুড়ে নির্মিত হয়েছিল প্রাসাদটি। এইচ ভি ল্যানচেস্টার এবং জে আর লজের পরিকল্পনায় প্রাসাদ নির্মাণ করেন মহারাজা উমেদ সিং। পোল্যান্ডের শিল্পী জুলিয়াস স্টিফান নর্বোলিন ছিলেন এর অলংকরণে। ৩৪৭ ঘরের এই প্রাসাদের এক অংশে এখনও রয়েছেন রাজপরিবারের লোকেরা। অন্য অংশ উন্মুক্ত সাধারণের জন্য। যথারীতি এই প্রাসাদেও বিট ও বৈভব প্রদর্শিত হয়েছে নানা ভাবে। কাছেই রয়েছে ব্যক্তিগত রেলওয়ে ক্যারেজ। সর্দার জাদুঘর, চিড়িয়াখানা ইত্যাদিও রয়েছে যোধপুরে। বালসামন্দ লেক, সামার প্যালেস শহর থেকে সামান্য দূরে। তবে দুর্দান্ত লাগল পরিহার রাজপুতদের রাজধানী মান্ডরে যোধপুর শাসকদের সমাধিগুলি। এদের আকর্ষণ অন্যরকম।

১৮৫৯ সালে রাজপুত প্রধান রাও মালদেও যোধার হাতে যোধপুর প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে ভারতীয় পুরাণেও এই শহরের উল্লেখ আছে। মরুভূমির আঁচ বোঝা যায় এখন থেকেই। অনেকটা পশ্চিমে চলে এসেছি আমরা। ফলে দিন রাতের পার্থক্য বেশ বুঝতে পারছি। সকাল সাতটায় যখন আকাশে সূর্যোদয়ের লাল আভা আর পুরো শহর নিঝুম তখন মনে হচ্ছিল কত দূরে রয়েছি যেন। প্রকৃতি পুরো বদলে গেছে। বিরাট পাগড়ি আর মজবুত গোঁফের মানুষজন, উট টানা গাড়ি, বাজরার শক্ত রুটি ইত্যাদি মিলে এ সত্যিই অন্য দেশ। এখানে যেন প্রাণের চেয়ে মৃত্যুর স্পর্শ বেশি। মৃতেদের অধিকৃত এলাকা। মার ওয়াড়। Land of Deads.......




যোধপুর থেকে জয়সলমির পথ আমার জীবনের সেরা যাত্রাগুলির অন্যতম। প্রকৃতির এই রূপ কখনও কল্পনাও করিনি। গুজরাটের কিছু অংশের সঙ্গে সামান্য মিল পাচ্ছিলাম ঠিকই। কিন্তু ওটুকুই। কোনও তুলনাতেই আসে না সেটা। মাঝে মাঝেই চোখে পড়ছিল বালিয়াড়ি। টিলার মতো। আমরা যে সত্যিই মরুভূমির দেশে এসে গেছি সেটা বুঝতে অসুবিধে হচ্ছিল না। পোখরান আসতেই গা শিরশির করে উঠল। কেন সেটি অনেকেই বুঝবেন। এখানেই ভারত পরীক্ষামূলকভাবে আণবিক বোমা ফাটিয়েছিল। প্রকৃতি আরও অদ্ভুত হয়ে উঠেছে। ছোট ছোট গাছ। কাঁটাওয়ালা। মাইলের পর মাইল ধু ধু বালি। কড়া সূর্য। আর অদ্ভুত নীল আকাশ।

জয়সলমিরে যখন পৌঁছলাম তখন ছয়টা। রীতিমতো বিকেল। আলো ঝকঝক করছে। কে বলবে আমাদের ওদিকে এখন শঙ্খ বাজছে আর সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বলছে। সারাদিনের ক্লান্তিতে সেদিনের মতো আর কোথাও না। শুধু আশেপাশে সামান্য চক্কর আর একটু শহরটা দেখা। অবাক লাগল সারা শহরটাই হলুদ। সেটা ক্রমে নিভে আসা দিনের আলো আর হলুদ বেলেপাথরের জন্য।

সকালে উঠেই ত্রিকূট পাহাড়ের ওপর জয়সলমির ফোর্টে হাজির হলাম। চিতোরের পর রাজস্থানের এই একমাত্র ফোর্ট যেখানে এখনও নগরজীবন চালু। হলুদ বেলেপাথরের এই ফোর্ট কিন্তু আমাদের বাঙালিদের অত্যন্ত পরিচিত। সত্যজিৎ রায় এই ফোর্টকে অমর করে গেছেন তাঁর `সোনার কেল্লা` বই ও ছায়াছবিতে। এখন চাক্ষুস দেখে মনে হল জীবন ধন্য। অক্ষয় পোল, গণেশ পোল, সূরজ পোল ইত্যাদি নানা গেট পার করে ফোর্টের মূল অংশ। সিটি প্যালেস, জুনা মহল, রং মহল, সর্বোত্তমবিলাস, গজবিলাস, মতিমহল, বাদলবিলাস ইত্যাদি নানা ভাব্যে ভাগ করা হয়েছে ফোর্টটিকে। নীল টালি ও কাঁচের অনবদ্য মোজাইক, নারায়ণ ও শক্তি স্তম্ভ ইত্যাদি নিয়ে ফোর্টটি অসামান্য। রয়েছে আটটি জৈন ও চারটি হিন্দু মন্দির। মন্দিরের মিউজিয়ামে রয়েছে ১১২৬ টি তালপাতার ও ২২৫৭ টি কাগজের পুঁথি। হলুদ পাথরের ওপর এত সুন্দর অলংকরণ ও চিত্রসজ্জিত ফোর্ট আক্ষরিক অর্থেই যেন সোনার কেল্লা।

কিছু হাভেলি দেখলাম এরপর। হলুদ পাথরে সুক্ষ জাফরির কাজ নিয়ে তারা নিজেরা এক একটি বিস্ময়। ভেতরের গোলকধাঁধা আর স্যাঁতসেঁতে ঠান্ডাও মনে রাখবার মতো। পাটোয়ান হাভেলিতে ঢুকলেও সেলিম সিংয়ের হাভেলিতে ঢোকা গেল না। অথচ দুটি হাভেলিই ঝুলন্ত জানালা ও ম্যুরালের অনবদ্য কাজের জন্য বিখ্যাত। গদী সাগর লেক আর ওমর সাগর লেক দুটিও মরুভূমির বুকে মরুদ্যান যেন। গদী সাগরে দেখা পাওয়া গেল ফকরল মিউজিয়াম আর ডেজার্ট কালচারাল সেন্টারের। সত্যি বলতে আমাদের এই শস্য শ্যামলা বঙ্গে বসে কল্পনাই করা যায় না প্রকৃতি কী মারাত্মক রুক্ষ হতে পারে কোথাও কোথাও। তবু এখন নিয়মিত না হলেও বৃষ্টি হয়। মনে আছে ছোটবেলায় ভূগোল বইতে পড়েছিলাম, পর পর আট বছর জয়সলমিরে বৃষ্টি হয়নি।

সোনার কেল্লা, হাভেলি ইত্যাদি বাদে জয়সলমিরের মুখ্য আকর্ষণ মরুভূমি ও বালিয়াড়ি। কিমি চল্লিশ দূরের স্যাম ও খুড়ি সেদিক থেকে অনবদ্য। মরুভূমির অনিন্দ্য রূপ দেখতে হলে এই দুই জায়গার বিকল্প নেই। পর্যটকরা এখানে এসে পাগল হয়ে যান যেন। অনেককে দেখলাম বালিতে শুয়ে বা উটের পিঠে চেপে ছবি তুলছেন। সওয়ারি করছেন। সৌভাগ্য হল মরুভূমিতে সূর্যাস্ত দেখবার। বালির মুহুর্মুহ রং বদল না দেখলে বোঝানো কঠিন। দূরের পত্রহীন কাঁটাগাছের ফাঁক দিয়ে সূর্য যখন সত্যিই ঢলে পড়ল, অখন্ড নীরবতা নেমে এলো মরুভূমির বুকে। কোনও রাত জাগা পাখি নেই, ঝিঁঝিঁর ডাক নেই, শহর বা গ্রামের কোলাহল নেই। এ এক অদ্ভুত নির্জনতা। এর কোনও বিকল্প নেই।

জয়সলমির দর্শন শেষ হল মরুভূমির বুকে তৈরি করা টেন্টে লোকসংগীতের আসরে অংশ নিয়ে। স্থানীয় শিল্পীরা রাজস্থানি নাচ ও গান পরিবেশন করলেন। কিছু পরিচিত গান তাতে ছিল। ব্যক্তিগতভাবে আমি এরকম অনুষ্ঠানের পক্ষে নই। কেননা এই বিষয়টির মধ্যে বড় বেশি কৃত্রিমতা ও ব্যবসা গন্ধ। কিন্তু এই পোড়া দেশের মানুষগুলির নিরন্ন অবস্থার কথা ভেবে বসে রইলাম খানিকক্ষণ। মন খারাপ হল তাদের জন্য। তবু শুনলাম গান। অদ্ভুত সুর। বিষণ্ণ সেই সুর আর গান যেন বলছিল - Our sweetest songs are those that tell of saddest thoughts.....
























- আপনারা মনে হয় বাঙ্গালি
- হ্যাঁ। আপনি তো দিব্যি বাংলা বলেন
- হাঁ হাঁ.....ছিলাম তো বেঙ্গলে বহু দিন.....
- তাই নাকি? কোথায় ছিলেন?
- কলকাতা নোয় দাদা। নর্থ বেঙ্গলে ছিলাম হামি।
- আরে বলুন না।
- ও কোচবিহার জিলা আছে।
- কোচবিহারে? শহরে?
- না কিছুটা যাইতে হয়।
- আরে ধুর বলেন তো।
- দিনহাটা জায়গার নাম।
এবার আর হাসি চেপে রাখতে পারি না। বলে ফেলি আমরাও কোচবিহারের। দেখা গেল কিছু চেনা নাম বেরিয়ে গেল। ভদ্রলোক মহা খুশি। বাড়ি থেকে অনেককে ডেকে আনলেন। চা খাওয়ালেন। বিকানিরে এসে এটা একটা স্মরণীয় ঘটনা হয়ে রইল।

রাজস্থান ভ্রমণে অনেকেই বিকানিরকে ব্রাত্য রাখেন। কিন্তু জয়সলমিরের মতো এটিও মরু শহর। অবশ্য আজকাল সবুজের ছোঁয়া লেগেছে। ভাটি রাজপুত রাও যোধার পুত্র বিকার নাম থেকে শহরের নাম হয়েছে বিকানির। এখানে আমাদের রাত্রিবাস এক হাভেলিতে। এটা রাজেশের পরিকল্পনা। রাজস্থান ভ্রমণের একদম শেষে আমাদেরকে উপহার।

বিকানিরের জুনাগড় ফোর্ট দেখতে উৎসাহীরা ভিড় করেন। ১৫৮৭-৯৩ অবধি এই নির্মাণ করেন রাই সিং। ফোর্টের চারদিকে ৩০ মিটার গভীর পরীক্ষা ফোর্টটিকে আলাদা কিছুটা আলাদা করেছে। সুরজ পোল দিয়ে প্রবেশ। ভেতরে লালনিবাসে সোনার অলংকরণ অবিশ্বাস্য। অনুপ মহলে যায়না দিয়ে সাজানো হয়েছে কাঠের সিলিং। দেওয়ানি খাসে রাখা নানা অস্ত্রসম্ভার। তবে মূল আকর্ষণ দরবার হল। এত সুন্দর খুব কম চোখে পড়ে। অন্যান্য মহলগুলিও মিনিয়েচার পেন্টিং, স্মারক ইত্যাদি দিয়ে সাজানো। ফোর্টের উল্টোদিকেই গঙ্গা গোল্ডেন জুবিলি মিউজিয়ামে দেখা যায় সাদা মার্বেলের সরস্বতী, বিকানিররাজ রাজসিং কে দেওয়া জাহাঙ্গীরের সিল্কের পোশাক সহ অন্যন্য বহু কিছু।

বিকানিরের লালগড় প্রাসাদটিও অনন্য। মহারাজা লাল সিংয়ের স্মৃতিতে তাঁর পুত্র গঙ্গা সিং এটি তৈরি করেছিলেন। জালির কাজ, ঝাড়বাতি, কাঁচের সামগ্রী এই প্যালেসকে সাজিয়ে তুলেছে। লাইব্রেরিতে রয়েছে সংস্কৃত সাহিত্যের বিরাট ভান্ডার। শহরের পশ্চিমে বেলে আর শ্বেত পাথরের সমাধিও অন্যান্য `ছত্তিশ` থেকে যেন কিছুটা আলাদা। সারাদিন ঘুরে সব দেখে হাভেলিতে ছমছমে পরিবেশে রাত কাটিয়ে সকালে উঠে দেখি ঝলমলে রোদে ভেসে যাচ্ছে চারদিক।



১০

ফিরতি পথে ঋষিকে বললাম,
- কি রে, আর তো শরীর খারাপ হল না তোর!
- কাকু, যা দেখলাম তাতে শরীরের কথা মনেই নেই।
- কতদিন কাটল বল তো?
আমার পুত্র আর ঋষি হিসেবে করল,
- একুশ দিন! এত তাড়াতাড়ি চলে গেল?
- নিজেদের চেহারা দেখেছিস? কেমন পুড়ে গেছিস রোদে।
- সে তো তুমিও।
- রাজস্থানের রোদ যে.....
- কিন্তু আবার আসব।
- বলছিস?
- হ্যাঁ। বড় হয়ে। নিজেদের পয়সায়। তবে তোমাকে সঙ্গে নিয়ে। তুমি গাইড যে।

দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলি। গাইড আর হতে পারলাম কোথায়। শুধু দেখেই গেলাম। চিনতে আর পারলাম না!





















ছবি- লেখক


** প্রকাশিত: শব্দ (শারদীয়া ১৪৩১)/ সম্পাদনা: বিপুল আচার্য