যে মানুষটির দীর্ঘ ছায়া আমাদের শীতল করেছিল, কালের নিয়মে তা সরে যায় একদিন। থেকে যায় শুধু কিছু অতীত মুহূর্ত।
একটি বছর ঠিক তেমনই। অনন্ত সময়ের বিশালত্বে সামান্য সে খন্ড নিতান্তই তুচ্ছ, কিন্তু কখনও সে এমন ছাপ রাখে, যার তুলনা পাওয়া ভার!
সেরকমই একটি বছর চলে যেতে বসেছে। আসছে নববর্ষ, নবভাবনা, নবজীবন। কিন্তু বিগত বছরটি আমাদের মনে যেভাবে দাগ রেখে গেল তার কথা ভুলতে হয়ত আমরা কোনদিনই পারব না! এত হারানো, এত ব্যথা, এত বেদনা আর কবে হয়েছে কেউ জানে না! অভিজ্ঞতার এই অর্জন আমাদের ভারাক্রান্ত করলেও ঋদ্ধও করেছে, কিন্তু বড় বেশি মূল্য দিতে হয়েছে তার জন্য।
নতুন বছরের সামনে দাঁড়িয়ে তাই অতীত ছায়া বড্ড প্রকট। নতুন সূর্যের উদয়েও যেন সেই ছায়া কথা বলছে। তবে সব শেষেও ওই একই মন্ত্র এগিয়ে চলার, যা বুকে রাখতে হয় সবসময় নিজেদের বেঁচে থাকবার তাগিদেই!
"দহনবেলা শেষে নতুন দিনের ভোরে" হেঁটে যাচ্ছি ইন্দ্র। পিছনে পড়ে আছে মৃত সভ্যতার দগ্ধ ভগ্নাবশেষ। পিছনে পড়ে আছে নারীর খন্ডিত শব। পিছনে পড়ে আছে কবিতার অভুক্ত পুষ্টিহীন সমবেত ক্রন্দনরোল। ভগ্ন মৃৎপাত্রে শ্মশান সংলগ্ন শীর্ণকায়া বিষণ্ণ নদীতে ভেসে যাচ্ছে যাবতীয় কপট বিশ্বাস- প্রতিশ্রুতির স্রোতহীন কলুষিত জল।
মানুষের সন্ধানে, চেতনার সন্ধানে, নিখাদ মুখের সন্ধানে, অকপট সরলরৈখিক পথের সন্ধানে, হেঁটে যাচ্ছি ইন্দ্র। পিচ্ছিল পিছনকে আমি এখন তাচ্ছিল্যে ফেলে রাখি দহনের কেন্দ্রবিন্দুতে। ফুৎকারে ওড়াই সাতরঙা ফানুস। ফুৎকারে ওড়াই সাতরঙা মানুষ।
জঙ্গলমহলের গজরাজদের গল্প
গৌতম চক্রবর্তী
গৌরী আর প্রিয়দর্শিনীর গল্প
গৌরীকে যখন দেখেছিলাম তখন ওর বয়েস মাত্র দেড়বছর। এই দেড়টা বছর মায়ের কোলেই কেটেছিল ওর। কিন্তু প্রকৃতির নিয়মেই খেলাধূলা করে
সময় কাটানোর দিন শেষ হয়ে গেল একসময় তার। আর
সেই কারণেই যেহেতু সে মেয়ে তাই নিয়ম মেনে নামকরণ হয় গৌরী। গৌরীর মায়ের নাম ছিল
প্রিয়দর্শিনী। নিবাস
জলদাপাড়া। প্রিয়দর্শিনীর
তৃতীয় সন্তান গৌরী। গিয়েছিলাম
জলপাইগুড়ি তথা ডুয়ার্সের দেড়শ বছর পূর্তির আলোকে জলপাইগুড়ি জেলার জঙ্গলমহলকে নতুন
করে জানতে। বনদপ্তরের বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে ঘুরে বেড়িয়েছি ডুয়ার্সের অরণ্য,
জঙ্গলমহলে। সেই সুবাদেই জলদাপাড়াতে আসা। এসেই দেখেছিলাম গৌরীকে। বনদপ্তর এর নিয়ম
অনুযায়ী একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সন্তান মায়ের দুধের উপর নির্ভরশীল থাকতে
পারে। যেদিন সে দুধ ছাড়বে সেই দিন তার নতুন
জীবন শুরু হবে, তার নামকরণ হবে, পাঠশালায় ভর্তি হতে হবে। কুনকি হবার পাঠশালা। জলদাপাড়াতেই পেয়েছিলাম প্রিয়দর্শিণী
আর গৌরীকে। জলদাপাড়াতে যে সকল কুনকি হাতিগুলো রয়েছে প্রিয়দর্শিনী তাদের একজন। এর আগেও তার অপর দুই সন্তান পৃথ্বীরাজ
এবং দর্শন নিয়ম মেনে কুনকি হিসাবে বনদপ্তর এর কর্মী। গৌরীকেও সেই চাকরি করতে হবে ভবিষ্যতে। তারই প্রস্তুতি হিসাবে গৌরীকে সেদিন
পাঠানো হচ্ছিল মায়ের কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে তাদের পাঠশালা হলং সেন্ট্রাল
পিলখানায়। ঘটনাচক্রে সেই
দিনটার নীরব সাক্ষী আমি। সেই বিচ্ছেদ পর্বে জলদাপাড়ার দুই কুনকি মীনাক্ষী এবং
মধুমালাকে নিয়ে যাওয়া হয় প্রিয়দর্শিনীর কাছে। তখনো মা এবং মেয়ে একসঙ্গেই ছিল। কুনকি দুটি কাছে যাওয়ার পর মোটা দড়ি দিয়ে বাঁধা হয়
গৌরীকে। তারপর টেনে হিচঁড়ে মায়ের থেকে আলাদা
করা হয় গৌরীকে। মা-মেয়ের
চিৎকারে বনভূমি বিদীর্ণ হয়ে যায়। আধঘণ্টার মধ্যেই গৌরীকে নিয়ে সবার চোখের আড়াল
হয়ে যায় দুই কুনকি। সেখানে উপস্থিত
বনকর্তা, বনকর্মী এবং মাহুত সকলের চোখেই তখন ছিল
জল। আমারো বিষণ্ণ হৃদয়। প্রিয়দর্শিনীর মাহুত রতিলাল ওঁরাও এর
খুব কষ্ট হচ্ছিল ওকে ছাড়তে। জানলাম
ওর মাকে সামলাতে কিছুদিন একটু বেগ পেতে হবে।
কিন্তু বনদপ্তর এর নিয়মের ব্যতিক্রম হওয়ার উপায় নেই। কারণ পড়াশুনা অর্থাৎ ভবিষ্যতে কুনকি হওয়ার পাঠ নেওয়া
শুরু না করলে মুশকিল। প্রিয়দর্শিনীর
আগের দুই সন্তান পৃথ্বীরাজ এবং দর্শন কুনকি হিসাবে বন এবং বন্যপ্রাণী রক্ষার কাজে
নিযুক্ত রয়েছে যে সেটাও সেদিন চাক্ষুষ করেছিলাম। সেদিন প্রিয়দর্শিনীর তৃতীয় সন্তান গৌরীকে নামকরণের পর
পাঠানো হলো পাঠশালায়। গৌরীর প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছিল জলদাপাড়ার হলং
রেঞ্জে। এই প্রশিক্ষণ পর্ব চলবে ১৩ বছর বয়স
পর্যন্ত। তখন গৌরীর
চাকরি হবে কুনকি হিসাবে জঙ্গল পাহারা দেওয়া। ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত চাকরি করার পর অবসর। তখন অবশ্য মিলবে পেনশন।
অবসর নিলেও
মেঘলাল আজও অতিথি বন্যপ্রাণ বিভাগের
পেনশনের কথা যদি বলা যায় তাহলে আর
এক গল্প। নয় এর দশকে গরুমারার জঙ্গলে এসেছিল
মেঘলাল। মূলত বেআইনি পাচার আটকাতে গিয়ে
মেঘলালকে পাওয়া গিয়েছিল। উত্তর
পূর্ব ভারত থেকে গাড়িতে করে এই পুরুষ হাতিটিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। কিন্তু তার বৈধ কাগজ না থাকায় হাতিটিকে
গরুমারার জঙ্গলে আটকে দেওয়া হয়।
তারপর সেখানে কিছুদিন রাখার পর তাকে কুনকি করে তোলার তালিম দেওয়া শুরু হয়। মাত্র এক বছরের মধ্যেই তালিম শেষ করে
কুনকি হয়ে ওঠে মেঘলাল। তারপর থেকেই
দীর্ঘদিন গরুমারার অভিজ্ঞ কুনকির দায়িত্ব পালন করে সে। পিঠে পর্যটককে নিয়ে জঙ্গল ঘোরানোর কাজ থেকে শুরু করে
বন্যাবিধ্বস্ত এলাকায় মানুষকে উদ্ধারের কাজ অথবা লোকালয়ে কোন বন্যপ্রাণী
বেড়িয়ে পড়লে তাকে বাগে আনা সমস্ত ক্ষেত্রেই ডাক পড়তো মেঘলালের। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুর ওপরই
যবনিকা পড়ে যায়। মেঘলাল এর
ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কর্মজীবন শেষ
হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অধিকাংশেরই জীবনে নেমে আসে বিচ্ছেদ। কেননা বহুবছর একসঙ্গে কাজ করার পর অবসর গ্রহণের সঙ্গে
সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে যায়। অনেকেই সেটা
মেনে নিতে পারেন না। অবসর জীবনেও
যদি পুরনো সতীর্থদের সঙ্গে থাকা যায় তাহলে আয়ু অনেকটা যেন বেড়ে যায়। যেমনটা হয়েছিল মেঘলালের। অবসর নিলেও মেঘলাল অনেকদিন অতিথি ছিল বন্যপ্রাণ বিভাগের। ২০১৪
সালে কর্মজীবন থেকে
অবসর নেওয়ার পর অনেকগুলো বছর কেটে গেলেও সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত খাবার যোগাড়
করা, মূর্তি নদীতে স্নান করা থেকে শুরু করে দিনের অধিকাংশ সময় সহকর্মীদের সঙ্গে
কাটিয়েছিল গরুমারার সবচেয়ে বয়স্ক কুনকি মেঘলাল। মানুষের যেমন চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের বয়সের সীমারেখা
বাধা থাকে, তেমনি গরুমারার কুনকি হাতিদেরও কাজের বয়স বাঁধা রয়েছে মানুষের মতো। গরুমারার কুনকি হাতিরাও ৬০ বছর বয়সের
পর কাজ থেকে অবসর নিয়ে নেয়। তখন
তাদের নিজের কাজটুকু ছাড়া আর কোনকিছুই করতে হয় না। আমার সঙ্গে যখন দেখা হয়েছিল মেঘলাল এর বয়স তখন ছিল ৬২ বছর। সরকারি নিয়ম অনুসারে বছর দুয়েক আগেই
অবসর নিয়ে নিয়েছিল সে। তবে সহকর্মীদের
থেকে বিচ্ছেদ হয়নি। কর্মজীবন থেকে
অবসরগ্রহণ করলেও তার নিজের খাবার নিজেকেই সংগ্রহ করতে হত। তাই নিয়ম করে প্রতিদিন
জঙ্গলে যেতে হত বর্ষীয়ান এই কুনকিকে।
নিজের খাবার নিজে সংগ্রহ করলেও মেঘলাল এর সমস্ত দায়িত্ব নিয়েছিল বনদপ্তর। গরুমারার
জঙ্গলের ভেতরে মেদলার পিলখানায় অবসর জীবন কাটিয়েছে মেঘলাল। জানিনা আজও আছে কিনা।
রাজার গল্প
নাম রাজা, বয়স তখন ছিল প্রায়
তিন বছর। ঠিকানা ছিল
গরুমারা জাতীয় উদ্যান এর গড়াতি বিট। আর
সেই ছোট্ট বয়সেই সে সমস্ত কিছু আয়ত্ত করেছিল। তার দায়িত্বে ছিল দুই জন। সেই দুই মাহুত এবং পাতাওয়ালার অক্লান্ত পরিশ্রমে সুস্থ,
সবলভাবে বেড়ে ওঠে রাজা। রাজা মানে
মেদিনীপুরের বনদপ্তর এর হাতে ধরা পড়া হস্তিশাবক। যাকে তার মা ফেলে রেখে চলে গিয়েছিল। নালায় পড়ে যাওয়ার পর বনকর্মীরা তাকে উদ্ধার করে। পরে তাকে দলে ফিরিয়ে দেবার চেষ্টা
করলেও কোন লাভ হয়নি। কারণ মানুষের
গন্ধ গায়ে থাকায় তাকে তার দল আর ফিরিয়ে নেয় নি। তাই বাধ্য হয়ে বনদপ্তর ওই হস্তিশাবক এর দায়িত্ব নেয়। কিন্তু মেদিনীপুরে হস্তিশাবক বড় করে
তোলার কোন ব্যবস্থা না থাকায় তাকে নিয়ে আসা হয় গরুমারায়। এতদিন গরুমারায় কোন হস্তিশাবক সুস্থ সবল থাকতে পারেনি
এবং এতদিন মা-বাবা হারানো হস্তিসন্তানেরা বড়ও হয়নি। বড় হওয়ার আগেই মারা গেছে। সেইবারই প্রথম দক্ষিণবঙ্গের কোন হস্তিশাবক সুস্থ হয়ে বড়
হয়ে উঠেছিল গরুমারার জঙ্গলে। এই
এলাকায় বা অন্য এলাকা থেকে ধরা পড়া সমস্ত হস্তিশাবককে নিয়ে যাওয়া হতো
জলদাপাড়াতে। কিন্তু রাজাকে
নিয়ে আসা হয় গরুমারায়। তার সাথে তার
বোন রানীও ছিল। রানীকে নিয়ে
যাওয়া হয় জলদাপাড়ায়। গরুমারায় আগেও
বেশ কয়েকটি হস্তিশাবককে নিয়ে আসা হয়েছিল।
কিন্তু তাদের কোনোটিকেই বাঁচানো যায়নি।
কিন্তু পুরনো সমস্ত ঘটনাকে মিথ্যা প্রমান করলেন বনকর্মীরা। সেই সময় সমস্তটাই হয়েছিল বন্যপ্রাণ বিভাগের ডি এফ ওর তত্ত্বাবধানে
বনকর্মীদের ঐকান্তিক পরিশ্রমে। এই
রেঞ্জে আগে স্থানীয় একটি হস্তিশাবক ধরা পড়ার পর নিয়ে আসা হয়েছিল এবং সে তখন সেখানকার
অন্যতম সদস্যদের মধ্যে একজন ছিল। তার
নাম তিস্তারানী। তবে
তিস্তারানীকে একটু বেশি বয়সে ধরা হয়েছিল।
রাজার মতো এতো ছোট অবস্থায় নয় এবং অন্য এলাকা থেকেও নয়। তাই চট করে ওই হস্তিশাবকটি পরিবেশের সাথে নিজেকে মানিয়ে
নিতে পেরেছিল। রাজার দুই বছর
বয়সে এখানে নিয়ে আসা হয়। সেই
পরিস্থিতি থেকে রাজা ধীরে ধীরে মাহুতদের থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে। জেনেছিলাম কিছুদিনের মধ্যেই সে জঙ্গলের জন্য
পুরোপুরি তৈরি হতে পারবে। তাকে রাখা
হয়েছিল সাধারণের ধরা-ছোঁওয়ার অনেক বাইরে গরুমারার প্রত্যন্ত বিট গড়াতিতে। সেখানেই চলেছে তার পাঠশালা। আর ছাত্রও নাকি ছিল সে বেশ ভালো। মাহুতের শেখানো কোন ইশারা বা ভাষা খুব তাড়াতাড়ি
সমস্ত কিছু শিখে নিয়েছিল রাজা। তার
শিক্ষাদীক্ষার গুরু ছিল গরুমারার অভিজ্ঞ মাহুত দীনবন্ধু রায়। এখন হয়তো তাকে শান্তশিষ্ট বাধ্য ছাত্রের মতো দেখতে পাওয়া
যাবে এই রেঞ্জের অন্য হাতিদের সাথে। শিক্ষা
সম্পূর্ণ হয়ে রাজা হয়তো বনদপ্তর এর জঙ্গল থেকে শুরু করে অন্যান্য কাজের জন্য দক্ষ
সৈনিক হয়ে উঠেছে বলেই আমার ধারণা। জঙ্গলমহলের
বন্ধুরা। ভালো থেকো তোমরা।
মনন
বঙ্গবন্ধু মানে বাংলাদেশ
চিত্তরঞ্জন সাহা চিতু
খোকা নামের সেই ছেলেটির জন্ম টুঙ্গি পাড়ায়,
তখন থেকেই শান্তির জন্যে দস্যু গুলোর তাড়ায়।
নেতার মত করতো সে কাজ ভয় কি আর ডরাই,
প্রয়োজনে করতো খোকা সবার জন্য লড়াই।
একটি স্বাধীন দেশের জন্য স্বপ্ন শুধু দেখে,
বুক ভরা তার মনের আবেগ গভীর রাতে লেখে।
ছাত্র থেকে যুদ্ধ করার বু্দ্ধি খানা আটে,
ছড়িয়ে পড়ে সে সব খবর শহর নগর ঘাটে।
ন্যায্য দাবির জন্য নেতা তখন দিলো ডাক,
এদেশ স্বাধীন করতে হবে শত্রু নিপাত যাক।
ডাকটা দিলো একাত্তরের মার্চের সেই সাতে,
এই বাঙালি ক্ষেপলো সবাই অস্ত্র নিলো হাতে।
যুদ্ধ হলো ন'মাস জুড়ে স্বাধীন হলো দেশ,
বুঝিয়ে দিলো যুদ্ধ করার শত্রু হলো শেষ।
স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধুর রক্তে গেলো ভেসে,
বুকের ভেতর শোকের ব্যথা লাল সবুজের দেশে।
গল্প
আলোয় ফেরা
ড. ইন্দ্রাণী বন্দ্যোপাধ্যায়
সকাল আটটা। ট্রেন থামলো হরিদ্বার স্টেশনে। ট্রেন থেকে নামল আলোকিতা পূরবী আর বনশ্রী । ওরা তিনজনেই পঞ্চাশ বসন্ত পার করেছে , অনেক বছরের বন্ধুত্ব। কলেজের ঝামেলা সামলে অনেক দিন কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয় নি তাই হঠাৎ এই পরিকল্পনা।
আলোকিতার মেয়ে বিদেশে পড়াশোনা করে, স্বামী পাঁচ বছর আগ সংসার ছেড়ে কোথায় গেছে কেউ জানে না। শাশুড়ি বলেন স্ত্রীর ভয়ে সাধু হয়েছে ছেলে। আসলে আলোকিতা খুব স্পষ্টবাদী সাহসী স্বভাবের মেয়ে।অন্যায় দেখলে যে কোন সময় রুখে দাঁড়াতে পারে।সেটা কলেজ স্যোশালে অবাধ্য ছাত্রদের শাসনের জন্য হোক বা সংসারে কোন অনিয়মের বিরুদ্ধে হোক। পূরবী অন্যরকম, শান্ত, কম কথা বলে ,কোন ঝামেলায় নিজেকে জড়ায় না। বিধবা হবার পর থেকে সবসময় বিষন্ন হয়ে থাকে। একমাত্র ছেলে কর্মসূত্রে বৌ নিয়ে থাকে চেন্নাই। আর বনশ্রী প্রচন্ড কথা বলে, সবসময় হৈ চৈ করে, সব সমস্যা হেসে উড়িয়ে দেয়। বিয়ে করে নি, এ নিয়ে কোন মাথাব্যথা ও নেই। ভাইপো ভাইঝি দের নিয়ে আনন্দে মেতে থাকে। স্বভাবের বৈপরীত্য সত্ত্বেও ওদের তিনজনের মনের দারুণ মিল।
সন্ধ্যা আরতি শুরু হয়েছে। সামনে দিয়ে বয়ে চলেছে গঙ্গা... বিশাল জলধি তরঙ্গ,ছলাৎ ছল.. কত আশা কত প্রতিজ্ঞা বুকে নিয়ে প্রদীপ ভাসছে।গঙ্গার স্তোত্র পাঠের মধুর সুরমর্ছনা ... তিন বান্ধবীর মন আর্দ্র হয়ে উঠলো। পূরবী ধীরে ধীরে বলল -- রিটায়ার করার পর আমি এরকম কোনো জায়গায় বাকী জীবনটা কাটাব। কলকাতায় ভালো লাগে না আর ছেলের কাছে ও যাব না।
আলোকিতা কী যেন ভেবেই চলেছে।কোন কথা কানে যাচ্ছে না। বনশ্রী বলে -- কেন গো , এরকম ভাবছো কেন? হরিদ্বার খুব ভালো লেগে গেল বুঝি।
-- না, না তোমাদের আমি কোনদিন বলি নি, রিকি মানে আমার বৌমা একলা থাকতে ই ভালবাসে। আমাকে একটু ও সম্মান দেয় না।থাক ওরা নিজের মত থাক।
পূরবী জবাব দেয় -- ওহ তুমি তো আমাদের কোনদিন কিছু ই বলনি। তবে আমি বিন্দাস আছি জানো। নো চাপ।কে কবে বিয়ে করবে বলে কথা দিয়ে বিয়ে করে নি।তার জন্য কোন শোক দুঃখ নেই।
-- তাহলে আর অন্য কাউকে বিয়ে করলে না কেন?
--- দূর আর নতুন করে কাউকে ভালবাসতে পারলাম না।
আলোকিতা যেন ধ্যান থেকে জেগে উঠল। কথা গুলো বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো -- আমি কিন্তু এখানে শুধু বেড়াতে আসিনি, এসেছি একজনের সন্ধানে।
দুজনে একসাথে বলে উঠল -- মানে?
-- গতমাসে আমার ননদের ছেলে এখানে এসেছিল টুপুরের বাবাকে মানে তিমির কে দেখেছিল। তাই ধরতে এসেছি। এখানে থানার সঙ্গে আগে ই যোগাযোগ করে রেখেছি।নন্দাই এর চেনাশোনা আছে কিনা।
বনশ্রী জিজ্ঞেস করে -- সে কি কি আমরা তো কিচ্ছু জানি না। যদি না মাইন্ড করো প্লীজ খুলে বলো। পূরবী ও জানতে চায় -- উনি বাড়ি ছাড়লেন কেন ? ভালো অধ্যাপক হিসেবে ওনার তো বেশ নামডাক ছিল। খুব ভালো গান গাইতেন শুনেছি।
-- আজ বলবো। কাউকে বলতে পারি নি এই লজ্জার কথা, বুকের মধ্যে চেপে বসে আছে পাথরের ভার। শোনো তাহলে, আমার এক মামাতো বোন কলকাতায় এসেছিল কম্পিটেটিভ এক্সাম দিতে, আমাদের বাড়িতে উঠেছিল। তোমাদের তিমির দার কাছে মাঝে মাঝে অংক বুঝতো। আমি সেরকম গুরুত্ব দি নি , আমার থেকে দশ বছরের ছোট আমার বোন, তবে খুব মিষ্টি চেহারা। কিছু মনে কোরোনা , ওর সাজগোজ একটু সেক্সি লাগতো আমার। আমি আবার একটু পুরোনোপন্থী তোমরা তো জানোই। তো হয়েছে কী, একদিন দুটোর সময় কলেজ ছুটি হয়ে গেল, পাঁচ বছর আগের ঘটনা তবু কোনদিন ভুলতে পারবো না, সেই যে ছাত্ররা বন্ধ ডেকেছিল, কী মারপিট আমাদের কলেজের সামনে। রিক্সা করে বাড়ি ফিরলাম, তিমির কে খুঁজতে খুঁজতে ছাদে উঠে দেখি চিলেকোঠার ঘরে তিমির আর বোন ঝিলিক।কী দৃশ্য উফফ্, আমি তো থরথর করে কাঁপছি, কী বলবো বুঝতে পারছি না।তিমির একছুটে নিচে এসে একটা ছোটব্যাগে দরকারি জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে গেল। ঝিলিক পরদিন পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফিরে গেল। তিমির আর বাড়ি ফিরল না।কোন সন্ধান পাওয়া গেল না। বাড়িতে প্রচন্ড অশান্তি শাশুড়ির সাথে।আমি ওয়ার্কিং হস্টেলে সিফ্ট করলাম। সেই থেকে ই তো আমি আর পূরবী এক হস্টেলে।
-- এটা তো টুরিস্ট স্পট। কত লোকের যাতায়াত। কিভাবে খুঁজে পাবে?
-- ঠিক বলেছ। তবু খুঁজতে হবে। টুপুর আমায় ভুল বুঝেছে।বাবার বাড়ি ছাড়ার জন্য মনে মনে আমাকে দোষী ভাবে।আসল কারণ জানে না। জানানো যাবে ও না। তাছাড়া ওর বিয়ের কথা চলছে এখন।
-- আমার সিমলায় বরফ দেখার ইচ্ছে ছিল।এবার থাক তাহলে। বনশ্রী বেশ সিরিয়াস।
--কাল কোথায় যাবো আমরা? পূরবী জানতে চায়।
আলোকিতা উত্তর দেয় -- মন্দির গুলো আগে ঘুরবো
-- কেন? মন্দির কেন?
-- কারণ ছাড়া কি কাজ হয়?
-- বেশ তাই হোক, দুজনেই রাজী।
মনসা পাহাড় আর কঙ্খল বেড়ানো হয়ে গেল। পরদিন খুব ভোরে হৃষিকেশ চলল তিন বান্ধবী।
বনশ্রী পথে যেতে পূরবীকে বলে -- আমার কেমন যেন রোমাঞ্চকর ফীলিংস হচ্ছে, মনে হচ্ছে আলোকিতা ফেলুদা,আমি জটায়ু আর তুমি তোপসে কি তুলনা টা কেমন?
আলোকিতা মুখের গাম্ভীর্য সরিয়ে হেসে ফেললো
--আচ্ছা আচ্ছা হয়েছে।এখন পা চালাও।ঝুলা পার হতে হবে।
লছ্মন মন্দিরের কাছে ওরা দাঁড়াল।
-- তোমরা চা খাবে? আলোকিতা জিজ্ঞেস করে।
- তা মন্দ হয় না। শীত করছে ,ঠান্ডা হাওয়া,কুয়াশায় চারিদিক অন্ধকার হয়ে আছে।
চা খেতে খেতে ওদের কানে পৌঁছাল মন্দিরের দিক থেকে ভেসে আসা গানের সুর .... উঠত দশরথ দুলাল । অপূর্ব গায়কী।
চা ফেলে দ্রুত পায়ে হাঁটতে লাগলো আলোকিতা।ওরাও পিছু নিল।
আরো জোরে হাঁটছে মন্দিরের পারিধির মধ্যে। সিঁড়ি দ্রুত উঠে আলোকিতা সামনে গিয়ে দাঁড়াল সাধুবেশী আলখাল্লা পরা গায়কের সামনে ।গায়কটি নিবিষ্ট হয়ে হারমোনিয়াম এ সুর তুলে গাইছে।আলোকিতা গায়কের আলখাল্লার হাতা ধরে টান দিল -- চলো এক্ষুনি বাড়ি ফিরে চলো। না গেলে পুলিশ দিয়ে বাড়ি নিয়ে যাবো তোমাকে।
গায়ক হঠাৎ চমকে উঠে লাফ দিয়ে দাঁড়াল।
আলোকিতা স্থান কাল ভুলে চিৎকার করতে থাকে -- পাঁচ বছর ধরে আমি জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছি। তোমাদের বাড়ির লোকজনের কাছে আমাদের বাড়ির কাছে আমি কেন জবাবদিহি করব? দোষ করলে তুমি আর সব কষ্ট অপমান আমি ভোগ করব? কেন কেন? কাপুরুষ কোথাকার নিজের ভুল স্বীকার করে আমার কাছে ক্ষমা চাইতে পারলে না? টুপুরের কথা ও ভাবলে না? মেয়ের মুখের দিকে তাকাতে পারি না আমি। টুপুর আমার উপর রাগ করে দিল্লি তে তোমার দিদির বাড়ি চলে গেছিল, ওখান থেকে মেলবোর্ন চলে গেল। শুধু তোমার জন্য । উফফফ্
আলোকিতার জ্বলন্ত চোখ মুখ দেখে তিমির ধরা পড়া চোরের মতো দাঁড়িয়ে থাকে ।
আলোকিতা আবার ধমক দেয় -- যাবে না ? না যাবে?
তিমির কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তারপর মন্দিরের সাধুদের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে কথা বলে। এবার আলোকিতার কাছে এসে বলে -- চলো তাহলে,আমি বাড়ি ফিরে যাবো। আমার উপর আর রাগ নেই তো? ক্ষমা চাইছি আমি। হ্যাঁ ভুল দোষ সব আমার, টুপুরের সঙ্গে কথা বলবো।মাকে ও খুলে বলবো সব।
হৃষিকেশ যাবার গাড়ি দাঁড়িয়ে। গাড়ির দরজার কাছে পূরবী আর বনশ্রী, মুখে স্মিত হাসি।
গাড়ির কাছে এসে তিমিরের হাত ছেড়ে আলোকিতা বলে -- যাও সামনের সিট গিয়ে বসো। আজ ঋষিকেশ ঘুরে দেখব। তুমি গাইড করবে। তারপর কালই বাড়ি ফিরে যাব সবাই।
তিমিরের বিষন্ন মুখে এক চিলতে হাসি, জবাব দেয় -- আর তোমার কথার অন্যথা হবে না। তবে সাধুর বেশ টা ফেলে রেখে যাব এখানে।
কুয়াশা কেটে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। সূর্যের আলোয় চারদিক ঝলমল করে উঠছে। গাড়ি স্টার্ট দিল.....
আলোর ঠিকানা
অর্পিতা মুখার্জী চক্রবর্তী
রাত প্রায় বারোটা। নির্জন রাস্তা ধরে প্রায় ছুটে চলবার মতোই নিজের শরীরটাকে কোনোমতে টেনে নিতে নিতে এগিয়ে চলেছিল ও। কতোক্ষণ ধরে এভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, কোন পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে সম্পূর্ণ লক্ষ্যহীন ভাবে, তা উপলব্ধি করবার মতো কোনও বোধ কাজ করছিল না ওর। ওর সঙ্গে এগিয়ে চলেছিল আরও একটি প্রাণ, যার উপস্থিতি, যার স্পন্দন এখন খুব স্পষ্ট ওর কাছে। ওর শরীরেও ঐ সম্ভাবনার আভাস খুব প্রকটভাবে ধরা দিয়েছে। মৃত্যুভয় তাড়া করছিল ওকে। ওর অবিন্যস্ত চুলে, ওর আলুথালু বেশভূষায় তারই ইঙ্গিত। গন্তব্য না জেনেই রাতের বাতাসের নিস্তব্ধতাকে নিজের অস্ফুট গোঙানির সাথে মিশিয়ে দিয়ে, জঠোরের কচি প্রাণটাকে দুহাতে আগলে ওর ভয়াবহ অতীতকে ভেঙেচুরে অনেক দূরে সরিয়ে নিতে চাইছিল নিজেকে আর নিজের মধ্যে বেড়ে ওঠা ওর একান্ত আপনার জনটিকে। এরপর কিসে একটা পা লেগে পড়ে যাওয়া.... মাথায় হালকা ব্যথার অনুভূতি.... অপরিচিত কতোগুলো মুখের সারি.... কিসের একটা জোরালো শব্দ.... তারপর সব শূন্যতায় ভরা....
ক'দিন ধরেই খুব খাটাখাটনি যাচ্ছিল শংকরের। ওদের এই কুমোরটুলি অঞ্চলের সব ঘরে ঘরেই উৎসবের সাড়া জাগিয়ে এসেছে বাসন্তী পুজো। পুজোর ব্যবস্থাপনা, বাজারহাট এসবের বেশিরভাগ দায়িত্বই থাকে শংকরের ওপর। কিছু মূর্তির বায়নাও ছিল। দুর্গাপুজোর কয়েকমাস আগে থেকেই অক্লান্ত পরিশ্রম করে কুমোরটুলির ঘরে ঘরে সমস্ত প্রথা মেনে ওরা সমস্ত শিল্পীরা ধাপে ধাপে মূর্তি গড়ার কাজে লেগে পড়ে। দুর্গাপুজোর সময়ও ওরা মন খুলে আনন্দ করতে, পরিবারকে সময় দিতে পারে না, কারণ তার ঠিক পরপরই লক্ষ্মী পুজো ও তার কিছুদিনের মধ্যেই কালীপুজোকে ঘিরে মূর্তি বানানোর ব্যস্ততা থাকে তুঙ্গে। উৎসবমুখর দিনগুলো মূর্তির গায়ে মাটির প্রলেপ দিতে দিতেই কোথা দিয়ে পার হয়ে যায়। তাই এই বাসন্তী পুজো আর সব শিল্পীদের মতো শংকরের কাছেও একরাশ আনন্দ নিয়ে আসে। ওর বাবা কাকারাও ছোটোবেলা থেকে সাক্ষী হয়ে আছেন এই পুজোর। আজ সপ্তমী পুজো খুব আনন্দে কেটেছে ওদের। কাল সকালে অষ্টমী, সাথে অন্নপূর্ণা পুজো। ব্যস্ততায় কাটবে সারাটাদিন। এরমধ্যেই এই বিপদ বাধিয়ে বসলো সনাতন কাকা। শংকরের বাবা ঠাকুরদা সকলেই মৃৎশিল্পী ছিলেন ঠিকই,, কিন্তু শংকরের এই কাজের হাতেখড়ি ওর খুব ভালোবাসার গুণী মানুষ সনাতন কাকার কাছে। শংকরের এই কাজকে ভালোবাসা ও পরবর্তীতে সুনাম অর্জন সবটার জন্যই ও চিরকৃতজ্ঞ সনাতন কাকার কাছে। ক'দিন ধরেই শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না কাকার। আজ রাতে হঠাৎ করে খুব বেশি শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়ায় কাছাকাছি একজন ডাক্তারের পরামর্শে শংকর অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা করে কাকাকে নিয়ে হাসপাতালের পথে রওনা দিল, সঙ্গে নিল ওদের ওখানকার দুটি ছেলেকে।
পথের দুদিকের আলোর সারি পেরিয়ে ছুটে চলেছিল অ্যাম্বুলেন্স। রাত বেশ অনেকটাই হয়েছে। এরপর কিছুটা পথ আলো আঁধারিতে মেশানো। এগিয়ে যেতে যেতে হঠাৎই খুব জোরে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়লো অ্যাম্বুলেন্স। গাড়ির আলোয় একটি অন্তঃসত্ত্বা মেয়েকে পথের মাঝে আবিষ্কার করলো ওরা। তিনজন মিলে জ্ঞান হারানো মেয়েটিকে তুলে নিল গাড়ির ভেতরে।
মাথার মধ্যে কেমন সব জট পাকিয়ে যাচ্ছে ওর। ও যেন কে? কি যেন হয়েছিল ওর? ঐ তো বাবা.. ওকে 'মা' 'মা' করে ডাকছে.. আর মা? মা কোথায়? মায়ের তো শুধু ছবিই দেখেছে ও.. ওর জন্মের দিনইতো ওর মায়ের মৃত্যুদিন। আর ঐ তো সুবিমল কাকু.. বাবা যার প্রেসে উদয়াস্ত খাটাখাটনি করে চলে.. সুবিমল কাকু পান চিবোতে চিবোতে ওর দিকে এগিয়ে আসছে.. নানান আছিলায় ওর গায়ে হাত দিতে চাইছে.. বাবাকে হম্বিতম্বি করে বলছে ওনার ভাইপোর সাথে ওর বিয়ে দিতেই হবে.. ওর সহজ সরল বাবা কাচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে আছে.. সুবিমল কাকুর লোলুপ দৃষ্টি থেকে নিজেকে সরাতে চাইছে ও। আর, ঐতো ওর স্বামী, মানসিক ভাবে অপ্রকৃতিস্থ কিন্তু ওকে নিজস্ব সম্পত্তি ভেবে ওর ওপর বলপ্রয়োগ করে ওকে জেরবার করেই যার আত্মতুষ্টি। যার সাথে ও মনের কোনো কথাই ভাগ করে নিতে পারে না। বাবার প্রতি এক নিরুচ্চারিত অভিমানে ওর গলা বুজে আসে.. ঐ তো, রাতদিন এক করে বাড়ির সকলের সব কাজ একা হাতে সামলে চলেছে ও.. মুখ বুজে.. ঐ তো ওর শাশুড়ি, ননদ.. ওকে ভ্রুণ পরীক্ষা করাতে নিয়ে গেছে বেআইনি পথে.. কন্যা সন্তান আসছে জেনে পৃথিবীর আলো দেখবার আগেই ওকে মুছে ফেলতে চাইছে .. ও প্রতিবাদ করছে, যুদ্ধ করছে.. তার সাথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ চলছে সুবিমল কাকুর হাত থেকে বাঁচবার। তারমধ্যেই হঠাৎ এল বৈধব্য.. অত্যাচার আরও নির্মম হলো.. গলা গুলো কানে বাজছে.. 'অপয়া'.. যে আসছে সেও অপয়া.. তাই ওকে জন্মের আগেই সরানোর জন্য লোক ডেকে শলা পরামর্শ চলছে,ওর শরীরের মধ্যে প্রায় পরিণত হয়ে যাওয়া প্রাণটাকে কিভাবে হত্যা করা যায়.. কিন্তু ও যে বড়ো ভালোবেসেছে ওকে.. অনেক স্বপ্ন দেখেছে ওকে নিয়ে.. এই মানুষরূপী হায়নাদের চক্রান্তের শিকার হতেই দেবেনা ওর মধ্যে তিলতিল করে বেড়ে ওঠা আশাটাকে। এখান থেকে বেরিয়ে যাবে ও.. যেমন করে হোক..
ঘোরের মধ্যে একবার জ্ঞান ফিরে এল বুঝি । জটগুলো ছেড়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। ওর মুখের ওপর সেই মুখ.. কোথায় যেন দেখেছে আরেকবার.. সেই চোখ ওর চোখের দিকে তাকিয়ে.... যাকে দেখলে বিশ্বাস করতে, ভরসা করতে ইচ্ছে করে..জীবনকে আবারও আঁকড়ে ধরে বাঁচবার সাধ জাগে....
হাসপাতালে নিয়ে আসবার পর কিছুক্ষণ অক্সিজেন আর স্যালাইনের সরবরাহে সনাতন কাকা আগের তুলনায় কিছুটা সুস্থ এখন। আর ঐ মেয়েটি যাকে রাস্তা থেকে তুলে এনেছিল ওরা,তাকে এখন অসহ্য যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। রাত ফুরোলেই অষ্টমী। শংকর ফিরে না গেলে পুজোর কাজ এগোনো খুব মুশকিল। ভোরের আলো ফুটতেই বাড়ির পথে রওনা দিল শংকর। রওনা দেওয়ার আগে ঐ অপরিচিত মেয়েটিকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে.. আসবার আগে শুনে এসেছে মেয়েটি ওখানে জীবন আর মৃত্যুর মাঝে লড়াই করছে। অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাবার সময় একবার চোখ মেলে তাকিয়েছিল শংকরের দিকে.. সেই দৃষ্টিতে কৃতজ্ঞতা, আকুতি, শ্রদ্ধা সবকিছু মিলেমিশে একাকার হয়ে ঝরে পড়ছিল, ওর গাল বেয়ে ঝরে পড়া কান্নার সাথে। ওর স্বামীর পরিচয়ে শংকরকেই হাসপাতালের প্রমাণ পত্রে বন্ডসই করতে হয়েছিল.. সম্পূর্ণ অসহায় একজনের প্রাণের মূল্য তখন সবকিছুর ওপরে জায়গা করে নিয়েছিল..
পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণে অষ্টমীর অঞ্জলি শুরু হলো। শংকরের মন পড়ে রইল হাসপাতালের দিকে। বাসন্তী দুর্গা প্রতিমার কোমল চোখে, মুখের আদলে ভেসে রইল ঐ আকুতিমাখা নাম না জানা মেয়েটির সুন্দর মুখখানি। মন কেমন করা এক অনুভূতিতে মায়ের কাছে অসহায় মেয়েটির আর ওর সন্তানের জীবন ভিক্ষা চাইল শংকর..
জীবন মৃত্যুর লড়াই জিতিয়ে দিল জীবনকেই। সময়ের কিছুটা আগে হলেও সুস্থ সুন্দর কন্যা সন্তানের জন্ম দিল জয়া। বসন্তের বাতাসে দূর থেকে ভেসে আসা মন্ত্রধ্বনির সুর জানান দিল অষ্টমী তিথির শুভক্ষণের। সে সুর যেন সমস্ত অশুভ শক্তিকে বিনাশ করে শুভ চেতনাকে জাগ্রত করতে বদ্ধপরিকর। ভোরের নরম আলো মাখা যে নিষ্পাপ শিশুমুখ জয়ার দিকে আগ্রহভরে তাকিয়ে ছিল, আচ্ছন্নতা ও চেতনার মাঝে তার চোখে চোখ মিলিয়ে সমস্ত ভালোবাসা উজার করে জয়ার মন বলে উঠলো, 'অপরাজিতা', এই নামই দিলাম তোকে.... '
কাঁচের পৃথিবী
অদিতি মুখার্জী(সেনগুপ্ত)
আজ অনির্বাণের পাঁচ বছরের জন্মদিন। স্নিগ্ধা নিজের মনের সুখে ঘর সাজাচ্ছে, রঙিন বেলুন, টুনি বাল্ব আর নানা রঙের ফুল দিয়ে। দেখতে দেখতে পাঁচটা বছর কিভাবে চোখের নিমেষে কেটে গেল টেরই পেলনা স্নিগ্ধা।
বারবার আজ পুরনো স্মৃতি গুলো ঘুরে-ফিরে স্নিগ্ধার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। হঠাৎই যখন নিজের পছন্দের রিপোর্টারের চাকরি অচেনা-অজানা এক শহরে পেল,সে বুঝতে পারছিলনা কোথায় থাকবে আর নতুন জায়গায় নিজেকে কীভাবে মানিয়ে নেবে। এমন সময় খহরের কাগজে পেয়িং গেস্টের অ্যডটা তার চোখে পরে। যোগাযোগ করার পর অহনা আর অরিজিৎ এর স্নিগ্ধা কে পছন্দ হয় এবং কিছুদিনের মধ্যেই স্নিগ্ধার ওদের সাথে একটা সুন্দর সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
রিপোর্টার হিসাবে স্নিগ্ধা বেশ কিছু মাসের মধ্যেই সুনাম অর্জন করে। বিধি বাঁধ সাজে তার এই সফলতার। বৃষ্টি মুখর এক রাতে বাড়ি ফেরার পথে স্নিগ্ধা কিছু দুষ্কৃতকারীর লালসার শিকার হয়। শুধু ধর্ষণ করেই তাদের আশ মেটেনি, তারা ওর মুখেও অ্যসিড ঢেলে দিয়ে পলাতক হয়। মাতৃ-পিতৃহীন স্নিগ্ধাকে এই অবস্থায় তার আত্মীয় স্বজন যখন পরিত্যাগ করে তখন অহনা আর অরিজিৎ তার পাশে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাদের সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেয়।
কিছুদিন পরে অহনা উৎফুল্লতার সাথে তার মা হওয়ার খবর অরিজিৎ কে দিল।খবরটা পেয়ে স্নিগ্ধা ও খুব খুশি হল। আবার পরক্ষণেই তার মন ভেঙে গেল, কারণ সে যে তার প্রিয় বান্ধবীর সন্তান কে দেখতেই পারবেনা। দুর্ঘটনা যে তার দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে।
মাস যেতে থাকে,অহননা আর অরিজিৎ আনন্দ সাগরে ভেসে চলে। কী নাম দেবে? বড় হয়ে তাদের সন্তান কী হবে? এই সকল জল্পনা কল্পনাতেই ওদের সময় কাটতে থাকে। কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয় আরেক। ছ মাসের আল্ট্রা সোনোগ্রাফী রিপোর্ট বলে সন্তানের বাড়ার সাথে সাথে অহনার শরীরে একটা টিউমার ও বাসা বেঁধেছে।ডাক্তারের পরিভাষায় টিউমারে ক্যানসার কোষ থাকার সম্ভাবনা বেশী। অরিজিৎ এর পায়ের নীচের মাটি কিছুক্ষণের জন্য সরে গেলো, সে বুঝে উঠতে পারছিলনা কি করবে।
যথা সময় অনির্বাণের জন্ম হল কিন্তু অহনার শরীর কোন ঔষধকেই সায় দিচ্ছিলনা। একদিন অহনা, স্নিগ্ধাকে কাছে ডেকে বলে, " বন্ধু, আমি ভালোভাবে বুঝতে পারছি যে এই পৃথিবীতে আমার মেয়াদ ফুরিয়ে এসেছে। তুই আমার দৃষ্টি দিয়ে অরিজিৎ আর অনির্বাণ কে দেখিস। এটাই আমার অনুরোধ যা আমি জানি তুই ফেলতে পারবিনা।
এর কিছু দিনের মধ্যেই অহনা চিরনিদ্রায় চলে যায়। সে অরিজিৎ কেউ তার শেষ ইচ্ছা জানিয়ে গেছিল।
এই সকল কথা ভাবতে ভাবতে অরিজিৎ আর অনির্বাণ কখন তার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে, স্নিগ্ধা টেরই পায়নি। সম্বিত ফিরল যখন অনির্বাণ ওর আঁচল টৈনে বলল, "মামনী, আমরা যাবনা মিকি মাউস কেক আনতে?"
হ্যাঁ, অহনার যাওয়ার পর অরিজিতের প্রচেষ্টায় স্নিগ্ধা আবার ওর দৃষ্টি ফিরে পায়। সে যথাসাধ্য চেষ্টা করে অরিজিৎ আর অনির্বাণকে ভালো রাখতে। স্নিগ্ধার বিশ্বাস এই শক্তি অহনাই তাকে যোগায়। আর অনির্বাণ তো ওর মামনিকে চোখে হারায়।
প্রবন্ধ
লাল পলাশের আগুন ঝরানো বাহার দেখলে মনটা ভরে ওঠে
বটু কৃষ্ণ হালদার
গত এক বছর ধরে সমগ্র সভ্যতার উপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেল। ২০২০ সাল বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মানব সভ্যতার কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।চেনা পরিবেশ মানুষজন,রাস্তাঘাট,বড্ড অচেনা হয়ে উঠেছিল। লকডাউনের সময় জনগণ সংবাদমাধ্যমগুলোতে নজর রেখেছিল আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলেছিল। প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মিছিলে হাঁটছিলো বিশ্বের তাবড় তাবড় দেশগুলো। ভারতবর্ষ সেই তালিকা থেকে বাদ যায়নি। সেলফোন বেজে উঠলে হৃদপিণ্ড ছটফট করে উঠত। কারণ প্রতি সেকেন্ড কেউ-না-কেউ হারিয়েছে তাদের প্রিয়জনকে, সেই খবর শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে যেত। চোখের সামনে মা সন্তান হারিয়েছে, স্ত্রী স্বামী হারিয়েছে, আবার কেউ কেউ হারিয়েছে তাদের প্রিয়জনকে। অগণিত মানুষ কর্মহারা হয়েছে। প্রায় এক বছর যাবত সাধারন জনগন নিজেদেরকে গুটিয়ে রেখেছিল শামুকের খোলস এর মধ্যে। মানবজাতির কাছে এ ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। মানুষ এই এক বছর উৎসব বিহীন জীবনযাপন কাটিয়েছে।ধীরে ধীরে বিভীষিকাময় আধারের কালো মেঘ সরে গিয়ে আবার একটু একটু করে আলোর মুখ দেখতে চলেছে।
আমাদের ভারত বর্ষ এক ঋতু বৈচিত্র্যময় দেশ। ছয়টি ঋতুর সমাহার এ ভারতবর্ষকে বিশ্বের দরবারে শস্য-শ্যামলা করে তুলেছে। ভারত বর্ষ শুধু ঋতু সমাহার দেশ নয়, ভিন্ন ভাষা সংস্কৃতির মিলনক্ষেত্র বটে। তাই ভারতবর্ষে প্রতিনিয়ত কোন না কোন সংস্কৃতি উৎসব লেগেই থাকে। এরই জন্য বিদেশীরা পবিত্র ভারতভূমির টানে ঘর ছাড়া হয়। তেমনি এই ভারতের এক অন্যতম জনপ্রিয় লোকো উৎসব হলো দোল। যাকে পাতি বাংলা ভাষায় বলা হয় বসন্ত উৎসব। এই বসন্ত উৎসবের সঙ্গে গ্রাম বাংলার মানুষদের নাড়ির সম্পর্ক। বসন্ত উৎসব হলো বাঙ্গালীদের প্রাণের উৎসব। এ সময় বনময় নতুন বৃন্তে আচ্ছাদিত হয়ে সবুজ সতেজ হয়ে উঠে। কোকিলের মন মাতানো কুহু কন্ঠে মুখরিত হয়ে ওঠে পরিবেশ।বসন্তের রঙে রঙিন। হয়ে ওঠে উৎসব মুখরিত বাঙালির হৃদয়। বসন্ত মানেই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন। নতুন বর্ণে সেজে ওঠে শান্তিনিকেতন। বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ কখন রঙের খেলা চালু করেছিলেন, তা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। কিন্তু শান্তিনিকেতনে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ যে বসন্তোৎসব চালু করেছিলেন, তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। ১৯২৫ সালে প্রথম পথ চলা শুরু হয় এই বসন্ত উৎসবের। উৎসবের মূল সুর যেন তখন থেকেই বেঁধে দেওয়া হয়ে গিয়েছিল।
বসন্ত উৎসবের একদম প্রাচীনতম রুপ প্রোথিত আছে দোলযাত্রার মাঝে। ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে অনুষ্ঠিত হয় দোলযাত্রা। এর প্রাণকেন্দ্রে থাকেন রাধা-কৃষ্ণ। তাদেরকে দোলায় বসিয়ে পূজা করা হয়। উত্তর ভারতে যেটিকে বলা হয় হোলি, বাংলায় সেটিই পরিচিত দোল হিসেবে।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলের প্রাচীন আর্য জাতির হাত ধরে এই উৎসবের জন্ম। খ্রিস্টের জন্মেরও বেশ কয়েকশো বছর আগে থেকে উদযাপিত হয়ে আসছে এই উৎসবটি। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দে পাথরের উপর খোদাই করা এক পাথরে পাওয়া গেছে এই উৎসবের নমুনা। এছাড়া হিন্দুদের পবিত্র গ্রন্থ বেদ ও পুরাণেও রয়েছে এই উৎসবের উল্লেখ।
এছাড়াও এই উৎসবের ফিরিস্তি রয়েছে আরো বহু জায়গায়। তৃতীয়-চতুর্থ শতকে বাৎস্যায়ন রচনা করেছিলেন তার জগদ্বিখ্যাত 'কামসূত্র'। সেখানে দেখা যায় দোলায় বসে নর-নারীর আমোদ-প্রমোদের বিবরণ। সপ্তম শতকের দিকে রাজা হর্ষবর্ধনের শাসনামলে সংস্কৃত ভাষায় লেখা হয়েছিল একটি প্রেমের নাটিকা, সেখানেও ছিল হোলির বর্ণনা। সপ্তম শতকে রচিত শ্রীকৃষ্ণের 'রত্নাবলী' এবং অষ্টম শতকের 'মালতী-মাধব' - এই দুই নাটকেও দেখা মেলে এই উৎসবের। তালিকা থেকে বাদ দেয়া যাবে না জীমূতবাহনের 'কালবিবেক' ও ষোড়শ শতকের 'রঘুনন্দন' গ্রন্থের কথাও। পরবর্তী সময়ে ভারতবর্ষজুড়ে অনেক মন্দিরের গায়েও হোলি খেলার নমুনা বিভিন্নভাবে ফুটে উঠতে দেখা যায়।প্রথমদিকে ভারতবর্ষে এসে ইংরেজরা এই উৎসবকে রোমান উৎসব 'ল্যুপেরক্যালিয়া'র সাথে গুলিয়ে ফেলেছিল। অনেকেই আবার একে গ্রিকদের উৎসব 'ব্যাকানালিয়া'র সাথেও তুলনা করত।
কথায় আছে বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ।পহেলা বৈশাখের পর অন্যতম জনপ্রিয় লোক উৎসব হলো দোল উৎসব। নীল সাদা মেঘের ভেলা ও দখিনা বাতাসের তালে তালে কাশফুলের মাথা দোলালো যেমন জানান দেয় ঘরের মেয়ে উমার আগমন ঘটতে চলেছে। ঠিক তেমনই ,পলাশ,শিমুল, কৃষ্ণচূড়া কেশর উঁচিয়ে জানান দেয় বসন্ত এসে গেছে।এ সময় বহু প্রেমিক-প্রেমিকাদের হৃদয়ে আকুতি র দুয়ার খুলে যায়। প্রেমিকের বুকে প্রেমিকা মাথা রেখে স্বপ্নের মায়াজাল বুনতে থাকে। এসময় তরতাজা হয়ে ওঠে আমাদের শৈশব। আমাদের শৈশবে দোল খেলা ছিল একটু অন্যরকম।কারণ আমার শৈশব কেটেছে সুন্দর বনের এক প্রত্যন্ত গ্রামে।গ্রামের নাম গোসাবা ব্লকের পাঠান খালি নামক জায়গার কামার পাড়া গ্রামে। গ্রামের মানুষ জন মাটির সাথে মিশে গিয়ে উৎসব পালন করেন।তখন আমাদের কাছে টাকা পয়সা ছিল না কিন্তু অনাবিল সুখের ঢেউ উপছে পড়ত সহজ সরল জীবনে। দোল উৎসবের আগের দিন গ্রামে ন্যাড়াপোড়া চালু আছে। যুগ যুগ ধরে বাংলার মানুষ এই সংস্কৃতিকে বহন করে চলেছে।অশুভকে বিনাশ করে শুভ শক্তির জয় উদযাপনই হোলি উৎসব। রঙের পাশাপাশি তাই ন্যাড়া পোড়াকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। যা নিয়ে বাংলায় মজার ছড়াও প্রচলিত, 'আজ আমাদের ন্যাড়া পোড়া কাল আমাদের দোল, পূর্ণিমাতে চাঁদ উঠেছে বল হরি বোল।' হোলির একদিন আগে অনুষ্ঠিত হয় হলিকা দহন। তার জন্য আগে থেকে শুকনো ডাল, কাঠ এবং শুকনো পাতা জোগাড় করা হয়। তারপরে ফাগুন পূর্ণিমার সন্ধ্যায় পোড়ানো হয় সমস্ত স্তূপাকার করে। এই দহন অশুভ শক্তি বিনাশের প্রতীক।
তখন কার সময়ে গ্রাম বাংলার জনগণ বাজার দিয়ে কেনা পিচকারি আনা হতো না।দোল উৎসব এর কয়েক দিন আগে পিচকারীর বানানোর জন্য বাড়ির গুরুজন রা বাঁশ কেটে জলে ফেলে রাখতেন।তার পর দো লের দিন সেই বাঁশ জল থেকে তুলে সুন্দর করে পিচকারি বানিয়ে দিতেন।রং বলতে বাজার দিয়ে ১/২ টাকা দিয়ে আবির কেনা হতো।সেই রং বালতি করে গুলে তার সাথে জবা ফুল বেটে মিশিয়ে নেওয়া হতো।রং ফুরিয়ে গেলে কাদা জল গুলে দোল উৎসব পালন করা হতো। রঙ ও কাদা জল মেখে এমন অবস্থা হতো কেউ কাউকে চিনতে পারতো না। রং খেলার পরে শুরু হতো জল স্নান।পুকুরে নেমে সাবান দিয়ে রং তুলতে তুলতে নাজেহাল হয়ে যেতাম। অনেকের সেই রঙের দাগ চোখে মুখের সাথেই হৃদয়ে লেগে যেত।তার পর চলত বাঙালির খাওয়া দাওয়া।আমরা সবাই জানি বাঙালি খাদ্য রসিক।নানান বাঙালি পদ রান্নার সুগন্ধে পরিবেশ ভরে যেত।গ্রামের মানুষ গ্রামে ফিরে আসেন।আবার কারো বাড়িতে আসেন অতিথি,আত্মীয়।সারাদিন সারারাত হৈ-হুল্লোড় গল্প আড্ডায় মজায় দিন কাটতো।
বর্তমান সময়ে প্রতিযোগিতার পাল্লা বেড়ে চলেছে। সময় কাঁধের উপর ফেলছে দীর্ঘশ্বাস। একে অন্যের কাঁধে পা রেখে আকাশ ছুঁয়ে ফেলার প্রয়াস। প্রতিযোগিতার ভারে ঝুঁকে গেছে বিবর্ণ মুখ। বাংলার কর্মচ্যুত, শিক্ষিত, বেকার, যুবকরা হয়ে পড়ছে পরিযায়ী শ্রমিক। তাই এই সময়কে লাগাম দিতে গিয়ে মানুষ ভুলে যাচ্ছে উৎসব আনন্দের কথা। বর্তমানে এই দোল উৎসবের সাথে সাথে বহু লোকসংস্কৃতি বাংলার বুক থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। হয়তো এমন ভাবে চলতে থাকলে এই বসন্ত উৎসব একদিন অতীতের স্মৃতিতে পরিণত হবে।
কবিতা
সুসময়
শ্রাবণী সেন
এবার বুঝি শেষ হয়েছে দহন বেলা
এবার বুঝি নতুন দিনের শুরু তবে।
ভাঙাচোরা পুরোনো যা হেলায় ফেলা
নতুন করে ভাঙা হৃদয় জুড়িয়ে যাবে!
এবার বুঝি তোমার আমার বাধা যত
দারুণ ঝড়ে জীর্ণ দেওয়াল গুঁড়িয়ে যাবে
এবার তবে হৃদয় ভরা দারুণ ক্ষত
রক্ত ঝরে লাল-নীল সব নক্শা হবে।
এবার তুমি শান্ত হবে দিনের শেষে
হৃদয় তবে উজাড় করো দ্বিধা ফেলে!
কথায় কথায় দিনও যাবে অনিঃশেষে
মাস, বছর আর যুগও যাবে তোমায় পেলে।
শান্তিদূত রীনা মজুমদার
সুন্দর পৃথিবীর ঘোলাটে জীবনে
তোমাকে বড় প্রয়োজন ছিল,
তুমি পদ্মপাণি, তুমি তথাগত--
পাকদন্ডী সংসারের, পায়েসের বাটি হাতে
জড়বৎ বসে আছি বৃক্ষতলে,
মাথার উপর মৃত চাঁদ, বনাঞ্চলে হিংসার
দাবানল, নদীর বুকে দহন জ্বালা
বড় ভারী এ জীবন-খেলা--
ধ্যান শেষে তুমিই তো চেয়েছিলে
অনন্ত শান্তির আকাশ, চোখ খোলো
দেখ চেয়ে আজ পূর্ণিমার মধ্যরাত
নই আমি সুজাতা
সামান্য এক নারী
শূন্য দুহাত বাড়িয়ে আছি
তোমার হাতের পরশে মুঠো মুঠো
পবিত্র ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে দাও
পৃথিবীর সমস্ত নবজাতক শিশুর জন্য,
আমি দীপ জ্বেলে প্রতীক্ষায়
নতুন বছর, নতুন আশা, হে তথাগত...
প্রশান্তি
বিজয় বর্মন
ভুমিষ্ঠ হতেই সুপ্ত দহনের গ্রাস,
প্রতিমুহূর্তে জীবনের,
আলো আঁধারের মাঝে অবস্থান।
ভোরের পাখি হয়ে, সুরেলা গানে,
চঞ্চলও বাতাস দিগন্ত খুঁজে, সাগর নদী পারে।
বাসনার বিলাসে শূন্য হিয়া,
দহনের ছাই,চাপা দিয়ে এগিয়ে যাওয়া,
ঝরা ফুল পাতা।
কালের গর্ভে জলন্ত আগুন সদা জাগ্রত,
আয়নাতে মুখ, দেখে ভালোবাসা।
তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায়,
লালিত-পালিত, আশা নিরাশা ক্ষণিক নিমিত্তে,
ছুঁয়ে দেখতে চায় অজানা প্রশান্তি।
পাই যেন মা তোকে
শ্রাবণী সেনগুপ্ত
চৈত্র শেষের দহনবেলায় দেখেছিলেম তাকে ,
সবুজ পাতার মধ্যে দিয়ে রোদের ফাঁকে ফাঁকে।
তীব্র রোদের ঝলসানিতে ঝিঁকিয়ে ওঠা মুখ,
সে মুখখানি সারায় আমার সমস্ত অসুখ।
কাজলকালো চোখ দু'খানি নাকেতে নাকছাবি,
কোথায় যেন খুঁজে ফিরি ছেলেবেলার চাবি।
লালমাটির সে দেশে মাটি কাটার শেষে,
বসেছিলো ক্লান্ত হয়ে একটুখানি হেসে।
শিশুটি তার কাছে টলোমলো পায়ে ,
মায়ের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে।
কেন জানি দেখতে পেলেম আমার সেই মা কে,
ছেলেবেলায় হারিয়েছিলেম খুঁজছি কাজের
ফাঁকে।
বিশ্বজনীন মাতৃরূপে নতুন দিনের ভোরে,
পাই যেন মা সবার মাঝে তোকে এমন কোরে।