অমৃত মহোৎসব, জাতীয় কন্যা-শিশু দিবস ও উত্তরের কন্যারা
শৌভিক রায়
স্বাধীনতার ৭৫তম বর্ষে `অমৃত মহোৎসব` পালনের ব্যস্ততার মধ্যে, উত্তরবঙ্গে, প্রায় নিঃশব্দে চলে গেল জাতীয় কন্যা-শিশু দিবস।
নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রকের ব্যবস্থাপনায়, ২০০৮ সাল থেকে, ২৪ জানুয়ারি দিনটিকে জাতীয় শিশু-কন্যা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কেননা, ১৯৬৬ সালের ওই দিনই ইন্দিরা গান্ধি দেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। এই বছর এই দিনটির থিম ছিল উজ্জ্বলতর ভবিষ্যতের জন্য কন্যা-শিশুদের আরও শক্তিশালী করে তোলা।
লক্ষণীয়, সারা দেশের সঙ্গে তুলনা করলে উত্তরের কন্যা-শিশুরা আজও নানা ক্ষেত্রে পিছিয়ে। বিভিন্ন বছরে এই দিনটিতে গৃহীত 'সেভ গার্ল চাইল্ড', 'বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও', 'সমগ্র শিক্ষা`ইত্যাদি প্রকল্পগুলির সুফল থেকে এখানকার `বেটি`রা খানিকটা পেলেও, না পাওয়ার পাল্লাটিই ভারী। রাজ্য সরকারের কন্যাশ্রী, সবুজ সাথী, মিড ডে মিল ইত্যাদির জন্য বিদ্যালয়ে মেয়েদের কিছুটা ভিড় বাড়লেও, তাদের সামগ্রিক উন্নতি সেভাবে চোখে পড়ে না। কন্যা ভ্রূণ হত্যা, ধর্ষণ, পণ, শিশু-শ্রম, গৃহ-হিংসা, অ্যাসিড আক্রমণ ইত্যাদি যেমন দূর করা যায় নি, তেমনি কন্যা-শিশু পাচারের হারও কমানো যায় নি। এখনও উত্তরের চা-বলয়ে মেয়েদের বিয়ের গড় বয়স ১৪ বছর এবং বিদ্যালয় ছুটের হার ৬৭ শতাংশ। অন্যদিকে, উত্তরের জনপদগুলিতেও এই হার ক্রমবর্ধমান। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ের পঠন-পাঠন বন্ধ থাকায় অভিভাবকরা কন্যাদের বিয়ে দিয়ে দেওয়াকেই শ্রেয় বলে মনে করছেন। প্রিয় ছাত্রীটির খোঁজ না পেয়ে খবর নিতে যাওয়া শিক্ষক দেখছেন যে, এই দুই বছরের ফাঁকে ছাত্রীটি কবে যেন মা হয়ে গেছে! মনে রাখতে হবে, ইউনিসেফের সমীক্ষা অনুযায়ী বিশ্বের তিনজন বালিকা বধূর মধ্যে একজন ভারতীয়। উত্তরে এই সংখ্যা যে আরও বেশি হবে না, তা কিন্তু জোর গলায় বলা চলে না। এসবের পাশাপাশি বেড়ে চলেছে উত্তরের পুরুষ-নারী বৈষম্য। অথচ সারা দেশে তা ক্রমহ্রাসমান। তাই উত্তরের নারীদের এই অবস্থা নারী কল্যাণ মন্ত্রকের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
ভারতের সংবিধানে আর্টিকেল ১৪, ১৫, ১৬, ১৯, ২১ ও ৩০০-এ ধারায় নারীদের জন্য যে শিক্ষা, সমতা, চাকরির সুযোগ, বাক-স্বাধীনতা, জীবনের সুরক্ষা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সম্পত্তির অধিকার দেওয়া হয়েছে, জাতীয় শিশু কন্যা দিবসে সেগুলি জানা ও উপলব্ধি করাতে দিনটির সার্থকতা। আমাদের ব্যর্থতা এখানেই। এখনও আমাদের দেশে নারীদের শিক্ষার হারের (৬৪%) তুলনায় উত্তরের নারী শিক্ষার হার অনেকটা কম। তাই, এই মুহূর্তে সবচাইতে বেশি প্রয়োজন নারী-শিক্ষার বিস্তার। পাশাপাশি তাদের শরীর দিকেও লক্ষ্য রাখা আশু কর্তব্য। কেননা অপুষ্টি, রক্তাল্পতা, ভিটামিন-এ`র অভাব এবং `হাইজিন` সম্পর্কে অজ্ঞতায় উত্তরের কন্যারা এগিয়ে। চাকরি, বাক-স্বাধীনতা ইত্যাদির কথা তো আরও অনেক পরে!
উত্তরের কন্যারা এই অবস্থা থেকে কবে মুক্তি পাবে তা কেউই জানে না। সঠিক প্রচার, সচেতনতা ও সদিচ্ছা ছাড়া কোনোভাবেই উত্তরের মেয়েদের জাতীয় শিশু-কন্যা দিবসের কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব নয়। এর জন্য এগিয়ে আসতে হবে জনমত নির্বিশেষে সবাইকেই। মনে রাখতে হবে, দেশকে প্রকৃত আলোকিত করতে হলে সর্বাগ্রে দরকার কন্যা-শিশুর সুনিশ্চিত ও উজ্জ্বল ভবিষ্যত।