বালকের হরিদ্বার
শৌভিক রায়
(মা, জলি গ্রান্ট আর বালক)
ইন্ডিগোর চাকা জলি গ্রান্টের মাটি স্পর্শ করতেই মায়ের কথা বেশি করে মনে পড়ল।
মায়ের জন্যই এসেছি মায়ের কাছে। বাইরে বেরোতেই তাই মায়ের ছোঁওয়া, মনে আর প্রাণে।
জলি গ্রান্টের প্রায় তিন দিকেই পাহাড়। শিবালিক হিমালয়ের (অনেকে গাড়োয়াল হিমালয়ও বলেন) শুরু এখান থেকেই। দেরাদুনের দূরত্ব এখান থেকে ২৭ কিমি। অন্যদিকে কুম্ভ-শহর হরিদ্বার ৩৯ কিমি দূরে। আর নতুন হওয়া রাস্তা ধরে গেলে যোগ-নগরী ঋষিকেশ ২১ কিমি। বহুবার এই জনপদগুলিতে এলেও পুরোনো হয় না এরা কোনোদিন। মায়ের মতোই। মা কি পুরোনো হন কখনও?
প্রিপেড বুথে ট্যাক্সি নিয়ে রওনা দিতে না দিতেই স্বরূপের আর শিবুর ফোন। কপালগুণে এরকম দুই ভাই পেয়েছি। ওদের ভরসাতেই এবারের এই আসা। মায়ের জন্য মায়ের কাছে আসবার সুযোগ করে দিয়েছে ওরাই।
আসলে মা তো সবার। শুধু আমার কেন? স্বামী নির্বাণানন্দজী বলছেন, 'তিনি (মা) ছিলেন পূর্ণাঙ্গতার প্রতীক; অতি কঠোর সাধনা ছিল তাহার কাছে লীলা, যদিও তাঁহার কিছু সাধন করিবার বা কিছু তাহা হইতে অর্জ্জন করিবার কোনও প্রশ্ন ছিল না।...তিনি ছিলেন আনন্দের প্রতিমূৰ্ত্তি, যেখানে থাকিতেন তাঁহার চারিধারে আনন্দ বিকীর্ণ করিতেন।`
এই আনন্দময়ী মায়ের কাছেই এসেছি মায়ের জন্য। হয়ত বা তাঁরই নির্দেশে। পূর্ব-নির্ধারিত বলেই মনে করছি। সেটা না হলে কেন মা ও বাবার প্রথম মৃত্যবার্ষিকীর শ্রদ্ধা ও স্মরণ একসঙ্গে হবে এভাবে? মা চলে গেছেন ২০২০ সালে। এগারো মাসের ব্যবধানে বাবাও একেবারেই নিঃস্ব করলেন আমাদের। মায়ের প্রথম বাৎসরিক করতে পারলাম না তাই। অপেক্ষা করে এবারে একই সঙ্গে বাবা ও মা`কে স্মরণ করা! শ্রদ্ধা জানানো ওঁদের।
ওঁরা নিজেরা ছিলেন ঈর্ষণীয় জুটি। তাই বোধহয় কেউ কাউকে ছেড়ে বেশিদিন থাকলেন না।
তাই বারবার বলছি মায়ের জন্য আসা। এসেছি মায়ের কাছেই।
কনখলের আনন্দময়ী মায়ের ওপর আমার মা-বাবার ছিল অগাধ বিশ্বাস। ওঁদের শোওয়ার ঘরে মাথার ওপর থাকত তাঁর ছবি। রামকৃষ্ণ মিশনে দীক্ষিত হলেও আনন্দময়ী মায়ের বিপুল কর্মকান্ডের জন্য শ্রদ্ধাবনত ছিলেন আমার বাবা-মা। বারবার ছুটে যেতেন হরিদ্বারের কনখলে তাঁর আশ্রমে।
এসবের জন্য মনে হচ্ছে পূর্ব-নির্ধারিত ছিল বোধহয় এই আসা। তা না হলে স্বরূপের সঙ্গে পরিচয় হবেই বা কেন? শিবুকেও চিনে যাব কেন? আর ওরাই বা হরিদ্বারে থাকবে কেন? আমার অত্যাচার সহ্য করবেই বা কেন?
সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে জলি গ্রান্ট থেকে হরিদ্বারের রাস্তায় এগিয়ে চলেছি। আমার ধারণা ছিল জলি গ্রান্ট কোনও মানুষের নাম। কিন্তু এই বিষয়ে একটু সন্দেহ রয়েছে। যদিও একটি তথ্য বলছে মিঃ জলি নামে একজন ১৯৭৪ সালে বিমান বন্দরের জমি `গ্রান্ট` হিসেবে দিয়েছিলেন বলে নামটি এরকম, কিন্তু পাল্লা ভারী অন্যদিকে। ১৮১৫ সালে গোর্খাদের পরাজিত করে ব্রিটিশরা আজকের উত্তরাখণ্ডের দখল নিয়ে এই অঞ্চলে ক্যান্টনমেন্ট তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। শুরু হয় গ্রান্ট হিসেবে জমি প্রদান করা। এভাবেই গড়ে ওঠে মারখাম গ্রান্ট, কারবারি গ্রান্ট, আর্কাডিয়া গ্রান্ট ইত্যাদি। এরকমই একটি গ্রান্টের নাম ছিল জিওলি গ্রান্ট, যা কালক্রমে লোকমুখে হয়ে ওঠে জলি গ্রান্ট ।
ফোর-লেনের এই পথে হু হু গাড়ির ভেতরে হাওয়া লুটোপুটি করছে। বন কেটে বসতের সংখ্যা বাড়লেও এখনও চারদিকে অরণ্যের আভাস। রাস্তা উঁচু করে বন্যপ্রাণীদের, বিশেষ করে হাতিদের, জন্য আন্ডারপাস তৈরি করা হয়েছে। একটু দূরেই চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে মহান হিমালয়। দেখা যাচ্ছে মুসৌরি, দেবপ্রয়াগ, কেদারনাথ, বদ্রিনাথের দূরত্ব জানানো পথচিহ্ন। আমরা অবশ্য উল্টোপথে। হরিদ্বারের দিকে।
এবার শুরু হবে রাজাজী স্যাংচুয়ারি। আর তারপরেই চিরদিনের হরিদ্বার.....
(দেবাদিদেবের পদক্ষেপ)
হরিদ্বার। হরি ও হরের পবিত্র মিলনস্থল। সপ্তপুরীর (অযোধ্যা, মথুরা, হরিদ্বার, বারাণসী, কাঞ্চিপুরম, উজ্জ্বয়নী ও দ্বারকা) অন্যতম এই প্রাচীন জনপদ গঙ্গাদ্বার, মোক্ষদ্বার, তপোবনের পাশাপাশি মায়াপুরী নামেও পরিচিত ছিল পৌরাণিক কালে। আরও পিছিয়ে গেলে হরিদ্বারকে দেখতে পাচ্ছি কপিলাস্থান হিসেবে। আবহমানকাল থেকে গঙ্গাতীরের এই শহর আর্যাবর্তের মানুষের হৃদয়ে আর মননে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে।
ভীমগোড়ায় পৌঁছতেই চোখের সামনে সেই পুণ্যপ্রবাহ। আহা.....কতদিন পর পবিত্র স্রোতস্বিনীর কাছে আবার! মাঝে কেটে গেছে দুটি বছর। পতিতপাবনী নদীর বুক দিয়ে চলে গেছে কত জলবিন্দু! চলে গেছেন আমার বাবা, আমার মা। এই দুই বছরেই। তাই হয়ত মা গঙ্গাকে দেখেই হু হু করে উঠল মন। অজান্তেই চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল জল। আগেই বলেছি, সবটাই পূর্ব নির্ধারিত। তাই এক মা`কে হারিয়ে আর এক মায়ের নির্দেশে আসা অন্য মায়ের কাছে।
ভীমগোড়া রোডে মনসা পাহাড়ের পাদদেশে খানিকটা উঁচুতে আমার প্রিয় হোটেল গঙ্গা বেসিন। ঢোকা মাত্রই ললিত হৈ হৈ করে উঠল। আদ্যন্ত গাড়োয়ালি ললিত বড্ড মিষ্টি ছেলে। এই হোটেল থেকে সম্পূর্ণ হর-কি-পৌরি দৃশ্যমান। গঙ্গার ওপারে নতুন হওয়া ব্যস্ত ফোর লেনটিও স্পষ্ট দেখা যায়। ওই পথ একদিকে চলে যাচ্ছে রুরুকি হয়ে দিল্লিতে, উল্টোদিকে গেলে দেরাদুন, ঋষিকেশ ও উত্তরাখণ্ডের অন্যান্য নানা জায়গা।
এমন কিছু পরিশ্রম হয় নি বলে, ঝটপট বেরিয়ে গেলাম হর-কি-পৌরিতে। হোটেল থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্ব। কাজেই কোনও চাপ নেই। নিজের দ্বিতীয় বাড়িতে এসে ঘরে বসে থাকব নাকি! সত্যি বলতে হর-কি-পৌরি থেকে শুরু করে মতি মার্কেটের ভিড়ে হারিয়ে যেতে যেতে বিষ্ণু ঘাট অবধি চক্কর না দেওয়া অবধি কেন জানি মনে হয় না হরিদ্বার এসেছি!
ভীমগোড়ায় বাঁধ দিয়ে
হর-কি-পৌরি পর্যন্ত ৩ কিমি বিস্তৃত প্রবাহের এই অংশটি হরিদ্বারের মূল আকর্ষণ। সত্যিকারের ভারতবর্ষকে জানতে হলে এখানে আসতেই হবে। চব্বিশ ঘন্টা সচল থাকে হর-কি-পৌরি। সারাদিন তো বটেই, কাকভোরে বা গভীর রাতেও চলে `গঙ্গা ডুবকি`। মনে করা হয়, প্রথম খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে রাজা বিক্রামাদিত্য তাঁর ভাই ভার্থহরির স্মৃতিতে নির্মাণ করেন হর-কি-পৌরি। তপস্যা করতে ভার্থহরি এখানেই এসেছিলেন। সমুদ্র মন্থনের সময় যখন গরুড় অমৃতপাত্র নিয়ে আসছিলেন, তখন এখানেই, ব্রহ্ম কুন্ডে, অমৃতের ফোঁটা পড়েছিল। সেই রীতি মেনে বৈশাখ মাসের ১৩ তারিখে আজও চলে পুণ্য স্নান। এখানে গঙ্গা মায়ের মন্দির-সহ অজস্র মন্দির রয়েছে। ঊনবিংশ শতকে তৈরি এই মন্দিরগুলিতে পুণ্যার্থীদের ভিড় লেগেই রয়েছে সবসময়। এখানেই রয়েছে স্বয়ং ভগবান বিষ্ণুর পদচিন্হ। হর-কি-পৌরিকে ঘিরেই বারো বছর পর পর বসে পূর্ণ কুম্ভ। আর ছয় বছর অন্তর অর্ধ কূম্ভ। ঘাটের পরিবর্তন হয় ১৯৩৮ সালে আগ্রার জমিদার হরজ্ঞান সিং কাটারার হাত ধরে।
হর-কি-পৌরির আক্ষরিক অর্থ হর বা মহাদেবের পদক্ষেপ। সমগ্র উত্তরাখন্ডই দেবাদিদেব মহাদেবের মহিমা সমৃদ্ধ। তাই হরিদ্বার বলতে হর-দ্বারও বলা যেতে পারে। তবে হর-কি-পৌরির ব্যাপারটিই আলা দা। ১৯৩৬ সালে নির্মিত বিড়লা টাওয়ার, অজস্র মন্দির আর সন্ধ্যায় গঙ্গা আরতি নিয়ে এক অদ্ভুত ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করে হরিদ্বারের হর-কি-পৌরি। এখানে মিলেমিশে যায় ভারতের সব সন্তানেরা।
হর-কি-পৌরিতে ইতস্তত ঘুরতে ঘুরতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে ক্রমশ। শুরু হয়ে যায় গঙ্গা স্তব। চারদিকে ধীরে ধীরে জ্বলে ওঠে আলো। অনেকেই প্রদীপ ভাসিয়ে দেয় গঙ্গা বুকে। চুপচাপ দেখে যাই। নিজের ইচ্ছে লিখে রাখি এরকমই কোনও অদৃশ্য প্রদীপের স্বল্প আলোয়। ভাসিয়ে দিই জলে। মানস চোখে দেখি সেই প্রদীপ ভেসে চলেছে নিজের মতো। ভাসতে ভাসতে চলে যাচ্ছে আমার মায়ের কাছে, আমার বাবার কাছে। প্রদীপের সেই আলোতে দেখতে পাচ্ছি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পিতা-মাতাকে যাঁরা আমাকে এনেছেন এই পৃথিবীতে, এই গঙ্গাতীরে।
বালক হয়ে যাই আবার। অবরুদ্ধ কান্না বেরিয়ে আসে মুক্তিদায়িনীর প্রবল স্রোতের মতোই.....
(মাঝের একদিন)
যেন কোনও অতল থেকে ভেসে আসছিল সেই শব্দ।
শব্দ যে আসলে ব্রহ্ম সেটা বুঝতে পারছিলাম সেই ব্রাহ্ম মুহূর্তে।
সেই আওয়াজে ঘুম ভেঙে দেখি পূব আকাশে সাজো সাজো রব। দূরের চন্ডী আর নীল পাহাড়ের মাঝে লাল আলোর আভা। আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখির দল। হর-কি-পৌরিতে পুণ্যার্থীদের হালকা ভিড়, স্তব আর প্রণাম। আর সব কিছু ছাড়িয়ে সেই শব্দ তরঙ্গ....
তাড়িয়ে তাড়িয়ে প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করি। ধরে রাখি নিজের কাছে। আসলে জীবনের রসদ এসব। মনটা ভারীও হয়ে যায়। একদিন ঠিক এখানেই আমার মতো কোনও বালক জীবন দেখবে। সেদিন আমি নিজে থাকব না। বিষণ্ণতায় ভ`রে ওঠা মনকে সমে ফিরিয়ে আনি আবার। ভাবি থেকে যাব শব্দবন্ধে, অনুলোম-বিলোমে এই জাগতিক পৃথিবীতে। যদি শব্দকে ধরার কোনও অলৌকিক যন্ত্র বিজ্ঞান আবিষ্কার করে, তবে হয়ত সেদিনের বালক এই বালকের শব্দে জানবে অনুপস্থিত উপস্থিতির কথা!
দিলীপদা জানালেন তিনি বিড়লা ঘাটে আমাদের জন্য অপেক্ষা করবেন। দিলীপদা মানে দিলীপ ভট্টাচার্য। ভাই স্বরূপের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে। চাক্ষুস দেখি নি এখনও। শুধু জেনেছি কৃষি বিভাগের আধিকারিক মানুষটি মাতাজির নির্দেশে চাকরি ছেড়ে দিয়ে সস্ত্রীক হরিদ্বারে চলে এসেছেন। এখানেই মাতাজির আশ্রমে থাকেন। আমাদের মতো মানুষদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন তিনি। হরিদ্বারের বাঙালি সমাজের অনেকেই চেনেন তাঁকে।
বিড়লা ঘাট থেকে দিলীপদা আমাদের নিয়ে গেলেন কনখলে। হরিদ্বারের কোতোয়ালি থেকে কনখলের দূরত্ব ৫কিমি। অতীতে টাঙায় চেপে কনখলে যেতাম বাবা-মায়ের সঙ্গে। তখন তো চারদিক ফাঁকা ফাঁকা। আজকাল অবশ্য কনখলকে আলাদা করে বোঝার উপায় নেই। টাঙাও আর নেই সেভাবে। জায়গা দখল করেছে টোটো। তাতেই দিলীপদা সহ চেপে বসলাম আমি, রীনা আর দাদা।
আমাদের গন্তব্য কনখলের গৌড়ীয় মঠ। আসলে বাবা-মায়ের বাৎসরিক কাজ হরিদ্বারে করব এটুকুই ঠিক ছিল। কিন্তু ঠিক কোথায়, সেটা ভাবি নি। দায়িত্ব ছিল স্বরূপ আর দিলীপদার ওপর। দিলীপদাই ঠিক করছেন গৌড়ীয় মঠে সব কিছু করবেন।
মঠে ঢুকতেই মন প্রসন্ন হয়ে গেল। বাগানের মাঝখান দিয়ে পথ চলে গেছে রাধাগোবিন্দের মন্দিরে। রয়েছে গোশালা। এক পাশে আরণ্যক পরিবেশে গোপেশ্বর মহাদেবের মন্দির ও তার বিরাট চাতাল। হাতের একদম নাগালে বয়ে চলেছে পতিতপাবনীর একটি ধারা যার জল হিমশীতল হলেও অত্যন্ত স্বচ্ছ। পরদিন কাজ। সব ব্যবস্থা করে মঠের মহারাজের অনুমতি নিয়ে বেরিয়ে এলাম সেখান থেকে।
দিলীপদা নিজের কাজে চলে গেলে, পৌঁছলাম মায়ের আশ্রমে। দক্ষ প্রজাপতির মন্দির, দশ অবতার মূর্তি, সতীকুন্ড, মৃত্যুঞ্জয় মন্দির ইত্যাদির পাশাপাশি আনন্দময়ী মায়ের আশ্রম কনখলের অন্যতম দ্রষ্টব্য। মায়ের সমাধি মন্দিরও এখানে। ১৮৯৬ সালের ৩০ এপ্রিল বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার খেওড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করা এই মহিয়সী নারী তাঁর কর্মকান্ডের জন্য সারা ভারতে পরিচিতি পেয়েছিলেন। ব্রহ্মজ্ঞানী এই সাধিকা ১৯৮২ সালে দেহ রাখেন। তাঁর টানে আজও কনখলে তাঁর আশ্রমে দেশবিদেশ থেকে ছুটে আসছেন মানুষ। তাঁর মহিমা বুঝবার জন্য তাঁর আশ্রমে ও সমাধিতে উৎকীর্ণ দুটি ফলকই যথেষ্ট।
মায়ের সমাধিতে প্রণাম সেরে অমরাপুর ঘাট হয়ে নিজেদের ডেরায় ফিরতে না ফিরতে স্বরূপ আর শিবু হাজির। এক যুগের ওপর হরিদ্বারে আছে। দুজনেই রাণীপুরের 'ভেল'-এ কর্মরত। স্বরূপের বাড়ি মেদিনীপুরে। আদ্যন্ত ভদ্র এই ভাইটি `অলীক পাতা` নামে একটি অনলাইন পত্রিকার সম্পাদক। নিজের লেখার হাতটিও সরেস। ওর স্ত্রী দেবশ্রী নামি নৃত্যশিল্পী। শতরূপা একটিই কন্যা ওদের। শিলিগুড়ির শিবু নামকরা কবির পাশাপাশি `হেমন্তলোক` পত্রিকার সম্পাদক। স্ত্রী শিখা আর সৃজা ও অদৃজা নামের দুই মেয়েকে নিয়ে ওদের সুখের সংসার। মৃদুভাষী শিবু একদম মাটির মানুষ। হৈ চৈ করে কেটে গেল কিছুটা সময় ওদের সঙ্গে।
ওরা দুজনেই ঠিক করে দিল গাড়ি। চেপে বসলাম তাতে। গন্তব্য পতঞ্জলি। বাবা রামদেবের এই হাইটেক আশ্রমটি আগেও দেখেছি। তবে আমার দাদা দেখেনি বলে আবারও চলা। একই কমপ্লেক্সে কর্পোরেট ধাঁচে আয়ুর্বেদ কলেজ, হোস্টেল, হাসপাতাল, শপিং কমপ্লেক্স, ফুড কোর্ট, ব্যাঙ্ক আর সুদৃশ্য বাগান না দেখলে বোঝা যায় না, কী বিরাট ব্যাপার হয়েছে এখানে। এসবই পতঞ্জলি ফেজ ওয়ানে। রয়েছে আরও কয়েকটি ফেজ। সব দেখা অবশ্য সম্ভব নয়। খুব একটা ইচ্ছেও নেই কারোরই।
ফেরার পথে সামনে তাকিয়ে দেখি নীল পাহাড়ের ওপরে চন্ডী মন্দিরে আলো জ্বলে উঠছে। মাথা ঘুরিয়ে দেখি বিল্ব পাহাড়ের চূড়োয় মনসা মন্দিরেও আলো। সিঁড়ির পাশাপাশি রোপওয়ে চেপে এই দুই মন্দিরে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও এবার আর যাচ্ছি না। যদিও আগে গেছি বার কয়েক। তাই দূর থেকেই প্রণাম দেবীদের উদ্দেশ্যে সন্ধ্যার আলোতে।
হর-কি-পৌরিতে শুরু হয়ে গেছে সন্ধ্যারতি। দিল্লি-দেরাদুন ফোর লেনে দ্রুত গতিতে ছুটে চলেছে আধুনিক নানা কিসিমের গাড়ি। ভেসে আসছে গঙ্গারতির গান- জয় গঙ্গে মাতা।...। এক অদ্ভুত সহাবস্থান। এক জায়গায় থমকে আছে সাবেক ভারত, আর তার পাশেই ছুটে চলেছে বর্তমান সময়। বড্ড দ্রুত।
এই বৈচিত্র মেলে একমাত্র হরিদ্বারেই।
(অশ্রু মেশে গঙ্গা ধারায়)
ইহৈব তৈর্জিতঃ সর্গো যেষাং সাম্যে স্তিতং মনঃ।
নির্দোষং হি সমং ব্রজ তস্মাদ্ ব্রহ্মণি তে স্থিতাঃ।
ন প্রহৃষ্যেৎ প্রিয়ং প্রাপ্য নোদ্বিজেৎ প্রাপ্য চাপ্রিয়ম্।
স্থিরবুদ্ধিরসংমূঢ়ো ব্রহ্মবিদ্ ব্রহ্মণি স্থিতঃ।
মিছরির মতো দানা দানা হয়ে শব্দগুলি মিশে যাচ্ছিল পঞ্চভূতে। কানে আসছে গঙ্গা-ধারার অবিরাম বয়ে চলার শব্দ। খসে পড়ছে বসন্তের ঝরা পাতা। পাখিদের ডাকে উদ্বেলিত চারদিক। নির্মল বাতাসে মুক্তির আনন্দ। সূর্যের আলো মিঠেকড়া।
গৌড়ীয় মঠের পঞ্চবটিতে দুই ভাই। স্মরণ আর শ্রদ্ধায় মিশে যাচ্ছি পিত ও মাতার সঙ্গে। দিলীপদার উদাত্ত কণ্ঠ মন্ত্রোচ্চারণে ধরে রাখছে প্রতিটি মুহূর্তকে। তাঁর সঙ্গে গলা মেলাচ্ছি আমরা পিতা স্বর্গ পিতা ধর্ম: পিত্য হি পরমং তপ:/ পিতরি প্রীতিমাপন্নে প্রীয়ন্তে সর্বদেবতা। যৎ প্রসাদাৎ জগদৃষ্টং পূর্নকামো যদাশিষা/ প্রতক্ষ দেবতায়ৈ মে তস্যে মাত্রে নমো নম: (পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম, পিতাই শ্রেষ্ট তপস্যা। পিতা সন্তুষ্ট হলে দেবতারাও সন্তুষ্ট হন। যাঁর অনুগ্রহে আমি এ জগৎ দেখতে পেয়েছি, যাঁর আশীর্বাদে আমার কামনা পূর্ন হয়েছে,আমার প্রতক্ষ দেবতা সেই জননী কে বারবার প্রণাম করি।) স্থির চিত্রে রীনা বসে আছে। এগিয়ে দিচ্ছে শ্রদ্ধা ও স্মরণের নানা উপাচার। প্রয়োজনে নিয়ে আসছে পবিত্র গঙ্গার জল। বিষাদ অশ্রু মিশে যাচ্ছে এই মঠের প্রতিটি জায়গায়। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে চির সত্য- মৃত্যু। তবে আজ আর সে কষ্টের নয়, দুঃখের নয়। বরং আজ সে এমন এক প্রবল শক্তি যে মুক্তির চিদানন্দে উদ্ভাসিত করতে পারে যে কোনও স্বত্বাকে, যে কোন প্রাণকে।
দীর্ঘ পূজা ও নানা উপাচার শেষ হয় একসময়। মন শান্ত হয়ে ওঠে। পূজার শুরুতে যে গঙ্গা ধারায় শরীর পবিত্র করেছিলাম তা বোধহয় মনকেও শুদ্ধ করে দিল। কিন্তু আজ আর যেন নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না। এতদিন বয়সে ছোট হয়েও, বড় ভাইয়ের মতো সব দায়িত্ব পালন করেছি। আমি ভাগ্যবান, আমার সাড়ে ছয় বছরের দাদা সবটাই সঁপে দিয়েছিল আমার ওপর। সব সিদ্ধান্ত নিজে নিয়েছি। সব কাজ নিজে করেছি। আজও সেটাই করলাম। কিন্তু এতদিন এসবের চাপে নিজের শোক বা কষ্ট প্রকাশ করবার যে সুযোগ পাই নি, আজ এই তপোবনে, পঞ্চবটিতে, গঙ্গাধারার পাশে, বিষণ্ণ বসন্ত প্রকৃতিকে সাক্ষী রেখে সব অর্গল খুলে দিলাম।
কাঁধে হাত রাখে স্বরূপ আর শিবু। রীনা হাত ধরে। দূরে দাঁড়ানো দাদা অবশ্য জানে আমিই ওর অভিভাবক। দুই ভাই-বৌ আর ভাইঝিদের নরম ব্যবহার, মহারাজের ডাক বাস্তবে ফিরিয়ে আনে আবার। গোবিন্দ জিউয়ের ভোগ দেওয়া হয়েছে। মহারাজ বলেন, `আজ আমার গোবিন্দ হাসছেন। আপনাদের কাজ সুসম্পন্ন না হলে এমনটি হত না। উনিও খুশি।`
পূজা ও কীর্তন শেষে ডাক পড়ে অন্নভোগ নেওয়ার। আমাদের পরম সৌভাগ্য, এদিন মঠে যত যাত্রী আছেন, তাঁরা সকলেই আমাদের এই পুজোর প্রসাদ পাবেন। সাধুবাদ দেন অনেকে। আমি ভাবি, সৌভাগ্য আমার। সৌভাগ্য আমাদের। সেই কোথায় ফালাকাটা আর কোচবিহার। আর কোথায় এত দূরের হরিদ্বার। কিন্তু প্রাজ্ঞজন মাত্রেই জানেন, ভগবান বিষ্ণুর মস্তক রয়েছে বদ্রীনাথে, আর বক্ষ রয়েছে হরিদ্বারে। রয়েছে নানা পবিত্র কুন্ড। সেই পবিত্র ক্ষেত্রে এই স্মরণ আর শ্রদ্ধায় আপ্লুত হয়ে উঠেছি। আবেগ গ্রাস করে নিচ্ছে বারবার।
সকলে বসি প্রসাদ নিতে। মঠের ব্রহ্মচারীদের সঙ্গে পরিবেশন করেন মহারাজ স্বয়ং। আবারও চোখে জল আসে।
(চিল্লা শেষে)
কোতোয়ালির সামনে থেকে স্বরূপের গাড়ি অন্যদিকে বেঁকে গেল। স্বরূপরা তিনজন ছাড়াও ওই গাড়িতে রীনা আর দাদা আছে। পেছনে শিবুর গাড়িতে আমি। শিবু চালক, আমি বহাল তবিয়তে ওর পাশে বসে আছি। দুই মেয়েকে নিয়ে শিখা পেছনে। শিবু বলল,
- দাদা, ফোন করুন তো স্বরুপদাকে....কোথায় চলছে!
আমি ফোন করব কি আর। তার আগেই ওই গাড়ি থেকে দেবশ্রীর ফোন। শিবুকে চাইছে, স্বরূপ কথা বলবে।
দুজনে কী গুপ্তগু হল কে জানে, গাড়ি চলল নীলধারা পেরিয়ে নীল পাহাড়ের দিকে। শুনলাম চিল্লা চলেছি।
হরিদ্বার থেকে ৯ কিমি দূরের চিল্লা ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারি নিজগুণেই বিখ্যাত। গঙ্গার পূর্বতীরের ২৪৯ বর্গকিমির এই বনভূমি ১৯৭৭ থেকে পর্যটকদের আকর্ষণ করে চলেছে। ১৯৮৩ সালে চিল্লা আর মোতিচুরকে জুড়ে সৃষ্টি হয়েছে রাজাজি ন্যাশনাল পার্ক। শিবালিক হিমালয় আর গঙ্গার অপরূপ শোভা এখান থেকে এতটাই সুন্দর যে ফিরতে মন চায় না কিছুতেই। হাতির পাশাপাশি বাঘ, প্যান্থার, নীলগাই, শম্বর, হরিণ, চিতা-সহ প্রায় তিনশো প্রজাতির পশু রয়েছে চিল্লায়। আছে প্রচুর সংখ্যক ময়ূর আর জানা-অজানা অজস্র পাখি। মুন্ডাল, মিথওয়ালী আর খাড়া কে কেন্দ্র দুই থেকে আড়াই ঘন্টার জিপ সাফারিতে চিল্লা বেড়িয়ে নেনে অনেকেই। সকাল বিকেলে হাতির পিঠে চেপে জঙ্গল দেখবার রাজকীয় ব্যবস্থাও রয়েছে এখানে। জঙ্গলে থাকা ওয়াচ টাওয়ার থেকেও দেখা যায় বন্যপ্রাণ। চিল্লার অন্যতম আরও দুই আকর্ষণ হল চিল্লা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, চিল্লা বাঁধ। স্যাংচুয়ারি, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প আর বাঁধ মিলেই চিল্লা টুরিস্ট কমপ্লেক্স। সপ্তাহের সাতদিনই সকাল ৬টা থেকে সন্ধে ৬.৩০ পর্যন্ত খোলা থাকে স্যাংচুয়ারি। আনুমানিক ১৫০ টাকা এন্ট্রি ফি (স্বরূপ আর শিবু একটি পয়সাও খরচ করতে দেয় নি)।
জঙ্গলের বুক চিরে আঁকাবাঁকা রাস্তায় চলতে চলতে ডুয়ার্সের কথা মনে পড়ে যায়। আসলে হিমালয় ও তার পাদদেশের প্রকৃতির চরিত্র কমবেশি সর্বত্রই এক। অরণ্যও তাই। মনে হচ্ছিল নিজের জায়গাতেই আছি। এমনিতেও হরিদ্বারকে দ্বিতীয় বাড়ি বলি সবসময়, আর এবার শিবু ও স্বরূপ যেভাবে ঘিরে আছে তাতে কখনই মনে হচ্ছে না অন্য কোথাও এসেছি। ধীর গতিতে জঙ্গল দেখাতে দেখাতে শিবু গাড়ি চালাচ্ছে। ওর ছোট মেয়ে অদৃজা চলে এসেছে আমার কাছে। এই পথ চলে গেছে লছমনঝোলায়, ঋষিকেশে। যারা অভিজ্ঞ তারা জানেন, হরিদ্বার থেকে ঋষিকেশে সাধারণত যে পথে যেতে হয় সে পথে লছমনঝোলার ওই প্রান্তে অর্থাৎ গঙ্গার পূর্ব প্রান্তে পৌঁছোই আমরা। লছমনঝোলা বা রামঝোলা (এবং অধুনা তৈরি হাওয়া জানকীঝোলা) পার করে পশ্চিমপ্রান্তে আসতে হয়। কিন্তু চিল্লা দিয়ে গেলে ঋষিকেশে গঙ্গার পূর্ব প্রান্তে পৌঁছনো যাবে না। পশ্চিমপ্রান্তেই থাকতে হবে। বেশ খানিকটা যাওয়ার পর আমার মনে হল এই পথে আগেও এসেছি নীলকণ্ঠ শিবমন্দিরে যাওয়ার সময়। দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম এই ক্ষেত্রটি দেখেছি বেশ কয়েক বছর আগে। হিমালয় পর্বতগাত্রে ঘন অরণ্যের মধ্যে অবস্থিত নীলকণ্ঠ শিবমন্দির দেখা এক অন্য অভিজ্ঞতা। এত সুন্দর জায়গা খুব কমই আছে হরিদ্বার ঋষিকেশের কাছে। তবে এই যাত্রায় নীলকণ্ঠ ডাক পাঠান নি। আবার কবে ডাকবেন, জানি না তাও....
ভীষণ ভাল লাগছিল ধীর গতিতে এই অরণ্য ভ্রমণ। বিদ্যুৎ প্রকল্পের ওখানে কোনও অ্যাড ফিল্মের শুটিং চলছিল বলে আরও এগিয়ে যাওয়া হল। পাশে পাশে চলছে বাঁধ। রাস্তা আর ক্যানেলের দুদিকেই ঘন অরণ্য। বিকেল গড়িয়ে এলেও আকাশে সূর্য জ্বলজ্বল করছে। আমরা যে অনেকটা পশ্চিমে চলে এসেছি তা সকাল ও সন্ধ্যা দুই বেলাতেই টের পাওয়া যায়। আলো যেমন ফোটে দেরিতে, তেমনি অন্ধকার নামে অনেকটা পরে। হঠাৎ শিবু গাড়ি থামিয়ে দেয়। হাত তুলে দেখায় জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে একাকী ময়ূর। হিমালয়ের গহনে এত সুন্দর দৃশ্যে মন নেচে ওঠে আনন্দে। ঝটপট ছবি তুলি। আর এক জায়গাতেও শিবুর জন্যই হরিণ দেখবার সৌভাগ্য হয়। ওদিকে দিনের আলো ফুরিয়ে আসে ক্রমশ। চিল্লার অরণ্যের ফাঁকে দেখি অস্তমিত লাল সূর্য। অসামান্য সে দৃশ্য। এর মাঝেও বেশ কিছু পাখি উড়ে আসে। ধরা দেয় ক্যামেরায়। এক অনবদ্য অভিজ্ঞতা নিয়ে শেষ হয় চিল্লা ভ্রমণ।
ফিরতি পথে চন্ডি ঘটে বসি কিছুক্ষণ। বিল্ব পাহাড়ের গায়ে থাকা বাড়ি আর মনসা মন্দিরে আলো ফুটে উঠেছে। আলো দেখা যাচ্ছে নীলধারার ওপাশে হরিদ্বার শহরেও। আমাদের সামনে বিরাট বিপুলা গঙ্গা। প্রায় নিভে আসা আলোয় প্রত্যক্ষ করি এই পুণ্যতোয়া এভাবেই কত সহস্র বছর ধরে লিখে চলেছে অগণিত কত মানুষের কথা! সাক্ষী থাকছে কতই না উত্থান-পতনের! শুনছে কত আর্তজনের বিলাপ। নিজের শরীরে মিশিয়ে নিচ্ছে জাগতিক সব লাঞ্ছনা, অপমান, শোক, বেদনা।
চুপচাপ প্রশ্ন করি,
- নদী তুমি জানো আমি কে?
উত্তর আসে,
- বিরাট এই সৃষ্টির তুমিও একজন ভাগীদার। তুমি থাকবে না একদিন, আমি থাকব। আমি থাকব তোমার কথা বলবার জন্য, আমি থাকব তোমাদের সবার কথা বলবার জন্য.....
`হৃদি ভেসে যায় অলকানন্দা জলে......`
মাধবদার গাড়ি পাঞ্জাবি ধাবায় থামতেই চোখের সামনে অতিকায় শিবালিক হিমালয়!
সকালের ব্যস্ততা সে অর্থে শুরু হয় নি এখনও। আমরা এর মধ্যেই চলে এসেছি ৫৪ কিমি দূরের দেরাদুনে।
আজ আমরা পুরোপুরি টুরিস্ট। আগামীকাল জলি গ্রান্ট-দিল্লি-বাগডোগরা হয়ে আমি আর রীনা ফিরে যাব কোচবিহারে। দাদা দমদমে। তার আগে দেরাদুনের কয়েকটি জায়গা যেতে হবে ঋষিকেশে। সেখানে একটি কাজ রয়েছে।
সেই কোন দ্বাপর যুগে নাকি আচার্য দ্রোণ শিবালিক পর্বতমালা পেরিয়ে উদয়গিরি আর বহিৰ্গিরির মাঝে দেওদার পর্বতের ঢালে দেরা অর্থাৎ অস্ত্রশিক্ষা আশ্রম গড়ে তুলেছিলেন। তারও আগে র্যাম-লক্ষ্মণ নাকি এখানেই রাবণ বোধের প্রায়শ্চিত্ত করেন। যাহোক, অতি প্রাচীন এই জনপদ দ্রোণাশ্রম হয়ে দেরাদুনে পরিণত হয় কালের যাত্রায়। ১৬৭৬ সালে `দুন' (পাহাড়ের পাদদেশে শায়িত সুন্দর ভূমি) উপত্যকায় সপ্তম শিখ গুরু হর রায়ের জ্যেষ্ঠ পুত্র বাবা রাম রায়ের `ডেরা' (ভগবানের ঘর) স্থাপন থেকে `দেরাদুন` নামটি সৃষ্টি হয়েছে।
এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম উপত্যকা দেরাদুনের অর্থ ছবির মতো উপত্যকা। উপত্যকার দক্ষিণ পূর্বে বয়ে চলেছে গঙ্গা আর উত্তর পশ্চিমে যমুনা। অতীতে গাড়োয়ালের অংশ দেরাদুনের হাতবদল হয়েছে বেশ কয়েকবার। একসময় গোর্খারাও দখল করেছিল এই সুন্দর জায়গাটি। এলাকার দখল নিয়ে লড়াই লেগেই থাকত। পরে ব্রিটিশদের অধীনে আসে দেরাদুন। আর স্বাধীনতার অনেক বছর পরে, ২০০০ সালে, ভারতের ২৭তম রাজ্য উত্তরাখণ্ডের রাজধানীর মর্যাদা পায় কাঠমান্ডু ও শ্রীনগরের পর আয়তনের দিক থেকে হিমালয়ের তৃতীয় বৃহত্তম ছিমছাম এই শহরটি।
আগেও দেরাদুন গেছি বলে এবার বেছে নিয়েছিলাম মাত্র কয়েকটি জায়গা। ঋষিকেশে ঢুকতে হবে সে চিন্তাও ছিল। তাই প্রথমেই হানা দিলাম ক্লেমেন্ট টাউনের বুদ্ধ মন্দিরে। এখানে এলে মনে হতেই পারে যে, তিব্বতে পৌঁছে গেছি। ১৯৬৫ সালে কোচেন রিনপোচে নির্মিত এই বুদ্ধ মন্দিরটি মাইন্ড রোলিং মনাস্ট্রি নামেও পরিচিত। মন্দিরের উচ্চতা ২২০ ফিট আর বুদ্ধ মূর্তিটি পাঁচতলার সমান। তবে সবচেয়ে ভাল লাগে ওই উঁচু থেকে দুন উপত্যকার দৃশ্য দেখতে। বুদ্ধ মন্দির লাগোয়া ঝকঝকে বিদ্যালয় দেখে মন ভরে গেল। কিন্তু করোনা বিধিনিষেধের জন্য সেখানে প্রবেশ নিষিদ্ধ বলে চলে এলাম বিখ্যাত ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটে। ২০০০ একর জমিতে তৈরি অতীতের ইম্পিরিয়াল ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট ব্রিটিশদের সৃষ্ট এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার। ১৯০৬ সালে এই ইনস্টিটিউট তৈরি হলেও মূল ভবনটি নির্মিত হয় ১৯২৯ সালে। সি জি ব্লমফিল্ড গ্রিকো-রোমান শৈলীতে যে ভবন সৃষ্টি করেছেন তা আজ হেরিটেজের মর্যাদা পেয়েছে এবং এটি দেখে মনে হয় যে, ব্রিটিশরা এই দেশ থেকে শুধু নেয় নি, দিয়েছেও অনেক। বোটানিক্যাল গার্ডেন, মিউজিয়াম ইত্যাদি সব মিলে এই প্রতিষ্ঠানটিকে ঠিকঠাক জানতে হলে কয়েকদিন লেগে যায়। কিন্তু হাতে সময় নেই। তাই চলে আসি টপকেশ্বর শিব মন্দিরে। বলা হয় এখানকার গুহায় বাস করতেন স্বয়ং দ্রোণাচার্য। অশ্বত্থামারও জন্ম নাকি এখানেই। গুহার ভেতরে স্বয়ম্ভু শিবলিঙ্গের ওপর টপ টপ করে জল পড়ছে অনবরত। রয়েছে দূর্গা মন্দির, বাল্মীকি গুহা। আরও খানিকটা দূরে রবার্স কেভ বা গুচ্ছপানি। টনস নদীর প্রবাহ এখানে লুকিয়ে পড়ছে কখনও, কখনও আবার দৃশ্যমান হচ্ছে গুহার ভেতরে। অতীতে ডাকাতরা এখানেই আশ্রয় নিত। তাই ব্রিটিশরা নাম দেয় রবার্স কেভ। তবে স্থানীয়রা বলেন গুচ্ছপানি।
দেরাদুনে এই চক্কর কাটতে কাটতেই দেখে ফেলেছি মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ি, বিধানসভা, ইন্ডিয়ান মিলিটারি একাডেমির একটা অংশ, বিভিন্ন নামী স্কুল। হাতে সময় কম, তাই সহস্রধারা, তপোবন ইত্যাদি পেছনে ফেলে হিমালয়ের বুকের ঝকঝকে রাস্তায় চলে আসি ঋষিকেশে।
ঋষিকেশকে বলা হয় স্বর্গের তোরণদ্বার। বৈভ্য এখানে কঠোর তপস্যায় বসেছিলেন। আর সেই তপস্যায় তুষ্ট বিষ্ণু তাঁকে এখানে দর্শন দেন। নাম হয় হৃষিকেশ বা ঋষিকেশ। বলা হয়, মহামতি বিদুর এখানে দেহত্যাগ করেছিলেন। গঙ্গা এখানেই সমতল স্পর্শ করছে। যদিও চারদিকে হিমালয় ঘিরে রয়েছে সুন্দরী ঋষিকেশকে।
এবার নিয়ে ঠিক ক`বার এলাম ঋষিকেশে? এখন আর হিসেব করি না। লকডাউনের সামান্য কিছুদিন আগেও এসেছিলাম। খুব একটা পাল্টায় নি শহর। শুধু নতুন আর একটি ব্রিজ হয়েছে। মনে পড়ল সেই প্রথম যখন ঋষিকেশে আসি তখন বয়স পাঁচ/ছয়। লছমনঝোলায় দাদা আর আমাকে দাঁড় করিয়ে আগফা ক্যামেরায় বাবা ছবি তুলেছিলেন। আমার চাইতে সাড়ে ছয় বছরের দাদা আমাকে জড়িয়ে রেখেছিল দুলতে থাকা সেই ব্রিজে। পরে রামঝোলা হয়েছে। আর এবারের সংযোজন জানকিঝোলা। এর আগে ব্রিজটির নির্মাণ চলছিল। ভাবিনি দুই বছরেই সেটি তৈরি হয়ে যাবে।
আমাদের এবারের ঋষিকেশে আসবার কারণ লছমনঝোলা, রামঝোলা, নীলকণ্ঠ শিব ইত্যাদি কিছুই নয়। তবে দাদা মহেশ যোগীর চৌরাশি কুঠি আশ্রমটি দেখতে চেয়েছিল। সেটি মূল উদ্দেশ্য না হলেও হাতে সময় থাকায় আবার ঢুঁ দিলাম রাজাজি স্যাংচুয়ারির ভেতরে থাকা আশ্রমটিতে। বিটলসরা এখানে মহেশ যোগীর ট্রান্সেন্ডেন্টাল মেডিটেশনের টানে একমাস ছিলেন বলে এই আশ্রমটি বিটলস আশ্রম নামেও পরিচিত। আশ্রমটিকে নিয়ে ইতিমধ্যেই উত্তরবঙ্গ সংবাদ সহ দুই চারটি ম্যাগে লিখেছি বলে আর বিস্তৃত বলছি না। মনটা একটু খারাপ হল, আশ্রমের দেখভাল ঠিকঠাক হচ্ছে না বুঝে। তবে নতুন কিছু শিল্পী এসে আরও কিছু ছবি এঁকে গেছেন বুঝতে পারলাম। লেনন ও তাঁর বন্ধুরা একদম প্রান্তে যে ঘরে ছিলেন সেখানে পৌঁছোনর পর স্যাংচুয়ারি বন্ধ হওয়ার ঘোষণা কানে এল। আকাশে তখনও যথেষ্ট আলো থাকলেও, সন্ধে নামতে খুব কিছু দেরি নেই বোঝা যাচ্ছিল। পা চালিয়ে জানকিঝোলার এপাশে এলাম আবার।
এতক্ষণে বোধহয় এবারের হরিদ্বার যাত্রার সবচেয়ে করুণ মুহূর্ত এল....
দিলীপদা গতকাল বলেছিলেন, বাবা-মায়ের ছবি সারা রাত থাকবে আমাদের সঙ্গে। তারপর গঙ্গায় ভাসাতে হবে। ফুল মালা সহ সেই ছবি আজ সারাদিন আমাদের সঙ্গে ছিল। আমরা তিনজন বোধহয় প্রতিটি সময় বাবা-মা`কে অনুভব করছিলাম এভাবেই। গত দুই বছরে মা যেমন সর্বক্ষণ সঙ্গে রয়েছেন, তেমনি বাবাও এক বছর ধরে তাঁর নির্বাক অদৃশ্য উপস্থিতি জানিয়েছেন। গতকালের তর্পণের মাধ্যমে বোধহয় আবার ফিরে পেয়েছিলাম তাঁদের। ওই ছবিই বারবার ওঁদের উপস্থিতি বলে দিচ্ছিল। কানে আসছিল মায়ের গলা, বাবার গুনগুন গান। গৌড়ীয় মঠের তপোবনে গাছের পাতার ঝরে পড়ায়, হাওয়ায় ফুলেদের দুলে ওঠায়, গঙ্গাধারার অবিরাম শব্দে টের পাচ্ছিলাম ওঁদের থাকা।
কিন্তু এবার সত্যিই বিদায় দিতে হবে বাবা-মা`কে। অলক্ষে শুনতে পাচ্ছিলাম ফিসফিস কথা তাই। বুঝতে পারছিলাম জাগতিক সব মায়া কাটিয়ে বাবা-মা এবার চলে যাবেন বিষ্ণুলোকে। মিলবেন পূর্বজদের সঙ্গে আর অপেক্ষা করবেন আমাদের জন্য।
তিনজনে নামি গঙ্গায়। হাতে সেই ছবি আর ফুলমালা। স্রোত ডাকে। ডাকে সময়। সবাই ধরি সেই ছবি। ভাসিয়ে দিই গঙ্গাজলে। চলে যান বাবা মা গঙ্গার স্রোতে, ভেসে যায় ফুলমালা। রীনা কেঁদে ওঠে। দাদা অন্য দিকে তাকিয়ে আমার কাঁধে হাত রাখে। গঙ্গা জলে মুখ ধুই চোখের জল লুকোবার জন্য.... এগিয়ে আসে দুই বালিকা। হাতে প্রদীপ। বলে, 'বাবুজি দিয়া ভি জ্বালাও`.....
জ্বালাই প্রদীপ। ভাসাই গঙ্গায়।
প্রজ্জ্বলিত ক্ষুদ্র আলোক শিখা হঠাৎ যেন প্রবল হয়। আর সেই আলোতে দেখি বনস্পতির ছায়া ঘিরে ধরে আমাদের।
(শেষ)












.jpg)
























